মাসে ৭০ হাজার ঘরে সৌরবিদ্যুৎ

মাসে ৭০ হাজার ঘরে সৌরবিদ্যুৎ
মাসে ৭০ হাজার ঘরে সৌরবিদ্যুৎ

বাংলাদেশের সবচেয়ে উত্তরের জেলা পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়া উপজেলার ভজনপুর ইউনিয়নের ডিমাগজ গ্রামের বাসিন্দা সরকার হায়দার। ১০ বছর ধরে তিনি ৮৫ ওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন একটি প্যানেল দিয়ে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহার করছেন। বাসায় চারটি বাতি, একটা পাখা ও একটি সাদাকালো টিভি চালাচ্ছেন তিনি।
এই সৌর প্যানেলটি ১০ বছর আগে কিস্তিতে ৪১ হাজার টাকায় কিনেছিলেন তিনি। এখন পর্যন্ত কোনো সমস্যা হয়নি। তবে চার বছর আগে একবার ব্যাটারি নষ্ট হয়েছিল। মূল্য পরিশোধ করে নতুন ব্যাটারি পেয়েছেন। গ্রীষ্মকালে ভালোই চলে। তবে সমস্যা একটাই—বর্ষা ও শীত মৌসুমে পর্যাপ্ত সূর্যের আলো পাওয়া যায় না। তখন তাই সব সময় বিদ্যুৎ পাওয়া যায় না।
একই উপজেলার দেবনগর ইউনিয়নের কামাতপাড়া গ্রামের আজম চৌধুরীও পাঁচ বছর ধরে সৌরবিদ্যুতে পাঁচটা বাতি, একটা পাখা ও একটা সাদাকালো টিভি চালাচ্ছেন। ৩২ হাজার টাকায় ৬৫ ওয়াটের প্যানেল দিয়ে এই বিদ্যুৎ ব্যবহার করছেন। তবে তিনি মনে করেন, দাম একটু বেশি। শীত ও বর্ষাকালে সব সময় সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহার করা যায় না। তবে সুবিধা হলো কোনো বিল দিতে হয় না।
এভাবেই বদলে যাচ্ছে পঞ্চগড়ের মানুষের জীবন। বর্তমানে জেলার ১০ হাজার পরিবার সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহার করছে। এই অঞ্চলে গ্রামীণ শক্তি, আরডিআরএসসহ বেশ কিছু বেসরকারি প্রতিষ্ঠান সৌরবিদ্যুৎ প্যানেল বিক্রির ব্যবসার সঙ্গে জড়িত রয়েছে। পল্লী বিদ্যুৎ ও বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের হিসাবমতে, এই জেলার ৮০ শতাংশের বেশি অঞ্চলে বিদ্যুৎ সুবিধা নেই। পঞ্চগড় জেলায় প্রায় পাঁচ লাখ পরিবার রয়েছে। এখনো বিপুলসংখ্যক পরিবার বিদ্যুতের বাইরে রয়েছে।
এবার আসা যাক উপকূলীয় অঞ্চলে। সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার প্রত্যন্ত গ্রাম ভেটখালীর বাসিন্দা সমীরণ মিস্ত্রি। মাদার নদীর তীরে তাঁর বাড়ি, যেখানে বিদ্যুৎ সরবরাহের কথা কল্পনাতীত। কিন্তু ছেলেমেয়েদের লেখাপড়া, সন্ধ্যার রান্নাবান্না আর রাতে খাওয়ার কাজটা নির্বিঘ্নে শেষ করতেই সৌরবিদ্যুৎ নিয়েছেন তিনি।
বংশীপুর এলাকার আবদুল্লাহ সরদারের বাড়িতে আগে থেকেই বিদ্যুৎ-সংযোগ ছিল। কিন্তু লোডশেডিংয়ের কারণে প্রায়ই ঝক্কিঝামেলা পোহাতে হয়। প্রয়োজনীয় সময়ে নিজেদের মতো করে লাইট, টিভি ও ফ্যান ব্যবহার করতেই সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহার করছেন তিনি।
শুধু সমীরণ কিংবা আবদুল্লাহ নন, বরং এই উপকূলীয় জনপদের ২২ হাজার পরিবার এখন সৌরবিদ্যুতের ওপর নির্ভরশীল।
সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলায় ২১৯টি গ্রামে প্রায় ৮০ হাজার পরিবার বাস করে। বিদ্যুৎ ঘাটতির পাশাপাশি দুর্গম আর প্রত্যন্ত ওই সব অঞ্চলে বিদ্যুৎ সরবরাহের বিষয়টি দুরূহ। উপকূলবর্তী শ্যামনগর উপজেলায় আরএসএফ, সৃজনী, গ্রামীণ শক্তিসহ ৪০টি সৌরবিদ্যুৎ সিস্টেম সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান রয়েছে।
কক্সবাজারের রামু উপজেলার দুর্গম পাহাড়ি জনপদ গর্জনিয়া ইউনিয়ন। ইউনিয়নের ৩৪ হাজার মানুষ স্বাধীনতার পর থেকে বিদ্যুৎ চোখে দেখেনি। তবে বিগত এক যুগ ধরে সৌরবিদ্যুৎ নিয়েছে এলাকার অনেক পরিবার।
বোমাংখিল গ্রামের বাসিন্দা হাফিজুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, সৌরবিদ্যুৎ সিস্টেম চালু হওয়ার পর এলাকা থেকে কিছু কুপিবাতি (চেরাগ) উঠে গেছে ঠিক; কিন্তু এই বিদ্যুৎ দিয়ে মানুষ রঙিন টেলিভিশন দেখবে দরের কথা, শিক্ষার্থীরা কম্পিউটারও চালাতে পারছে না। ফলে তথ্যপ্রযুক্তি থেকে বঞ্চিত হচ্ছে এলাকার শিক্ষার্থীরা।
গ্রাহকেরা অভিযোগ করেন, এই বিদ্যুৎ দিয়ে ঘরের আন্ধকার কিছুটা দূর হলেও অন্য কোনো কাজ করা যাচ্ছে না। সামান্য বিদ্যুতে সাদা-কালো টিভি দেখা যায় না। বর্ষা মৌসুমে সূর্যের আলো না থাকায় সৌরবিদ্যতের সিস্টেমগুলো অচল হয়ে পড়েছে।
এখন সারা দেশে ৪৮টি প্রতিষ্ঠান সৌরবিদ্যুৎ প্যানেল বিক্রির ব্যবসায় জড়িত রয়েছে। তবে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থার অন্যতম সমস্যা হলো—বর্ষা ও শীত মৌসুমে পর্যাপ্ত সূর্যের আলো পাওয়া যায় না। তাই এ সময়ে চাহিদা অনুযায়ী বিদ্যুৎও পাওয়া যায় না।
এই সম্পর্কে জানতে চাইলে বাংলাদেশ সোলার অ্যান্ড রিনিউবল এনার্জি অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি দীপাল চন্দ্র বড়ুয়া প্রথম আলোকে বলেন, ‘প্রযুক্তি দিয়ে এই সমস্যার সমাধান আপাতত করা যাবে না। একটি ব্যাটারি পুরোপুরি চার্জ হলে একটানা ১৫ ঘণ্টার মতো বিদ্যুৎ পাওয়া সম্ভব। বর্ষা বা শীত মৌসুমে যদি দৈনিক পাঁচ ঘণ্টা করে বিদ্যুৎ ব্যবহার করা যায়, তাহলে টানা তিন দিন সূর্যের আলো পাওয়া না গেলেও কোনো সমস্যা হবে না। এ জন্য বর্ষা ও শীত মৌসুমে বিদ্যুৎ ব্যবহারে গ্রাহককে একটু সচেতন হতে হবে।’
মূলত সোলার প্যানেলের মাধ্যমে সূর্যের আলো থেকে শক্তি আহরণ করে তা বিদ্যুতে রূপান্তরিত করা হয়। তারপর সেই বিদ্যুৎ দিয়ে বিজলী বাতি, পাখা, টেলিভিশন চালানো হয়। যেখানে বিদ্যুৎ পৌঁছানো সম্ভব হয়নি, সেখানেই সৌরশক্তিকে কাজে লাগিয়ে বিদ্যুতের চাহিদা মেটানো হচ্ছে।
প্রতি মাসে ৭০ হাজার পরিবারে সৌরবিদ্যুৎ:
বাংলাদেশে প্রতি মাসে প্রত্যন্ত অঞ্চলে গড়ে ৭০ হাজার সৌর প্যানেল সংযোজিত হচ্ছে। এর মানে হলো ৭০ হাজার পরিবার সৌরবিদ্যুৎ নিচ্ছে। তবে মৌসুমভেদে এই বেচাকেনা হ্রাস-বৃদ্ধি হয়। গ্রীষ্ম মৌসুমে বেশি, আর শীত বা বর্ষায় কম সৌর প্যানেল বিক্রি হয়। সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থার সম্প্রসারণের দিক থেকে বাংলাদেশ অন্যতম ক্রমবর্ধনশীল দেশ।
বিশ্বব্যাংকের সহায়তায় ২০০৩ সালে প্রথম সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা চালু হয়। বাংলাদেশ রুরাল ইলেকট্রিফিকেশন অ্যান্ড রিনিউবল এনার্জি ডেভেলপমেন্ট (আরইআরইডি) প্রকল্পের মাধ্যমে বিদ্যুৎ পৌঁছায়নি এমন এলাকায় সৌরশক্তির বিদ্যুৎ পৌঁছানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়। এই প্রকল্পটি ইনফ্রাস্ট্রাকচার ডেভেলপমেন্ট কোম্পানির (ইডকল) মাধ্যমে বাস্তবায়িত হচ্ছে। চলবে ২০১৬ সাল পর্যন্ত।
এই খাতের উদ্যোক্তাদের ব্যবসা শুরু করার জন্য স্বল্পসুদে ৭০ শতাংশ আর্থিক সহায়তা দিয়ে থাকে ইডকল। এসব প্রতিষ্ঠান মাঠপর্যায়ে প্যানেল সংযোজন বা বিক্রি করে থাকে। আবার কয়েকটি প্রতিষ্ঠান প্যানেল, ব্যাটারি, বাতি তৈরি বা সংযোজন করে থাকে। তাই সৌরবিদ্যুৎ ব্যবসার দিক থেকেও একটি সফল খাত।
২০০৩ সালে মাত্র ২৫ হাজার পরিবার সৌর প্যানেল নিয়েছিল। ২০১৪ সালের এপ্রিল মাস পর্যন্ত ৩০ লাখ পরিবার সৌর প্যানেল নিয়েছে। এতে প্রায় এক কোটি ৩০ লাখ লোকের কাছে সৌরবিদ্যুৎ পৌঁছেছে। ইডকলের হিসাবে, বাংলাদেশের ৯ শতাংশ মানুষ এখন সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহার করে। বাংলাদেশের ৫৮ শতাংশ পল্লি অঞ্চলে এখনো বিদ্যুৎ পৌঁছায়নি। সরকার ২০২১ সালের মধ্যে সব মানুষের কাছে বিদ্যুৎ পৌঁছে দিতে চায়। কীভাবে এ লক্ষ্য অর্জিত হবে? এই কঠিন লক্ষ্য অর্জনে অন্যতম প্রধান হাতিয়ার এখন সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা।
গ্রাহকের জন্য সৌরবিদ্যুতের বিভিন্ন ধরনের প্যাকেজ থাকে। গ্রাহকেরা তাঁদের চাহিদা অনুযায়ী প্যাকেজ কিনে থাকেন। সর্বনিম্ন ১০ ওয়াটের প্যাকেজে দুটি বাতি জ্বলে। এটির দাম ১০ হাজার টাকা। গ্রাহকেরা চাইলে কিস্তিতে দাম পরিশোধ করতে পারেন। সে ক্ষেত্রে এককালীন ১০ শতাংশ বা এক হাজার টাকা পরিশোধ করে বাকি নয় হাজার টাকা তিন বছরে কিস্তিতে দেওয়ার সুযোগ রযেছে। এই সুবিধা সব প্যাকেজের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। সর্বোচ্চ ১৩০ ওয়াটের প্যাকেজ দিয়ে বাতি ও পাখা চলে। এটির দাম ৪০ হাজার টাকা।
কর্মসংস্থান: এই খাতে এই পর্যন্ত প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে বাংলাদেশে প্রায় দুই লাখ লোকের কর্মসংস্থান হয়েছে। বাংলাদেশ সোলার অ্যান্ড রিনিউবল এনার্জি অ্যাসোসিয়েশনের হিসাবে, সৌর প্যানেল বিক্রি বা সংযোজন ব্যবসায় প্রায় এক লাখ ২০ হাজার লোকের কর্মসংস্থান হয়েছে। আর সোলার প্যানেল তৈরি, ব্যাটারি, বাল্বসহ অন্যান্য যন্ত্রপাতি তৈরির কারখানায় আরও প্রায় ৮০ হাজার লোকের কর্মসংস্থান হয়েছে। বর্তমানে ২০টি প্রতিষ্ঠান ব্যাটারি ও ছয়টি প্রতিষ্ঠান সৌর প্যানেল তৈরি করে।
সোলার প্যানেল বিক্রি বা সংযোজন করে থাকে ব্রাইটগ্রিন এনার্জি ফাউন্ডেশন। এই প্রতিষ্ঠানটি ২০১০ সালে যাত্রা শুরু করে। সে সময় মাত্র ১৫ জন কর্মী কাজ করতেন এই প্রতিষ্ঠানে। এখন প্রায় দুই হাজার কর্মী কাজ করেন।
সংযুক্ত আরব আমিরাতভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ইন্টারন্যাশনাল রিনিউবল এনার্জি এজেন্সির (আইআরএনএ) ২০১৩ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই পর্যন্ত সারা বিশ্বে নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে ৬৫ লাখ কর্মসংস্থান হয়েছে। এর মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান সপ্তম। বাংলাদেশে বিগত ১০ বছরে এক লাখ ১৪ হাজার কর্মসংস্থান হয়েছে। চীনে সবচেয়ে বেশি ২৬ লাখ ৩০ হাজার কর্মসংস্থান হয়েছে । এ ছাড়া, ভারতে মোট তিন লাখ ৯১ হাজার কর্মস্থান হয়েছে। গত মে মাসে এই প্রতিবেদনটি প্রকাশ করে আইআরএনএ।
(প্রতিবেদন তৈরিতে সহায়তা করেছেন প্রথম আলোর নিজস্ব প্রতিবেদক কল্যাণ ব্যানার্জি, (সাতক্ষীরা) ও আবদুল কুদ্দুস (কক্সবাজার) এবং পঞ্চগড় প্রতিনিধি শহীদুল ইসলাম)।
 যাত্রা শুরু ২০০৩ সালে। এ পর্যন্ত কর্মসংস্থান হয়েছে দুই লাখ লোকের
 ৪৮টি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান পল্লি অঞ্চলে সৌরবিদ্যুৎ প্যানেল বিক্রি করছে
 সৌরবিদ্যুৎ খাতে কর্মসংস্থানে বাংলাদেশ এখন বিশ্বে সপ্তম
আর্থিক সহায়তা
এ ব্যবসা শুরু করতে উদ্যোক্তাদের স্বল্পসুদে ৭০ শতাংশ আর্থিক সহায়তা দেয় ইডকল
বর্তমান গ্রাহক
১১ বছরে এক কোটি ৩০ লাখ লোকের কাছে সৌরবিদ্যুৎ পৌঁছেছে