বাংলাদেশের অর্থের অপেক্ষায় ছিলেন শাখা ব্যবস্থাপক

বিদেশে পালানোর সময় বিমানবন্দর থেকে আটক হন রিজাল ব্যাংকের শাখা ব্যবস্থাপক মায়া সান্তোস দেগুইতো l ​ফিলস্টার
বিদেশে পালানোর সময় বিমানবন্দর থেকে আটক হন রিজাল ব্যাংকের শাখা ব্যবস্থাপক মায়া সান্তোস দেগুইতো l ​ফিলস্টার

বাংলাদেশ ব্যাংকের চুরি হওয়া ৮ কোটি ১০ লাখ ডলার ফিলিপাইন থেকে পাচার হওয়ার জন্য রিজাল কমার্শিয়াল ব্যাংকিং করপোরেশনের (আরসিবিসি) জুপিটার শাখার ব্যবস্থাপক মায়া সান্তোস দেগুইতোকে দায়ী করেছে ওই ব্যাংকের কর্তৃপক্ষ। ফিলিপাইনের অ্যান্টি মানি লন্ডারিং কাউন্সিলকে (এএমএলসি) আরসিবিসির জমা দেওয়া এক প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।
আরসিবিসির অভ্যন্তরীণ তদন্তে মায়া সান্তোস দেগুইতোকে ঘটনার জন্য দায়ী করে বলা হয়েছে, মাকাতি শাখার অন্য কর্মীদের সহায়তায় তিনি এ ঘটনা ঘটিয়েছেন। নিজ উদ্যোগেই ভাউচার তৈরি করে দ্রুতই চুরি হওয়া টাকার লেনদেন সম্পন্ন করেন মায়া সান্তোস দেগুইতো। সেখানে আরও বলা হয়েছে, অর্থ যে বাংলাদেশ ব্যাংকের, সেটি তিনি জানতেন। জেনেও অর্থ সরিয়ে নিতে তিনি সহায়তা করেছেন।
আরসিবিসির তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১৫ সালের মে মাসে খোলা চারটি হিসাবে গত ৫ ফেব্রুয়ারি মোট ৮ কোটি ১০ লাখ ডলার জমা করা হয়। এর মধ্যে জেসি ক্রিস্টোফারের হিসাবে জমা হওয়া ৩ কোটি ডলারের মধ্যে ২ কোটি ২৭ লাখ ডলার একই দিনে উত্তোলন করে উইলিয়াম এস গো নামের আরেক ব্যবসায়ীর হিসাবে জমা করা হয়। উইলিয়াম গোর হিসাব থেকেই এই অর্থ পরবর্তীকালে বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেনকারী প্রতিষ্ঠান ফিলরেমের হাতে চলে যায়।
সিনেটের শুনানিতে অংশ নিয়ে উইলিয়াম গো বলেন, তাঁর অনুমতি না নিয়ে হিসাব খোলেন আরসিবিসির শাখা ব্যবস্থাপক দেগুইতো। এরপর ওই হিসাবের মাধ্যমে অর্থ লেনদেনের জন্য মায়া সান্তোস দেগুইতো তাঁকে ১ কোটি ফিলিপিনো পেসো ঘুষ সাধেন। যদিও গোর এই অভিযোগ অস্বীকার করেন দেগুইতো।
স্বাক্ষর ছাড়াই লেনদেন: আরসিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অর্থ তোলা ও জমা দেওয়ায় ব্যবহৃত স্লিপ, ফান্ড ট্রান্সফার ফর্ম ও উইলিয়াম গো হিসাবের চেক—কোথাও গ্রাহকের স্বাক্ষর ছিল না। জমাদানকারীর স্বাক্ষর ছাড়াই মোট পাঁচটি হিসাবে অর্থ লেনদেন করা হয়। এসব বিষয় জেনেও চেপে যান দেগুইতো।
দেগুইতোর তথ্য গোপনের প্রমাণ হিসেবে ওই সময় তাঁর ফোনকল রেকর্ডের কথোপকথনও যুক্ত করা হয়েছে প্রতিবেদনে। ওই সব কথোপকথনে দেগুইতো যাদের সঙ্গে কথা বলেন, তাদের বোঝানোর চেষ্টা করেন, গ্রাহকেরা তাঁর পূর্ব পরিচিত এবং তারা যে বড় অঙ্কের অর্থ লেনদেন করবে, সেটিও তিনি আগে থেকেই জানেন। যথাযথ কাগজপত্র ও নিয়ম মেনেই এসব হিসাবে লেনদেন করা হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের বার্তা উপেক্ষা: ফেব্রুয়ারির ৯ তারিখে ওই চার হিসাবের অর্থ লেনদেন জব্দ করার জন্য আরসিবিসিকে বার্তা পাঠায় বাংলাদেশ ব্যাংক। এমন বার্তা পাওয়ার পরও ওই চার হিসাব থেকে একই দিনে ৫ কোটি ৮১ লাখ ৫০ হাজার সরিয়ে ফেলা হয়। ৯ ফেব্রুয়ারি মধ্যাহ্নে চারটি ই-মেইল আরসিবিসির জুপিটার শাখাকে পাঠায় একই ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের লেনদেন নিষ্পত্তি বিভাগ। ওই মেইলে জুপিটার শাখা থেকে সরিয়ে ফেলা অর্থ ফেরত আনার জন্য বলা হয়।
প্রাণনাশের হুমকি: মায়া সান্তোস দেগুইতো তাঁর দুজন সহকর্মীকে জানান, নিজের ও পরিবারের প্রাণনাশের হুমকি পেয়েছেন তিনি। তাই যেভাবেই হোক, এই অর্থ লেনদেন সম্পন্ন করতে হবে। পুরো এই কাজে দেগুইতোকে সহায়তা করেন রিজাল ব্যাংকের ওই শাখার রেমার্ট মারবেলা ও অ্যাঞ্জেলা তোরেস নামের দুজন কর্মী। এ ঘটনা ওই শাখার অন্য কর্মীদেরও জড়িত থাকার বিষয়টিকে সামনে এনেছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। দেগুইতোর দাবি, উইলিয়াম গোর হিসাব বাদে বাকি চারটি হিসাব যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করেই খোলা হয়েছিল।
এএমএলসির মামলা: অর্থ পাচারের ঘটনায় ফিলিপাইনের ডিপার্টমেন্ট অব জাস্টিসে (ডিওজে) একটি মামলা করে এএমএলসি। সেখানে বলা হয়, আরসিবিসির যেসব হিসাব ব্যবহার করে অর্থ লেনদেন করা হয়েছে, তার প্রতিটি হিসাবই খোলা হয়েছে ভুয়া তথ্য দিয়ে। ফেব্রুয়ারির ৯ তারিখে ৬৮ হাজার ডলার জব্দ করে রিজাল ব্যাংক। ওই দিনই আরসিবিসির জুপিটার শাখার বিরুদ্ধে একটি সন্দেহজনক লেনদেন প্রতিবেদন (এসটিআর) দায়ের করা হয়। ৯ ফেব্রুয়ারি জুপিটার শাখার সব সিসি ক্যামেরাও বন্ধ থাকার প্রমাণ পায় আরসিবিসির তদন্ত কমিটি। এসব ঘটনায় ১৬ ফেব্রুয়ারি সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হয় দেগুইতোকে। ফিলরেম যাতে রিজাল ব্যাংকে আর কোনো নতুন হিসাব খুলতে না পারে, এমন নির্দেশনাও দেয় তদন্ত কমিটি। মার্চের ১ তারিখে সন্দেহজনক ওই হিসাবগুলো জব্দ করা হয়।
দেগুইতোর বিরুদ্ধে অভিযোগ: ডিওজেতে করা মামলার অভিযোগে মায়া সান্তোস দেগুইতোর সম্পর্কে বলা হয়, সন্দেহভাজন চারটি হিসাবের অর্থ যে বাংলাদেশ ব্যাংকের, সেটি তিনি জানতেন। বিষয়টি জানার পরও অর্থের এই পুরো লেনদেন বন্ধে একাধিক অনুরোধও তিনি উপেক্ষা করেছেন। নয় মাস আগে সন্দেহজনকভাবে চারটি হিসাব খোলা হলেও সেগুলোর পরিচয় নিশ্চিতে শাখা ব্যবস্থাপক হিসেবে দেগুইতো সম্পূর্ণ ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছেন। একই সঙ্গে সন্দেহভাজন এসব ব্যক্তিকে অর্থ উত্তোলনেও তিনি সহায়তা করেছেন।