প্রশ্নপত্র ফাঁসে স্থগিত, ছয় দিনের মাথায় ফের পরীক্ষা, ভোগান্তির শেষ কোথায়? 

যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের সহকারী উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা পদের নিয়োগ পরীক্ষা বাতিল হওয়ার ঘটনায় সড়ক অবরোধ করে প্রতিবাদ জানান ক্ষুব্ধ পরীক্ষার্থীরা। এ সময় তাঁরা প্রবেশপত্র উঁচিয়ে ধরে ক্ষোভ জানান। শনিবার সকালে রাজধানীর মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়েছবি: জাহিদুল করিম

চাকরি, চাকরি, চাকরি—একটা চাকরি জীবন বদলে দিতে পারে।এই ভাবনা আজকের নয়, বহু পুরোনো। চাকরির জন্য তরুণদের পথে পথে ঘোরার কষ্টও নতুন কিছু নয়। বিশের দশকে ইংরেজিতে এমএ পাস করা মেধাবী তরুণ জীবনানন্দ দাশকেও মনের মতো একটা চাকরির জন্য ঘুরতে হয়েছে দিনের পর দিন। কলকাতা থেকে বাগেরহাট, দিল্লি থেকে বরিশাল, বরিশাল থেকে দিল্লি কোথায় যাননি কবি! চাকরি বদলে নতুন চাকরিতে যুক্ত হয়েছেন কয়েকবার। সেই খেদ থেকেই হয়তো লিখেছিলেন, ‘মানুষেরই হাতে তবু মানুষ হতেছে নাজেহাল; পৃথিবীতে নেই কোনো বিশুদ্ধ চাকরি।’

আমাদের কমবেশি সবার জীবনে চাকরিকে কেন্দ্র করে গল্পটা প্রায় এক না হলেও কাছাকাছি। তবে ‘মনের মতো চাকরির’ ভাবনা থেকে আমরা অনেকেই হয়তো সরে এসেছি। আমাদের এখন দরকার একটা সরকারি চাকরি, দরকার নিরাপত্তা ও নিশ্চয়তা। তাই সরকারি চাকরি আজ সোনার হরিণের চেয়ে কম কিছু নয়।

আর এই স্বপ্নের টানে, সোনার হরিণকে নিজের করতে একজন চাকরিপ্রার্থী যখন পরীক্ষায় অংশ নিতে ঢাকায় আসেন, সঙ্গে নিয়ে আসেন কয়েক মাস কিংবা বছরের প্রস্তুতি, পরিবারের প্রত্যাশা আর ভবিষ্যৎ বদলানোর আশা। অনেকের কাছে ঢাকায় আসার খরচ জোগাড় করাটাও কঠিন সংগ্রামের। তারপরও আসতে হয়, কারণ চাকরিটা দরকার। কিন্তু পরীক্ষার দিন কেন্দ্রে এসে যদি জানতে হয়, প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগে পরীক্ষা স্থগিত, তখন নিজেকে ঠিক কী বলে সান্ত্বনা দেওয়া যায়?

১০ অক্টোবর যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের সহকারী উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা পদের নিয়োগ পরীক্ষাকে ঘিরে ঠিক এই পরিস্থিতিই তৈরি হয়েছে। প্রথম আলোর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২৪২টি পদের বিপরীতে আবেদন করেছিলেন প্রায় ৩ লাখ ১৯ হাজার প্রার্থী। পরীক্ষা শুরুর আগে পরীক্ষার্থীরা জানতে পারেন প্রশ্নপত্র ফাঁস হওয়ার কারণে পরীক্ষা স্থগিত। ততক্ষণে অনেক পরীক্ষার্থী কেন্দ্রে পৌঁছে গেছেন, কারও হাতে ওএমআর শিটও দেওয়া হয়েছিল।

এখন প্রশ্ন হলো, অভিযোগ সামনে আসার পরও পরীক্ষার্থীরা কেন্দ্রে পৌঁছানো পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হলো কেন? প্রশ্নপত্রের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব যাঁদের, তাঁদের কোথায় গাফিলতি ছিল? উত্তর পেতে প্রয়োজন নিরপেক্ষ তদন্ত ও নির্ভরযোগ্য প্রমাণ। প্রথম আলোর প্রতিবেদন বলছে, ইতোমধ্যে পাঁচ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। এখন প্রশ্নপত্র কীভাবে বাইরে গেল, কোথায় নিরাপত্তাব্যবস্থার দুর্বলতা ছিল এবং কারও সংশ্লিষ্টতা প্রমাণিত হলে তাঁর বা তাঁদের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে এসবের স্পষ্ট উত্তর সামনে আসাটা জনপ্রত্যাশা।

আমাদের মাথায় নিতে হবে যে, প্রশ্নপত্র ফাঁস কেবল পরীক্ষার নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন তোলে না, যোগ্যতার ভিত্তিতে চাকরি পাওয়ার ব্যবস্থার ওপরও আঘাত করে। একজন প্রার্থী দিনের পর দিন পড়াশোনা করে প্রস্তুতি নেন। আর অন্য কেউ যদি পরীক্ষার আগেই প্রশ্ন পেয়ে যাওয়ার সুযোগ পান, তাহলে প্রতিযোগিতা সমান থাকে কীভাবে? মেধা ও পরিশ্রমের ওপর ভরসা করে যাঁরা পরীক্ষায় বসেন, তাঁদের আস্থা ফিরিয়ে আনতে প্রশ্নগুলোর উত্তর দ্রুত খুঁজে বের করার বিকল্প নেই।

সংবাদ মাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, স্থগিত পরীক্ষার নতুন তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছে ১৬ অক্টোবর। মাত্র ছয় দিনের ব্যবধান। কর্তৃপক্ষের কাছে দ্রুত পরীক্ষা নেওয়ার সিদ্ধান্ত যৌক্তিক মনে হতে পারে। কিন্তু দূরদূরান্ত থেকে আসা প্রত্যেক চাকরিপ্রার্থীর পক্ষে এই সময়ের মধ্যে আবার ঢাকায় আসা কি সম্ভব? অনেকেই হয়তো ধারদেনা করে যাতায়াত ও থাকা-খাওয়ার খরচ জোগাড় করেছিলেন। পরীক্ষা স্থগিত হয়েছে, পরীক্ষার নতুন তারিখও নির্ধারণ হয়েছে কিন্তু সেই টাকা ফেরত পাওয়ার সুযোগ নেই। ১৬ তারিখ পরীক্ষা দিতে হলে আবার টাকা জোগাড় করতে হবে, কারও ঢাকায় থাকার জায়গা না থাকলে থাকারও ব্যবস্থা করতে হবে। কারও পক্ষে হয়তো সম্ভব হবে, কারও পক্ষে হবে না। প্রথম দিন পরীক্ষা দিতে আসলেও অর্থের অভাবে ভালো প্রস্তুতি থাকা স্বত্বেও কেউ যদি দ্বিতীয়বার পরীক্ষায় অংশ নিতে না পারেন, কীভাবে নিজেকে তিনি স্বান্ত্বনা দেবেন?

পরীক্ষা দ্রুত নেওয়ার অবশ্যই প্রয়োজন আছে। নিয়োগপ্রক্রিয়া দীর্ঘ হলে চাকরিপ্রার্থীদের অনিশ্চয়তাও বাড়ে। কিন্তু দ্রুততার সঙ্গে তাঁদের বাস্তব সমস্যার বিষয়টিও বিবেচনা করা জরুরি। যে ঘটনার জন্য তাঁদের দায় নেই, তার আর্থিক বোঝা কেন তাঁদেরই বহন করতে হবে? পরীক্ষার্থীদের যাতায়াত ও অন্যান্য খরচের ক্ষতিপূরণের দিকটিও এই ধরণের পরিস্থিতিতে বিবেচনা করা জরুরি।

১৬ তারিখে পরীক্ষার প্রশ্নপত্রের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এখন প্রধান কর্তব্য। কারণ চাকরিপ্রার্থীরা শুধু একটি পরীক্ষার তারিখ চান না। তাঁরা চান স্বচ্ছ নিয়োগপ্রক্রিয়া, নিরাপদ পরীক্ষা এবং যোগ্যতার ভিত্তিতে প্রতিযোগিতা করার নিশ্চয়তা। প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগের নিষ্পত্তি, দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা এবং ক্ষতিগ্রস্ত প্রার্থীদের ভোগান্তি বিবেচনায় নেওয়ার মধ্য দিয়েই সেই নিশ্চয়তা প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব। অন্যথায় নতুন তারিখে পরীক্ষা হলেও প্রশ্নটি থেকেই যাবে। পরীক্ষা দিয়ে কিংবা ফলাফল প্রকাশের দিন চাকরিপ্রার্থীরা বলে উঠবেন, ‘এই ভোগান্তির শেষ কোথায়?’