ভেজালমুক্ত খাবার পেতে তরুণদের বিপণন ধারণা

বাংলাদেশে খাবারে ভেজাল—এটা সর্বজনবিদিত। ভেজাল কীভাবে দূর করা যায়, তা নিয়ে বিভিন্ন মহলে প্রায়ই আলোচনা হয়। এবার বিপণনব্যবস্থার মাধ্যমে ভেজাল দূর করার এক প্রতিযোগিতা হয়ে গেল। এতে ভেজাল প্রতিরোধে অভিনব কিছু ধারণা দিলেন দেশের খ্যাতনামা বিশ্ববিদ্যালয়ের তরুণ শিক্ষার্থীরা। তাঁরা দেখালেন যে আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে খাদ্যে ভেজালের মাত্রা উল্লেখযোগ্য হারে কমিয়ে আনা সম্ভব।
ব্র্যান্ডউইটজ ২০১৪ প্রতিযোগিতার চূড়ান্ত পর্বে এসব ধারণা নিয়ে প্রতিযোগিতা হয়েছে। গত শনিবার র্যাডিসন হোটেলে এই প্রতিযোগিতার চূড়ান্ত পর্ব অনুষ্ঠিত হয়। প্রতিযোগিতার আয়োজন করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসায় প্রশাসন প্রতিষ্ঠানের (আইবিএ) কমিউনিকেশন ক্লাব।
চূড়ান্ত পর্বের বিষয় ছিল ভেজালমুক্ত খাদ্য কীভাবে নিশ্চিত করা যায়। চূড়ান্ত পর্বে দেশের খ্যাতনামা বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঁচটি দল অংশ নেয়। উল্লেখ্য, এই প্রতিযোগিতাটি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য একটি বিপণন ধারণার প্রতিযোগিতা।
দলগুলোর উপস্থাপিত ধারণা মূল্যায়ন করে চ্যাম্পিয়ন দল ঘোষণা করেছেন বিচারকেরা। এবারের প্রতিযোগিতায় চ্যাম্পিয়ন হয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসায় প্রশাসন প্রতিষ্ঠানের (আইবিএ) দ্য এ ডিম।
চ্যাম্পিয়ন দল দ্য এ ডিম যে ধারণা উপস্থাপনা করেছে, তাতে আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে (২০২০ সালের মধ্যে) খাদ্যে ভেজালের মাত্রা ২০ শতাংশে নামিয়ে আনা সম্ভব। এ জন্য আইনের কঠোর প্রয়োগের জন্য স্বাস্থ্য পুলিশ দল গঠনের সুপারিশ করেছে তারা। দলটি বলছে, পুলিশ ও আনসার বাহিনী থেকে সদস্য নিয়ে স্বাস্থ্য পুলিশ গঠন করা যেতে পারে। আর খাদ্যে ভেজাল দেওয়া হচ্ছে কি না কিংবা ভেজালমিশ্রিত খাবার বাজারজাত করা হচ্ছে কি না, এসব তদারকি করার জন্য হাটবাজার, পণ্য ওঠানো-নামানোর স্থানে স্বাস্থ্য পুলিশ নিয়োগ করা যেতে পারে।
নীতিনির্ধারকদের দৃষ্টি আকর্ষণের জন্যই মূলত স্বাস্থ্য পুলিশ গঠনের সুপারিশ করেছে দলটি।
অন্যদিকে প্রচার-প্রচারণার ওপরও বেশ গুরুত্ব দিয়েছে চ্যাম্পিয়ন দল দ্য এ ডিম। উদাহরণ দিয়ে বলা যায়, উত্তরবঙ্গের আঞ্চলিক সংগীত গম্ভীরা, বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দলের অধিনায়ক মুশফিকুর রহিম, সংগীতশিল্পী মমতাজ, চিত্রনায়ক শাকিব খানের মতো ব্যক্তিদের সম্পৃক্ত করার সুপারিশ করেছে দলটি।
এ ছাড়া দলটি মনে করে, মসজিদভিত্তিক প্রচারণার মাধ্যমে ভালো ফল পাওয়া যেতে পারে। নির্বাচিত কৃষকদের পণ্য সংরক্ষণ ও প্যাকেটজাত করার প্রশিক্ষণ দেওয়া হলেও ভেজালমুক্ত খাবার নিশ্চিত করা যাবে।
দ্য এ ডিম যে ধারণা উপস্থাপন করেছে, তাতে এসব কার্যক্রম পরিচালনা করতে আগামী পাঁচ বছরে ব্যয় ধরা হয়েছে সাত কোটি ছয় লাখ টাকা। তবে এই টাকা খরচের সামর্থ্য কিংবা সুযোগ নেই তাদের। মূলত দলটি বলতে চেয়েছে, এত অল্প টাকায় ভেজালমুক্ত খাদ্য নিশ্চিত করা যায়।
এটি শুধু চ্যাম্পিয়ন দলের ধারণা। ‘ভেজাল হটাও, জীবন বাঁচাও’ শীর্ষক ধারণাটি উপস্থাপন করেই বিচারকদের বিবেচনায় দলটি চ্যাম্পিয়ন হয়েছে। দলের সদস্যরা হলেন ডি এম ইমতিয়াজ শাহজাহান, আকিব মইন, এইচ এম ইফতেখার মাহমুদ ও ইনামুজ্জামান।
‘ভেজাল থামান, জীবন বাঁচান’ শিরোনামে নিজেদের কর্মপরিকল্পনা দিয়ে আইবিএর অপর দল সিমপ্লেক্স প্রথম রানার্সআপ এবং ‘সুস্থ বাংলাদেশ’ শিরোনামের উপস্থাপনা দিয়ে নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের জে জে অ্যান্ড দ্য চৌধুরীস দ্বিতীয় রানার্সআপ হয়েছে। চূড়ান্ত পর্বে ওঠা অপর দুটি দল হলো আইবিএর শিনডিগ ও বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালস (বিইউপি) ম্যাড ম্যান। প্রতিযোগিতার চূড়ান্ত পর্বে প্রতিটি দলই বাংলাদেশ থেকে কীভাবে খাদ্যের ভেজাল প্রতিরোধ করা যায়, তার ওপর উপস্থাপনা দেয়।
চ্যাম্পিয়ন দল পুরস্কার হিসেবে পায় দেড় লাখ টাকা ও ক্রেস্ট। আর প্রথম ও দ্বিতীয় রানার্সআপ দল পায় যথাক্রমে ৭৫ হাজার টাকা ও ৫০ হাজার টাকা।
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ব্যবসায়িক সৃজনশীলতা প্রকাশের এবারের প্রতিযোগিতায় ১৭টি বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪২টি দল অংশ নেয়। গত আগস্ট মাসজুড়ে তিনটি ধাপে প্রতিযোগিতাটি অনুষ্ঠিত হয়। এর ধারাবাহিকতায় শনিবার চূড়ান্ত পর্ব হয়।
দীর্ঘ প্রায় চার ঘণ্টা প্রতিযোগী দলগুলো উপস্থাপনা দেয়। এরপর চ্যাম্পিয়ন ও রানার্সআপ দলগুলোর নাম ঘোষণা করেন বিচারকেরা। বিচারক ছিলেন বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ, স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকের হেড অব করপোরেট অ্যাফেয়ার্স বিটপী দাশ চৌধুরী এবং ইউনিলিভারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জাবেদ আখতার।
অনুষ্ঠানের শেষ পর্বে বিজয়ী দলগুলোর মধ্যে পুরস্কার বিতরণ করা হয়। পুরস্কার বিতরণ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহ-উপাচার্য (শিক্ষা) নাসরিন আহমাদ। বক্তব্য দেন আইবিএর পরিচালক ইকবাল আহমেদ, বম্বে সুইটসের হেড অব মার্কেটিং ডি ডি ঘোষাল এবং আইবিএ কমিউনিকেশন ক্লাবের সমন্বয়কারী সুতপা ভট্টাচার্য।
এবারের প্রতিযোগিতার মূল স্পনসর বম্বে সুইটস ও সহযোগী স্পনসর প্রথম আলো। এ ছাড়া মিডিয়া পার্টনার চ্যানেল আই ও এফএম পার্টনার রেডিও এবিসি।