বাজারে ঢুকলেই চিনিগুঁড়া!

ঈদে চিনিগুঁড়া চালের চাহিদা বেড়ে যায়। ছবিটি শনিবার কারওয়ান বাজার থেকে তোলা। ছবি : আবদুস সালাম
ঈদে চিনিগুঁড়া চালের চাহিদা বেড়ে যায়। ছবিটি শনিবার কারওয়ান বাজার থেকে তোলা। ছবি : আবদুস সালাম

গরুর মাংসের মতো দশা হয়েছে পোলাওয়ের চালের। ভারতীয় গরু কিংবা মহিষ জবাই করে বিক্রির সময় হয়ে যায় ‘দেশি গরুর মাংস’। ঠিক একইভাবে সব ধরনের পোলাওয়ের চাল হয়ে যায় ‘চিনিগুঁড়া’। রাজধানী ঢাকা শহরের বাজার, পাড়া-মহল্লার মুদি দোকান—সব জায়গায়তেই চিনিগুঁড়া নামে পোলাওয়ের চাল বিক্রি চলছে। অথচ চিনিগুঁড়া জাতের ধান এখন অনেকটাই বিলুপ্তির পথে।

‘এক নম্বর চিনিগুঁড়া’, ‘দুই নম্বর চিনিগুঁড়া’ এমনকি ‘তিন নম্বর চিনিগুঁড়া’ তকমা লাগিয়ে দোকানিরা পোলাওয়ের চাল বিক্রি করে থাকেন। এভাবে চিনিগুঁড়া নামে ক্রেতাদের কাছে বিক্রি হচ্ছে আতপ চাল। কখনো কখনো কালিজিরা চালও বিক্রি হয়। আবার আসল চিনিগুঁড়ার সঙ্গে কালিজিরা কিংবা আতপ—দুই ধরনের চালও মেশানো হয়ে থাকে। রন্ধনবিশারদদের মতে, এসব চালে রান্না করা পোলাও খেতেও সুস্বাদু হয় না। আবার এর ভাতও বেশ নরম হয়ে যায়।

পোলাও রান্না হয়ে থাকে সাধারণত চিনিগুঁড়া ও কালিজিরা চাল দিয়ে। ঈদ কিংবা বিয়েসহ বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠানের খাবার তালিকায় পোলাও একটি প্রধান অনুষঙ্গ। বছরের অন্যান্য সময়ের চেয়ে ঈদ উপলক্ষে পোলাওর চালের বিক্রি কয়েক গুণ বেড়ে যায়।
চেইনশপ ‘স্বপ্ন’র বাণিজ্যিক কর্মকর্তা আহসান আজহার সোপান প্রথম আলোকে বলেন, রোজা ও ঈদ উপলক্ষে পোলাও খাওয়ার চাহিদা থাকে। তাই চিনিগুঁড়া বা কালিজিরা চালের বিক্রি চার গুণ বৃদ্ধি পায়। চিনিগুঁড়া চাল পাওয়া যায় চাঁপাইনবাবগঞ্জ, দিনাজপুর জেলায়। কালিজিরা চাল আসে শেরপুর জেলা থেকে।

চিনিগুঁড়া চালের ধরন : রাজশাহী, দিনাজপুর ছাড়াও বগুড়া, নওগাঁর মিলেও চিনিগুঁড়া চাল প্রক্রিয়াজাত করা হয় বলে জানা গেছে। চিনিগুঁড়া জাতের ধান থেকে সুগন্ধি চাল পাওয়া যায়। অগ্রহায়ণ বা নভেম্বর মাসে এর ধান কাটা হয়ে থাকে। প্রক্রিয়াজাতের পর ডিসেম্বর মাসে চিনিগুঁড়া চাল বাজারে আসে। নতুন অবস্থায় এই চালে বেশ সুগন্ধ থাকে। তবে যত পুরোনো হতে থাকে, এর ঘ্রাণের মাত্রা কমতে থাকে। এই সুযোগের ফায়দা নিয়ে অসাধু ব্যবসায়ীরা অন্য জাতের চাল চিনিগুঁড়ার সঙ্গে মিশিয়ে দেন। অনেকে আবার কালিজিরা চালকে চিনিগুঁড়া চাল নাম দিয়ে বিক্রি করেন।
নওগাঁ জেলার মেসার্স অ্যারোমেটিক অটো রাইসমিলের মালিক বেলাল হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, এখন আর চিনিগুঁড়া ধান পাওয়া যায় না। এই ধানে উৎপাদন কম। আবাদে খরচও বেশি। বিআর ৩৪ জাতের ধান উদ্ভাবন করেছে বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট। এই ধান থেকে যে চাল পাওয়া সেটিকেই চিনিগুঁড়া চাল বলা হয়। কারণ বিআর৩৪ চাল বললে তো পোলাওয়ের চাল বিক্রি হবে না। তবে উদ্ভাবিত ধানের মান অনেকটাই আসল চিনিগুঁড়া চালের মতো।

প্রতি কেজি চিনিগুঁড়া চাল ৮২ থেকে ১১৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। ছবিটি শনিবার কারওয়ান বাজার থেকে তোলা। ছবি : আবদুস সালাম
প্রতি কেজি চিনিগুঁড়া চাল ৮২ থেকে ১১৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। ছবিটি শনিবার কারওয়ান বাজার থেকে তোলা। ছবি : আবদুস সালাম

বেলাল হোসেন বলেন, চিনিগুঁড়া চাল আকারে বেশ ছোট। অনেকে এর সঙ্গে অন্য জাতের চাল মিশিয়ে বিক্রি করেন। তবে ক্রেতাদের ভালো করে পরীক্ষা করে কিনতে হবে। মিশানো চালের রং দুই ধরনের হয়ে থাকে।
বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা (জিআরএস) খালেকুজ্জামান প্রথম আলোকে বলেন, বাজারে যে চিনিগুঁড়া চাল পাওয়া যায়, তার বড় অংশই বিআর৩৪ জাতের ধান থেকে এসেছে। তবে চিনিগুঁড়া ধানের চালও আছে।

চিনিগুঁড়া চাল ধোয়ার পরও সুগন্ধ অটুট থাকে বলে জানান রন্ধনবিশারদেরা। বাংলাদেশ বিমান কাটারিং সেন্টারের প্রধান পাচক (চিফ শেফ) মো. শাহজাহান প্রথম আলোকে বলেন, আসল চিনিগুঁড়ার মতো সুগন্ধ এখন আর মেলে না। আগে ঢেঁকিতে প্রক্রিয়াজাত করা হতো। এখন চিনিগুঁড়া চাল মিলের মেশিনে যেভাবে সেদ্ধ করা হয় তাতে এর ঘ্রাণ থাকে না।

চিনিগুঁড়ার দামের রকমফের : নওগাঁ জেলার মেসার্স অ্যারোমেটিক অটো রাইসমিলের মালিক বেলাল হোসেন বলেন, পাইকারি মূল্যে চিনিগুঁড়া চাল ৭৮ টাকা কেজি দরে বিক্রি করেন তাঁরা। খুচরা বাজারে এর দাম বেড়ে যায়। রমজান মাসে এই চালের দাম বৃদ্ধি পায়নি বলেন জানান তিনি।
তবে ঢাকার বিভিন্ন বাজারে রমজান মাসে তিন থেকে ছয় টাকা বৃদ্ধি পেয়েছে। আজ শনিবার মিরপুর ১০ নম্বর চালের বাজারে এক কেজি চিনিগুঁড়া চালের দাম ৮২ টাকা। কারওয়ান বাজারে এর দাম রাখা হচ্ছে ৯০ টাকা। চেইনশপ স্বপ্নে খোলা অবস্থায় চিনিগুঁড়া রাখা হচ্ছে ৮৫ টাকা। তারা প্যাকেট করে বিক্রি করছে ১০২ টাকায়। প্রাণের এক কেজি চিনিগুঁড়ার দাম ১১০ টাকা। রূপচাঁদা ও ফ্রেশের ১১০ টাকা, ড্যানিশ ও চাষীর ১০৬ টাকা, খুশবুর ১১৫ টাকা, আড়ংয়ের চিনিগুঁড়া চাল ১১২ টাকায় বিক্রি করা হচ্ছে।