প্রশাসনিক ও আর্থিক স্বাধীনতার অভাব: সংকটে পিএসসি

পিএসসি

সরকারি কর্ম কমিশন (পিএসসি) ৪৬তম বিসিএসের লিখিত পরীক্ষার উত্তরপত্র মূল্যায়নের কাজ দ্রুততম সময়ে শেষ করেছিল। দীর্ঘদিনের সনাতনী প্রথা ভেঙে ‘সার্কুলার ইভ্যালুয়েশন সিস্টেম’ পরীক্ষকেরা দ্রুততম সময়ে কাজ শেষ করেছেন। কিন্তু অস্বস্তিতে পড়েছে পিএসসি। কয়েক মাস পেরিয়ে গেলেও কাজের সম্মানী পাননি পরীক্ষকেরা।

পিএসসি বলছে, তাদের হাতে টাকা নেই; বাজেট পাসের জন্য অর্থ মন্ত্রণালয়ের দীর্ঘসূত্রতার কারণে তারা শিক্ষকদের সম্মানী দিতে পারছেন না । কেবল ৪৬তম বিসিএস নয়, বর্তমান কমিশন একসঙ্গে ৭টি বিসিএসের কর্মযজ্ঞ সামলাতে গিয়ে প্রশাসনিক ও আর্থিক সংকটের মুখে পড়েছে। কমিশনের দাবি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান হওয়া সত্ত্বেও পিএসসি জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের অধীন একটি দপ্তরের মতো কাজ করছে।

আর্থিক স্বাধীনতা না থাকায় সংকটে পিএসসি

পিএসসি সূত্রে জানা গেছে, ৪৬তম বিসিএস থেকে লিখিত পরীক্ষার উত্তরপত্র মূল্যায়নে ‘সার্কুলার ইভ্যালুয়েশন সিস্টেম’ চালু করা হয়েছে। এই পদ্ধতিতে পরীক্ষকেরা পিএসসিতে এসে উত্তরপত্র মূল্যায়ন করেন, যার ফলে ফলাফল প্রকাশের সময় অনেক কমে এসেছে। কিন্তু আধুনিক এই পদ্ধতির সুফল পেতে গিয়ে এখন বড় সংকট হয়ে দাঁড়িয়েছে বাজেট। নতুন এই পদ্ধতিতে কাজ করা পরীক্ষকদের দীর্ঘ সময় পার হলেও সম্মানী দিতে পারেনি পিএসসি। নিয়ম অনুযায়ী, একটি বিসিএস আয়োজনের জন্য বছরে নির্দিষ্ট বাজেট দেওয়া হয়। কিন্তু বর্তমান কমিশনকে একসঙ্গে ৪৪ থেকে ৫০তম বিসিএস পর্যন্ত বিশাল কর্মযজ্ঞ পরিচালনা করতে হচ্ছে। এতগুলো বিসিএসের কার্যক্রম পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ পিএসসির হাতে নেই। চাহিদাপত্র পাঠানোর পর অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে বাজেট পাস হয়ে আসতে দীর্ঘ সময় লাগায় কমিশনের স্বাভাবিক কার্যক্রম পরিচালনা করতে হিমশিম খেতে হচ্ছে।

প্রশাসনিক স্বাধীনতার অভাব ও দীর্ঘসূত্রতা

সংবিধান অনুযায়ী পিএসসি একটি স্বাধীন প্রতিষ্ঠান হলেও বাস্তবে এর প্রতিটি পদক্ষেপের জন্য সরকারের বিশেষ করে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের প্রশাসনিক অনুমোদনের অপেক্ষায় থাকতে হয়। পিএসসির তথ্য অনুযায়ী, ৪৮তম ও ৪৯তম বিশেষ বিসিএসের জন্য বিধি প্রণয়ন করতে প্রায় সাড়ে তিন মাস সময় লেগেছে। এমনকি খাতা দেখার নতুন পদ্ধতি বা ‘সার্কুলার ইভ্যালুয়েশন সিস্টেম’ চালুর ক্ষেত্রেও বিধি সংশোধন করতে দুই মাস সময় ব্যয় হয়েছে। পিএসসি চেয়ারম্যান অধ্যাপক মোবাশ্বের মোনেম এ প্রসঙ্গে বলেন ২০১১ সালের পর থেকে রাজনৈতিক প্রভাবে কমিশন কার্যত জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের একটি দপ্তরের মতো কাজ করতে বাধ্য হচ্ছে। আমরা স্বাধীন প্রতিষ্ঠান হয়েও বিধি সংশোধন বা আর্থিক সিদ্ধান্ত নিতে পারি না। ক্ষুদ্র কোনো বিধি সংশোধনের জন্যও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন নিতে হয়। আর্থিক সিদ্ধান্তের জন্য বারবার অর্থ বিভাগের অনুমোদন চাইতে হয়। এতে আমাদের স্বাধীনতা প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে,পিএসসির স্বাভাবিক কার্যক্রম পরিচালনা করা কঠিন হয়ে পড়েছে।। দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই এই সমস্যার কথা সরকারকে জানিয়েছি। তারা প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। কিন্তু এখন পর্যন্ত পিএসসি আর্থিক ও প্রশাসনিক স্বাধীনতা পায়নি।

তবে নামপ্রকাশে অনিচ্ছুক এক চাকরিপ্রার্থী বলছেন, কেবল বিধি প্রণয়নের ক্ষমতার অভাবই দীর্ঘসূত্রতার একমাত্র কারণ নয়; আমলাতান্ত্রিক কাঠামোর মধ্যে কমিশনের নিজস্ব ব্যবস্থাপনার ব্যপক ঘাটতি রয়েছে।

পিএসসি সঙ্গে চাকরিপ্রার্থীদের দূরত্ব বাড়ছে

পিএসসির এই সীমাবদ্ধতার সরাসরি প্রভাব পড়ছে সাধারণ চাকরিপ্রার্থীদের ওপর। ৪৪তম বিসিএসের চূড়ান্ত ফলাফল প্রকাশের ক্ষেত্রে ‘রিপিট ক্যাডার’ জটিলতা এর একটি বড় উদাহরণ। একই ব্যক্তি একাধিকবার ক্যাডার পাওয়ায় অনেক মেধাবী বঞ্চিত হচ্ছিলেন। এই সমস্যা সমাধানে বিধি সংশোধনের সিদ্ধান্ত নিলেও আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় তা মাসের পর মাস ঝুলে ছিল। এর ফলে সুপারিশপ্রাপ্ত প্রার্থীদের মানববন্ধন ও পিএসসি ঘেরাওয়ের মতো কর্মসূচি পালন করতে হয়েছে। যদিও পরে সম্পূরক ফল প্রকাশিত হয়েছে, কিন্তু চাকরিপ্রার্থীদের অভিযোগ, রিপিট ক্যাডার ও নন-ক্যাডার নিয়োগের জটিলতা এখনো পুরোপুরি কাটেনি। ৪৫তম বিসিএসের নন-ক্যাডার প্রার্থীরা এখন পদ সংখ্যা বাড়ানোর দাবিতে আন্দোলন করছেন। পিএসসি বলছে, ২০২৩ সালের নিয়োগ বিধিমালার কারণে তারা পদের সংখ্যা আগেভাগে উল্লেখ করতে বাধ্য, ফলে আইনি জটিলতায় তারা বেশি প্রার্থীকে সুপারিশ করতে পারছে না। অথচ সরকারের বিভিন্ন দপ্তরে এখনো চার লাখেরও বেশি পদ শূন্য পড়ে আছে।

চ্যালেঞ্জের মুখে ‘ওয়ান বিসিএস ওয়ান ইয়ার’ লক্ষ্য

বর্তমান কমিশন দায়িত্ব নেওয়ার পর বিসিএস ফি কমানো এবং মৌখিক পরীক্ষার নম্বর কমিয়ে ১০০ করার মতো কিছু জনবান্ধব পদক্ষেপ নিয়েছে। প্রশ্নপত্রের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নিজস্ব ডিজিটাল প্রিন্টিং প্রেস ব্যবহার করা এবং ৪৭তম প্রিলিমিনারির ফল রেকর্ড নয় দিনে প্রকাশ করেছে। জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশন সুপারিশ করেছে বিসিএস প্রক্রিয়া এক থেকে দেড় বছরের মধ্যে শেষ করার জন্য একটি বার্ষিক ক্যালেন্ডার অনুসরণের। পিএসসি নিজেও ‘ওয়ান বিসিএস ওয়ান ইয়ার’ লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের কথা বলছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, ৪৯তম বিশেষ বিসিএসের প্রশ্নে অসংখ্য বানান ও তথ্যগত ভুল কমিশনের পেশাদারিত্ব নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। এর পাশাপাশি পুলিশ ভেরিফিকেশনে ও রাজনৈতিক পরিচয় দীর্ঘসূত্রতা কাটিয়ে ওঠার কোনো কার্যকর পথ এখনো বের করা সম্ভব হয়নি। পিএসসি যদি প্রশাসনিক ও আর্থিক বৃত্ত থেকে বেরিয়ে আসতে না পারে এবং প্রশ্নপত্রের গুণগত মান ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়, তবে কেবল লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণের মাধ্যমে এই আস্থাহীনতা দূর করা সম্ভব হবে না বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসায় প্রশাসন ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক রিদওয়ানুল হক মনে করেন, পিএসসিকে কেবল নামমাত্র স্বাধীন থাকলে চলবে না, বরং নিরপেক্ষ ও নির্মোহভাবে কাজ করার জন্য এর পূর্ণ প্রশাসনিক ও আর্থিক স্বাধীনতা নিশ্চিত করা জরুরি। একইসঙ্গে বর্তমান কমিশনের উচিত মানসম্মত প্রশ্ন প্রণয়ন এবং নন–ক্যাডার নিয়োগে শতভাগ স্বচ্ছতা বজায় রাখা। পিএসসি যদি তাদের ঘোষিত ‘ওয়ান বিসিএস, ওয়ান ইয়ার’ লক্ষ্য বাস্তবায়নে সফল হয়, তবে দেশের সামগ্রিক মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনায় এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসবে।'