শিল্প মন্ত্রণালয়ের কী কাজ

বেসরকারি শিল্প খাতের উন্নয়নে শিল্প মন্ত্রণালয় কোনো ভূমিকা রাখছে না। ইন্টারন্যাশনাল চেম্বার অব কমার্স, বাংলাদেশের (আইসিসিবি) সভাপতি মাহবুবুর রহমান এই মন্তব্য করে বলেছেন, ‘শিল্প মন্ত্রণালয় কোনো কাজ করে কিনা আমার জানা নেই। বেসরকারি খাতের উন্নয়নে অনেক কিছু করার থাকলেও তারা করছে না। তারা কেবল রাষ্ট্রীয় কলকারখানা নিয়েই ব্যস্ত। তাই আমার মতে, এটি মিনিস্ট্রি অব ইন্ডাস্ট্রি নয়, মিনিস্ট্রি অব স্টেট এন্টারপ্রাইজ।’
বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রি (বিসিআই) আয়োজিত ‘শিল্পায়নের মাধ্যমে বাংলাদেশকে মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত করার পথে চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনা’ শীর্ষক আলোচনা সভায় গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে শিল্পমন্ত্রী আমির হোসেন আমুর উপস্থিতিতে এসব কথা বলেন আইসিসিবির সভাপতি মাহবুবুর রহমান। রাজধানীর দিলকুশায় বিসিআইসি ভবনে চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রির কার্যালয়ে আলোচনা সভাটি অনুষ্ঠিত হয়।
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পেট্রোলিয়াম প্রকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ম. তামিম আলোচনা সভায় মূল প্রবন্ধ পাঠ করেন। তিনি বলেন, দেশে প্রতিদিন ২ হাজার ৬০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস উৎপাদন হয়। এর মধ্যে মাত্র ৩৪ শতাংশ শিল্পে ব্যবহৃত হয়। অন্যদিকে বিদ্যুৎ উৎপাদনে ৪১, সিএনজি স্টেশনে ৬ ও গৃহস্থালিতে ১২ শতাংশ গ্যাস যায়। গ্যাস মজুত আছে ১৪ ট্রিলিয়ন ঘনফুট। এ পরিমাণ গ্যাস দিয়ে ১৪ বছরও চলবে না। মধ্যম আয়ের দেশে পৌঁছাতে শিল্প খাতে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। সে জন্য গ্যাস দেওয়ার ক্ষেত্রে শিল্পকারখানাই প্রথম অগ্রাধিকার পাওয়া উচিত। তবে ভবিষ্যতে কোন শিল্প খাতে বেশি প্রবৃদ্ধি হবে, সেটি বিবেচনায় নিতে হবে বলে মনে করেন তিনি।
বিদ্যুতের বিষয়ে অধ্যাপক তামিম বলেন, শিল্পে ১ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ দিলে বছরে দেশের জিডিপিতে ৫০০ কোটি ডলার যোগ হবে। ফলে বিদ্যুতের সংযোগ দেওয়ার ক্ষেত্রেও শিল্পকে গুরুত্ব দিতে হবে। তিনি বলেন, ক্যাপটিভ জেনারেটরে উৎপাদিত বিদ্যুৎ ও জাতীয় গ্রিডের দাম সমন্বয় করা দরকার। কারণ, গ্রিডের দাম বেশি হওয়ায় নতুন উদ্যোক্তারা সমান সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
বিসিআইয়ের সভাপতি এ কে আজাদ বলেন, ‘বর্তমানে জিডিপিতে শিল্পের অবদান ২৯ শতাংশ। মধ্যম আয়ের দেশে পৌঁছাতে হলে সেটি ৪০ শতাংশে উন্নীত করতে হবে। ২ হাজার ৪০০ কোটি ডলারের বিদেশি বিনিয়োগ দরকার হবে। কিন্তু তিন বছর আগে অনেক প্রতিষ্ঠান চাহিদাপত্র পেয়ে মূলধনি যন্ত্রপাতি এনেছেন। এখন সরকার বলছে গ্যাস দিতে পারবে না। এ ক্ষেত্রে আমরাই অসহায়। বিদেশি বিনিয়োগ আসবে কীভাবে?’
মাহবুবুর রহমান গৃহস্থালি ও সিএনজি স্টেশনে গ্যাস-সংযোগ বন্ধ, বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল করা নিয়েও কথা বলেন। তিনি বলেন, ‘সারা বিশ্বে বাসগৃহে এলপিজি ব্যবহৃত হয়। কালই বন্ধ করে দেন। সিএনজি বন্ধ করে দেন। কোনো সমস্যা নাই। বন্ধ করে দিলে আন্দোলন হবে। সরকার ভোটের চিন্তা করে পিছিয়ে যেতে পারে। তবে ভোট বাড়াতে আরও সাড়ে তিন বছর সময় আছে।’ আইসিসিবির সভাপতি বলেন, ‘সরকার ১০০ বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল (এসইপিজেড) করার কথা বলছে। আগে ১০টা তো করে দেখান। তাহলেই বার্তা চলে যাবে।’
পরে শিল্পমন্ত্রী আমির হোসেন বলেন, ‘ওষুধ শিল্পপার্ক স্থাপনে গ্যাস-সংযোগ দেওয়ার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিয়েছি। ধোলাইখালের হালকা প্রকৌশল শিল্পের জন্য কেরানীগঞ্জে শিল্পপার্ক করা হবে। টাঙ্গাইলে বিসিক শিল্পনগরী হচ্ছে। তাই শিল্প মন্ত্রণালয় কিছু করছে না এটা ঠিক না।’ তবে তিনি আফসোস করে বলেন, ‘একটি শিল্প স্থাপনে ১৭টি সরকারি প্রতিষ্ঠানের অনুমোদনের জন্য ফাইল পাঠাতে লাগে। কিন্তু শিল্প মন্ত্রণালয়ের লাগে না।’
শিল্পমন্ত্রী আরও বলেন, ‘সিএনজি বন্ধ করতে ২০০৯ সালে সংসদে কথা বলেছিলাম। অনেক চাপাচাপির পর গ্যাসের দাম বাড়ানো হয়েছে। তবে দাম বৃদ্ধি কোনো সমাধান নয়।’ শিল্প উদ্যোক্তাদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘গ্যাস নিয়ে চিন্তাভাবনা করে এখন শিল্প হবে না। এটি বাদ দিতে হবে। সার কারখানা গ্যাসের অভাবে বন্ধ। গ্যাসের জন্য সরকারি কলকারখানাই ভুক্তভোগী। তাই বিদ্যুৎকেন্দ্রিক শিল্পকারখানা স্থাপন করুন।’
অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশনের (বিসিআইসি) চেয়ারম্যান মোহাম্মদ ইকবাল, গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা জাফরুল্লাহ চৌধুরী, অর্থনীতি সমিতির সাধারণ সম্পাদক জামালউদ্দিন আহমেদ, প্লাস্টিক পণ্য প্রস্তুত ও রপ্তানিকারক সমিতির সভাপতি জসিম উদ্দিন প্রমুখ।