ব্র্যাক ক্যারিয়ার হাব এক্সপো: ৩২৩২ চাকরিপ্রার্থী পেলেন সরাসরি চাকরির প্রস্তাব
প্রতিবছর দেশের লাখো তরুণ উচ্চশিক্ষা শেষ করে কর্মসংস্থানের বাজারে প্রবেশ করেন। তবে শিক্ষা থেকে কর্মজীবনে উত্তরণের এ পর্যায়ে প্রয়োজনীয় দক্ষতা, শ্রমবাজার সম্পর্কে পর্যাপ্ত তথ্য এবং কার্যকর ক্যারিয়ার নির্দেশনার অভাবে অনেকেই কাঙ্ক্ষিত চাকরির সুযোগ থেকে পিছিয়ে পড়েন। অন্যদিকে বিভিন্ন খাতের নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানও তাদের প্রয়োজন অনুযায়ী দক্ষ মানবসম্পদ খুঁজে পেতে নানা ধরনের চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হয়।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুযায়ী, দেশের মোট বেকার জনসংখ্যার ৮৩ দশমিক ২ শতাংশই ১৫ থেকে ২৯ বছর বয়সী। উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করা তরুণদের মধ্যে বেকারত্বের হার ১৩ দশমিক ১১ শতাংশ। অন্যদিকে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় ৪৬ শতাংশ স্নাতক এখনো কর্মসংস্থানের বাইরে রয়েছেন। এ প্রেক্ষাপটে তরুণদের দক্ষতা উন্নয়ন, কার্যকর ক্যারিয়ার নির্দেশনা এবং শ্রমবাজারের সঙ্গে সংযোগ জোরদার করা ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় ২০২০ সালে ব্র্যাক দক্ষতা উন্নয়ন কর্মসূচি চালু করে ‘ক্যারিয়ার হাব’। এটি একটি ‘ওয়ান-স্টপ সার্ভিস সেন্টার’, যেখানে দক্ষতা যাচাই, ক্যারিয়ার কাউন্সেলিং, প্রশিক্ষণ ও কর্মসংস্থানের সুযোগের সঙ্গে সংযোগ স্থাপনের সেবা এক প্ল্যাটফর্মে। এই কাঠামোগত প্রক্রিয়া তরুণদের শ্রমবাজারের চাহিদা অনুযায়ী নিজেদের প্রস্তুত করার সুযোগ তৈরি করে।
প্রথমেই বাজারের চাহিদার ওপর ভিত্তি করে অংশগ্রহণকারীদের দক্ষতা যাচাই ও নিবন্ধন করা হয় এবং ‘ক্যারিয়ার চ্যাট’ ও প্রাথমিক মূল্যায়নের মাধ্যমে তাদের দক্ষতা, প্রস্তুতি ও প্রয়োজন সম্পর্কে বিস্তারিত ধারণা নেওয়া হয়। যাঁরা চাকরির জন্য প্রস্তুত, তাঁদের সরাসরি কর্মসংস্থানের বিভিন্ন সুযোগের সঙ্গে যুক্ত করা হয়। আর যাঁদের দক্ষতা উন্নয়নের প্রয়োজন, তাঁদের জন্য কাস্টমাইজড প্ল্যান তৈরি করে ক্যারিয়ার কাউন্সেলরদের মাধ্যমে বিশেষায়িত প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। প্রশিক্ষণ শেষে আবার মূল্যায়ন করে তাঁদের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করে দেওয়া হয়।
ক্যারিয়ার এক্সপো ২০২৬-এ মোট ৫০ হাজার ৮৬৭ আবেদনকারী নিবন্ধন করেন, যার মধ্যে ১৮৩৯৯ জন সরাসরি অংশগ্রহণ করেন। এক্সপোতে ছিল একাধিক প্রতিষ্ঠানে সিভি প্রদানের সুযোগ, তাই নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানগুলো ৯৪৯৬২টি সিভি গ্রহণ করে।
শুরু থেকেই ক্যারিয়ার হাব দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের তরুণদের কাছ থেকে ইতিবাচক সাড়া পেয়েছে। এখন পর্যন্ত ৭১ হাজারের বেশি তরুণ এই প্ল্যাটফর্মে নিবন্ধিত হয়েছেন এবং ২০ হাজারের বেশি অংশগ্রহণকারী প্রত্যক্ষভাবে ক্যারিয়ার কাউন্সেলিং সেবা পেয়েছেন। এ ছাড়া সাত হাজারের অধিক অংশগ্রহণকারী চাকরি প্রস্তুতির প্রশিক্ষণ নিয়েছেন, যার প্রায় ৩৫ শতাংশই নারী।
বর্তমানে কক্সবাজার, রংপুর, সিলেট, চট্টগ্রাম ও খুলনা সেন্টারের মাধ্যমে অফলাইন ও অনলাইনে দেশের তরুণদের ক্যারিয়ার–সচেতন করতে ক্যারিয়ার হাব কাজ করে যাচ্ছে। পাশাপাশি দেশের বেশ কয়েকটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়েও এ কার্যক্রম সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে ব্র্যাকের।
তরুণদের কর্মসংস্থানের সুযোগ সম্প্রসারণ এবং নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান ও চাকরিপ্রার্থীদের মধ্যে সরাসরি সংযোগ তৈরির লক্ষ্যে ব্র্যাকের আয়োজনে চলতি বছরের মে থেকে জুন মাসের মধ্যে সিলেট, চট্টগ্রাম, খুলনা ও রংপুরে অনুষ্ঠিত হয় ‘ক্যারিয়ার এক্সপো ২০২৬’। এ আয়োজন চাকরিপ্রার্থী ও বিভিন্ন খাতের নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সরাসরি যোগাযোগের একটি কার্যকর প্ল্যাটফর্ম হিসেবে কাজ করেছে।
আগে যেখানে চাকরিপ্রার্থীদের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে গিয়ে সিভি জমা দিতে হতো, সেখানে এই আয়োজনে দেশের শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠান, যেমন ওয়ালটন, প্রাণ, এসিআই, ব্যাংক এশিয়া, ব্র্যাক ব্যাংক, ইউনাইটেড ফাইন্যান্স পিএলসি, আকিজ গ্রুপ, মিনিস্টার হাইটেক পার্ক লিমিটেড, সিঙ্গারসহ মোট ৭৯টি নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান সরাসরি অংশগ্রহণ করে এবং স্পটেই যোগ্য প্রার্থী বাছাই করে।
ক্যারিয়ার এক্সপো ২০২৬-এর পরিসংখ্যান উদ্যোগটির ব্যাপক অংশগ্রহণ ও ইতিবাচক ফলাফলের চিত্র তুলে ধরে। এই এক্সপোতে মোট ৫০ হাজার ৮৬৭ জন আবেদনকারী নিবন্ধন করেন, যার মধ্যে ১৮ হাজার ৩৯৯ জন সরাসরি অংশগ্রহণ করেন। এক্সপোতে ছিল একাধিক প্রতিষ্ঠানে সিভি প্রদানের সুযোগ, তাই নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানগুলো ৯৪ হাজার ৯৬২টি সিভি গ্রহণ করে।
চারটি ভিন্ন এলাকায় আয়োজিত এক্সপোর দিনেই নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানগুলো ১১ হাজার ৯৫ জনকে প্রাথমিকভাবে বাছাই বা শর্টলিস্ট করে এবং সরাসরি স্পটেই ৬ হাজার ২৮০ জনের সাক্ষাৎকার গ্রহণ করে। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, এই আয়োজনের মাধ্যমে ৩ হাজার ২৩২ জন চাকরিপ্রার্থী সরাসরি স্পটেই চাকরির প্রস্তাব বা জব অফার পেয়েছেন।
কর্মজীবনে সফলভাবে প্রবেশের জন্য সঠিক প্রস্তুতি গুরুত্বপূর্ণ। ব্র্যাক ক্যারিয়ার হাব তরুণদের দক্ষতা উন্নয়ন, ক্যারিয়ার নির্দেশনা এবং কর্মসংস্থানের সুযোগের সঙ্গে সংযুক্ত করতে কাজ করছে। একই সঙ্গে ক্যারিয়ার এক্সপোর মতো আয়োজন চাকরিপ্রার্থীদের জন্য রিক্রুটমেন্ট, নেটওয়ার্কিং ও ক্যারিয়ার উন্নয়নের সুযোগ আরও বিস্তৃত করছে। নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সরাসরি সংযোগ তৈরির মাধ্যমে এ ধরনের উদ্যোগ তরুণদের কর্মজীবনে প্রবেশের পথকে আরও সুসংগঠিত ও কার্যকর করে তুলছে। ভবিষ্যতে এই ক্যারিয়ার এক্সপোকে আরও বড় পরিসরে নিয়ে আসার জন্য ব্র্যাক আশাবাদী।