
ব্যাংক খাত থেকে বহুল আলোচিত হল-মার্কের মতো একই প্রক্রিয়ায় অর্থ বের করে নিয়েছিল বেক্সিমকো গ্রুপ। অর্থ বের করে নেওয়ার ঘটনা ঘটে ২০১০-১২ সালে। ব্যাংকগুলোয় শিল্পগোষ্ঠীটির যে ঋণগুলো পুনঃ তফসিল হচ্ছে, তার বড় একটি অংশ এই ঋণ।
ব্যাংক সূত্রে পাওয়া বাংলাদেশ ব্যাংকের এক পরিদর্শন প্রতিবেদনের তথ্য অনুসারে, ক্রয়চুক্তির বিপরীতে বেক্সটেক্সের আবেদনে জনতা ব্যাংকের স্থানীয় কার্যালয় একই শাখার অপর গ্রাহক বেক্সিমকো সিনথেটিকসের অনুকূলে ২০১০ সালের ২৯ আগস্ট এক কোটি ৭২ লাখ ডলারের ১৭টি ব্যাক টু ব্যাক এলসি বা ঋণপত্র খোলে। বেক্সটেক্সের পক্ষে স্থানীয় কার্যালয় ২৯, ৩০ ও ৩১ আগস্ট এই ১৭টি এলসির বিপরীতে তৈরি বিলে স্বীকৃতি দেয়। একই দিনে বেক্সিমকো সিনথেটিকসের কাছ থেকে সবগুলো বিল ক্রয় করা হয়।
ছয় মাস পর অর্থাৎ ২০১১ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি, ২ ও ৩ মার্চ বিলগুলোর মেয়াদ উত্তীর্ণ হলেও বেক্সটেক্স মূল্য পরিশোধ করেনি। কিছুদিন পর বেক্সটেক্স জনতা ব্যাংককে চিঠি দিয়ে বলে, ক্রয়চুক্তির বিপরীতে ১২০ দিনের মধ্যে রপ্তানি ঋণপত্র পাওয়ার কথা থাকলেও তা পাওয়া যায়নি। আর সিনথেটিকসের আবেদনে বিলের ছয় মাস মেয়াদ বৃদ্ধি করা হয়। কিন্তু এ দফাতেও টাকা পরিশোধ হয়নি, বরং মেয়াদ পূর্তির (২০১১ সালের ২৮ আগস্ট, ২ ও ৩ সেপ্টেম্বর) আগেই আবার ডিসেম্বর পর্যন্ত মেয়াদ বাড়ানোর আবেদন করা হলে তা মঞ্জুর করা হয়। তার পরও মূল্য পরিশোধ করেনি বেক্সটেক্স।
এরপর ২০১২ সালের ১৭ জুলাই স্থানীয় কার্যালয় ১৭২ কোটি টাকার ফোর্সড ঋণ সৃষ্টি করে বিলগুলো সমন্বয় করে। বেক্সটেক্স এভাবে কোনো প্রকার রপ্তানি ঋণপত্র না পেয়ে শুধু ক্রয়চুক্তির বিপরীতে ব্যাক টু ব্যাক এলসি খুলে তার বিপরীতে একই শাখায় অ্যাকোমোডেটিভ বা স্থানীয় বিল বানিয়ে ১৭২ কোটি টাকা বের করে নেয়। এ ক্ষেত্রে রীতিনীতি অনুসরণ না করে বারবার বিলের মেয়াদ বৃদ্ধি করে ব্যাংক। ১৭ মাস পর ফোর্সড ঋণ তৈরি করা হয়েছে।
জনতা ব্যাংকের একটি (স্থানীয়) কার্যালয় থেকে বেক্সিমকো গ্রুপের বেক্সটেক্স, বেক্সিমকো সিনথেটিকস, ক্রিসেন্ট লিমিটেড, ক্রিসেন্ট এক্সেসরিজ ও বেক্সিমকো লিমিটেড—এই পাঁচ কোম্পানি স্বীকৃত বিল তৈরি করে এসব অর্থ ব্যাংক থেকে বের করে নিয়েছিল। বিপরীত পক্ষে ছিল বেক্সিমকোর চার প্রতিষ্ঠান অ্যাসেস ফ্যাশনস, ক্রিসেন্ট ফ্যাশনস এবং ইন্টারন্যাশনাল নিটওয়্যার অ্যাপারেলস ইউনিট-১ ও ২।
জনতা ব্যাংক বেক্সিমকো লিমিটেডের ৯০৫ কোটি, ইন্টারন্যাশনাল নিটওয়্যার অ্যান্ড অ্যাপারেলস-১-এর ২২৩ কোটি টাকা, ইন্টারন্যাশনাল নিটওয়্যার অ্যান্ড অ্যাপারেলস-২-এর ৩২০ কোটি টাকা, অ্যাসেস ফ্যাশনসের ২২৪ কোটি, ক্রিসেন্ট ফ্যাশনস অ্যান্ড ডিজাইনের ১৭৭ কোটি টাকার ঋণ পুনঃ তফসিল করছে।
তবে জনতা ব্যাংক বেক্সিমকোর প্রস্তাবের মতো সুদহার ১০ শতাংশ না করে ১১ শতাংশ নির্ধারণ করেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদন সাপেক্ষে মোট ১১ বছরের জন্য ঋণগুলো পুনঃ তফসিল হচ্ছে। এর মধ্যে দুই বছর ‘গ্রেস প্রিরিয়ড’ রাখা হয়েছে। আর বেক্সিমকোর প্রতিবারের রপ্তানি আয় থেকে ৫ শতাংশ করে অর্থ রাখা হবে, যা ঋণের সঙ্গে সমন্বয় করা হবে। এ ছাড়া দুটি কিস্তি পরিশোধ না হলে ঋণগুলো আবার খেলাপি হবে এবং পুরো ঋণ পরিশোধের জন্য আগাম চেক নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে।
জনতা ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) আবদুস সালাম জানান, আগে ঋণগুলোর জন্য ১১৩ কোটি টাকা জামানত ছিল। নতুন করে প্রায় এক হাজার কোটি টাকার জামানত নেওয়া হয়েছে। তিনি জানান, ছয়বার পরিচালনা পর্ষদে আলোচনা করে এ সিদ্ধান্তগুলো হয়েছে।
জনতার মতো অগ্রণী ব্যাংক থেকেও বেক্সিমকো গ্রুপ বিদেশি ক্রয়চুক্তি দিয়ে ঋণপত্র খুলে বড় ঋণ সৃষ্টি করে। তবে এ ক্ষেত্রে বেক্সিমকো লিমিটেডের এলসি খোলার ব্যাংক ছিল অগ্রণী। আর সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর (গ্রুপের অন্য কোম্পানি) ব্যাংক হয়েছে সোনালী, জনতা ও রূপালী। ফলে অগ্রণী ব্যাংককে বাকি ব্যাংকগুলোর অর্থ পরিশোধ করতে হয়েছে কিন্তু নিজেরা অর্থ আর পায়নি। পরে ১৫৩ কোটি টাকার ঋণ (ডিমান্ড লোন) সৃষ্টি করে ব্যাংক। এ ঋণ আদায়ে আটবার চিঠি দিয়েছে ব্যাংক। অগ্রণী ব্যাংকে বেক্সিমকোর আরও ৩৪৮ কোটি ৩৯ লাখ টাকার ঋণ রয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা অনুসারে অগ্রণী ব্যাংকের পর্ষদে এক দফা এ নিয়েও আলোচনা হয়েছে।
একইভাবে বেসরকারি এক্সিম ব্যাংক থেকে বেক্সিমকো লিমিটেড এলসি খুলে সোনালী ব্যাংক থেকে স্বীকৃতি বিল বানিয়ে তার বিপরীতে অর্থছাড় নিয়েছিল ২০১০-১১ সালে। সোনালী ব্যাংক ২০১১ সালের মে মাসে বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে এ নিয়ে সালিসি বিচার দেয় এলসি খোলা চার ব্যাংকের বিরুদ্ধে। ব্যাংকগুলো হলো জনতা, অগ্রণী, রূপালী ও এক্সিম। বাংলাদেশ ব্যাংক সে সময় কয়েক দফা সময় দিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকে সংরক্ষিত বিভিন্ন ব্যাংকের হিসাব থেকে অর্থ কেটে সোনালীকে পরিশোধ করে। এক্সিম ব্যাংকের সেই অর্থ এখন সুদে-আসলে ১৯৮ কোটি ৮৬ লাখ টাকা হয়েছে। এগুলোও পুনঃ তফসিলের প্রস্তাবের মধ্যে রয়েছে।