করোনাকালে খেলনাশিল্প
পাইকারি ব্যবসা ও কারখানা বিপাকে
বেচাবিক্রি না থাকায় পুরান ঢাকার চকবাজারে খেলনা বিক্রির প্রায় ৪০০ পাইকারি দোকান বিপাকে পড়েছে।
এক যুগের বেশি সময় ধরে পুরান ঢাকার চকবাজারে খেলনাসামগ্রী বিক্রি করে আসছেন মোহাম্মদ রনি। করোনার আগে প্রতিদিন ৭০ হাজার থেকে ১ লাখ টাকার খেলনা বিক্রি হতো। করোনার কারণে এক বছর ধরে বিক্রি কমছে। এখন দিনে ৫ থেকে ১০ হাজার টাকার খেলনা বিক্রি হয়। এতে চরম আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন রনি। যা আয় হয় তাতে দোকানভাড়া, গুদামভাড়া ও কর্মচারীদের বেতন দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। সব মিলিয়ে মাসে তাঁর খরচ আছে ৮০ হাজার থেকে ১ লাখ টাকা। এর ওপর বাসা ভাড়া ও সংসারের খরচ তো আছেই।
আলাপকালে খেলনা বিক্রেতা রনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘আগে ব্যবসা ভালোই চলছিল। কিন্তু করোনার কারণে এক বছর ধরে বেচাকেনা নেই। গত বছর টানা তিন মাস দোকান বন্ধ ছিল। কিছুদিন আগে আবার লকডাউন দেওয়া হয়েছে। এখন দোকান খুললেও বেচাকেনা নেই বললে চলে। এক বছরে ৮ থেকে ১০ লাখ টাকা লোকসান হয়েছে। এভাবে চললে শেষ পর্যন্ত ব্যবসায় টিকে থাকত পারব কি না সন্দেহ। কারণ, ব্যাংকঋণও আছে। মাস গেলে সুদ দিতে হয়।’ রনি জানান, দোকানের ছয়জন কর্মচারীকে বিদায় দিয়ে এখন মাত্র একজনকে নিয়ে দোকান চালাচ্ছেন।
শুধু রনি নন, চকবাজারে তাঁর মতো ৪০০ পাইকারি খেলনা বিক্রেতারও একই দশা। এর মধ্যে অন্তত ৩০ জন ব্যবসায়ীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সাধারণত খেলনাসামগ্রীর ব্যবসা জমে ওঠে পয়লা বৈশাখ তথা নববর্ষ ও দুই ঈদের আগে। গত বছরও করোনাজনিত লকডাউনের কারণে সারা দেশে বৈশাখী মেলা না হওয়ায় নববর্ষের বাজার ধরতে পারেননি। এরপর দুই ঈদেও তেমন বেচাকেনা হয়নি। এবার পয়লা বৈশাখ বা নববর্ষের বাজার ধরার আশায় ছিলেন তাঁরা। কিন্তু অপ্রত্যাশিতভাবে দেশে করোনার প্রকোপ বেড়ে যাওয়ায় আবারও লকডাউন। ফলে খেলনাসামগ্রীর বেচাবিক্রি একেবারে শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছে। কদিন পর রমজানের ঈদ। অথচ এখনো বিক্রি বাড়েনি।এতে ব্যবসায়ীরা হতাশ হয়ে পড়েছেন।
এদিকে পাইকারি দোকানে বিক্রি কমে যাওয়ার প্রভাব পড়েছে খেলনা তৈরির কারখানাগুলোয়। গত সোমবার বেলা একটা থেকে বিকেল চারটা পর্যন্ত চকবাজারের আফতাব প্লাজায় খেলনাসামগ্রী বিক্রির প্রায় ২০০ দোকান ঘুরে দেখা গেছে, কোনোটাতেই ক্রেতার ভিড় নেই। বিক্রেতারা দু-একজন কর্মচারী নিয়ে অলস সময় পার করছেন। অথচ করোনার আগের বছরগুলোতে ঈদ উপলক্ষে বিক্রেতাদের যেন দম ফেলার ফুরসত ছিল না। দোকানগুলো গমগম করত প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে আসা খুচরা ব্যবসায়ীদের পদচারণায়। গুদাম-কারখানা থেকে খেলনাসামগ্রী আনা, আবার মফস্বলের খুচরা ব্যবসায়ীদের কিনে নেওয়ার সময় মার্কেটের বাইরে ভিড় লেগে যেত।
আমরা এই শিল্পটাকে এগিয়ে নিতে সরকারের কাছে সহযোগিতা চাই। যেসব ছোট কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে, তারা যাতে আবার ঘুরে দাঁড়াতে পারে, সেই ব্যবস্থা করা হোক।
গত সোমবার বেলা দুইটা পর্যন্ত একটি খেলনাও বিক্রি হয়নি চকবাজারের সজীব এন্টারপ্রাইজে। দোকানটির মালিক তানজিদ হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, ‘দিনের পর দিন যায়, তবু যেন খেলনা বিক্রি হচ্ছে না। অথচ প্রতি মাসে দোকান ও গুদাম ভাড়া আর কর্মচারীর বেতন বাবদ প্রচুর টাকা লাগে। নিজেদের বাসা ভাড়া আর সংসারের খরচও আছে। অথচ আয় একেবারেই কমে গেছে। কীভাবে কী করব, সেটা ভেবে কূলকিনারা করতে পারছি না। কয়েক লাখ টাকা ঋণও নিয়েছি।’
চকবাজারে খেলনা বিক্রির বেশ কিছু দোকান বন্ধও দেখা গেছে। মাসের পর মাস সে রকম বিক্রি না থাকায় এমন হয়েছে বলে জানান খেলনা ব্যবসায়ীদের সংগঠন বাংলাদেশ টয় মার্চেন্ট, ম্যানুফ্যাকচারার অ্যান্ড ইমপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (টিএমএমইএ) সাধারণ সম্পাদক জাহিদুল হক। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘করোনায় সবচেয়ে বেশি আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন খেলনা ব্যবসায়ীরা। এই খাতের হাজার হাজার মানুষ বেকার হয়ে পড়েছেন। যাঁরা কাজে আছেন, তাঁদেরও আয় কমেছে।’
জাহিদুল হক আরও বলেন, ‘আয় কমে যাওয়ায় সংসার চালাতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছেন সবাই। বেচাকেনা একেবারেই না থাকায় আমরা যারা খেলনা বানিয়ে ও বিক্রি করে সংসার চালাই, তারা বড় বিপদে পড়ে গেছি। চকবাজারের চার শর মতো খেলনা বিক্রির দোকান আছে। দেশে খেলনা তৈরির কারখানা আছে আড়াই শ থেকে তিন শ। করোনায় বেচাকেনা না থাকায় অন্তত এক শ কারখানা এখন বন্ধ। এতে প্রায় ১০ হাজার মানুষ চাকরি হারিয়েছেন।’
এক বছরে ৮ থেকে ১০ লাখ টাকা লোকসান হয়েছে। এভাবে চললে শেষ পর্যন্ত ব্যবসায় টিকে থাকতে পারব কি না সন্দেহ। কারণ, ব্যাংকঋণও আছে। মাস গেলে সুদ দিতে হয়।
কারখানা মালিকেরাও বিপদে
এক যুগ আগেও দেশে খেলনাসামগ্রীর বাজার ছিল বিদেশি খেলনার দখলে। ইতিমধ্যে অনেক দেশীয় উদ্যোক্তা খেলনা তৈরির বেশ কিছু কারখানা খুলেছেন। ফলে বাজারে স্থানীয় খেলনাও এখন প্রভাব বিস্তার করছে। চকবাজারের ব্যবসায়ীদের দাবি, বর্তমানে খেলনার বাজারের প্রায় ৮০ ভাগই দখল করে আছে দেশীয় খেলনা। কিন্তু করোনার কারণে এক বছর ধরে বিক্রি না থাকায় খেলনা কারখানাগুলো লোকসানের মুখে পড়েছে। বড় কারখানাগুলো টিকে থাকলেও বেশির ভাগ ছোট কারখানায় খেলনা উৎপাদন বন্ধ হয়ে গেছে।
খেলনাশিল্পের তরুণ উদ্যোক্তা আমান উল্লাহ প্রথম আলোকে বলেন, ‘এক বছর হয়ে গেল, খেলনাসামগ্রীর বেচাকেনা নেই বললেই চলে। মাঠ পর্যায়ে যদি খেলনার ক্রেতা না থাকে, তাহলে আমরা খেলনা বানিয়ে কোথায় বিক্রি করব? ফলে আমাদেরও বিক্রি অনেক কমেছে। তাই আমরা উৎপাদন কমিয়ে দিয়েছি। কারখানায় শ্রমিকের সংখ্যাও কমিয়েছি। আগে আমার কারখানায় কাজ করতেন ১ হাজার ৪০০ শ্রমিক। বর্তমানে কাজ করেন ৭০০ জন।’
খেলনাশিল্পকে টিকিয়ে রাখা ও এগিয়ে নেওয়ার জন্য চকবাজারের পাইকারি দোকানদার ও কারখানা মালিকদের এখন একটাই দাবি, সরকার যেন এই দুঃসময়ে তাঁদের পাশে থাকে। কারণ, অনেকে পুঁজি হারিয়ে ফেলেছেন। এই খাতের কেউই প্রণোদনার টাকা পাননি। তাঁরা মনে করেন, খেলনা তৈরির সঙ্গে জড়িত তরুণ উদ্যোক্তাদের আর্থিকভাবে সহযোগিতা করা হলে এই শিল্প অনেক দূর এগিয়ে যাবে।
টিএমএমইএর সাধারণ সম্পাদক জাহিদুল হক বলেন, ‘আমরা এই শিল্পটাকে এগিয়ে নিতে সরকারের কাছে সহযোগিতা চাই। যেসব ছোট কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে, তারা যাতে আবার ঘুরে দাঁড়াতে পারে, সেই ব্যবস্থা করা করতে হবে।’