প্রতি মাসেই কর দিতে হবে বড় চাকুরেদের
সরকারি-বেসরকারি সব করযোগ্য চাকুরের পে রোল ট্যাক্স বা বেতন থেকে বাধ্যতামূলক উৎসে কর কেটে রাখতে চায় জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। আয়কর অধ্যাদেশে সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন থেকে উৎসে কর কেটে রাখার বিধান থাকলেও এত দিন তা অনুসরণ করা হতো না। চলতি অর্থবছর থেকে বিষয়টিতে নজর দিচ্ছে এনবিআর।
এনবিআর নিশ্চিত করতে চায়, বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগের সরকারি কর্মকর্তাদের বেতন দেওয়ার সময় উৎসে আয়কর কেটে রাখার বিধানটি যেন অনুসরণ করা হয়। এ জন্য সরকারের হিসাব মহানিয়ন্ত্রকের কার্যালয়ের (সিজিএ) সঙ্গে আলাপ-আলোচনা শুরু হয়েছে।
আয়কর অধ্যাদেশের ৫০ ধারা অনুযায়ী, করযোগ্য সরকারি-বেসরকারি সব কর্মকর্তার মধ্যে প্রতিমাসে বেতন-ভাতা দেওয়ার সময় উৎসে কর কেটে রাখা বাধ্যতামূলক। এত দিন ধারাটি বিস্তৃতভাবে এনবিআর অনুসরণ করেনি; আবার নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানও এ বিষয়ে খুব বেশি আগ্রহ দেখায়নি। তাই খুব বেশি রাজস্ব আদায় করতে পারেনি এনবিআর। মোট উৎসে করের মাত্র ৩ শতাংশের মতো আদায় হয় বেতনের উৎসে কর থেকে।
গত জুলাই থেকে বেতনের ওপর উৎসে কর আদায়ের জন্য তোড়জোড় শুরু করে এনবিআর। ইতিমধ্যে সভা-সেমিনারের পাশাপাশি গণমাধ্যমে বিজ্ঞাপন দিয়ে বেতন থেকে উৎসে কর কাটার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। সেই নির্দেশনা অনুযায়ী, অগ্রিম করের পরিমাণ নির্ধারণের জন্য বার্ষিক আয়, বিনিয়োগের অনুমানভিত্তিক পরিমাণ হিসাব করতে হবে। বিনিয়োগে কর রেয়াত বাদ দিয়ে যে পরিমাণ আয় অবশিষ্ট থাকবে, প্রদেয় কর হিসাব করতে হবে সেটাকে ধরে। এ অনুমিত করের পরিমাণকে ১২ দিয়ে ভাগ করে প্রতি মাসে তা বেতন থেকে কেটে রাখা হবে। সেই কর অগ্রিম কর হিসেবে সরকারি কোষাগারে জমা দিতে হবে। অগ্রিম করের অর্থ কেটে রেখে কর্মীদের বেতন-ভাতা দিতে হবে নিয়োগদাতা প্রতিষ্ঠানকে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে এনবিআর চেয়ারম্যান নজিবুর রহমান গতকাল শনিবার বলেন, বেতন থেকে উৎসে কর কেটে রাখা হলে তা উভয় পক্ষের জন্যই লাভজনক। করদাতাকে বছর শেষে একসঙ্গে অনেক টাকা দিতে হয় না। আবার রাজস্ব বিভাগের প্রতি নিয়োগদাতা প্রতিষ্ঠানের নিয়মনীতিও পালন করা হয়। তিনি আরও বলেন, বেতন-ভাতা থেকে উৎসে কর কাটা আয়কর অধ্যাদেশে বাধ্যতামূলক হলেও এ বছর থেকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে ইতিবাচক সাড়া পাওয়া যাচ্ছে। ইতিমধ্যে এফবিসিসিআই ও বিজিএমইএ এ নিয়ে সভা করেছে।
জানা গেছে, সর্বশেষ ২০১৫-১৬ অর্থবছরে বেতন-ভাতা থেকে মাত্র চার হাজার কোটি টাকার মতো রাজস্ব পাওয়া গেছে। এ বছর থেকে সব মন্ত্রণালয় ও বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা দেওয়ার সময় উৎসে কর কেটে রাখার কথা থাকলেও তা অনুসরণ করা হচ্ছে না। গত জুলাই মাসে পাঁচটি মন্ত্রণালয় ও বিভাগ বেতন থেকে উৎসে কর কাটেনি। এগুলো হলো পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়; বাস্তবায়ন, পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ (আইএমইডি); বেসরকারি বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়; পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় বিভাগ; শ্রম মন্ত্রণালয় এবং বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়। আর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সবচেয়ে বেশি ২৮ লাখ টাকা উৎসে কর কেটেছে। অন্যদিকে বড় বড় বেসরকারি প্রতিষ্ঠানও কর্মীদের বেতন-ভাতা দেওয়ার সময় উৎসে কর কেটে রাখে।
১৯৪০ সালে যুক্তরাষ্ট্রে প্রথম পে রোল ট্যাক্স বা বেতন থেকে উৎসে কর কেটে রাখার বিধান চালু হয়। মূলত দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের বিশাল ব্যয়ভার বহন করতেই যুক্তরাষ্ট্র এ উদ্যোগ নিয়েছিল। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, জার্মানি, ফ্রান্স, জাপান, কানাডার মতো দেশে বেতন থেকে উৎসে কর হার ৩০ থেকে ৫০ শতাংশ। বাংলাদেশে এ হার ৫ শতাংশের মতো।