প্রশ্নপত্র ফাঁস ও কেন্দ্র-কন্ট্র্যাক্ট: মেধার বদলে টাকার দাপটে দিশাহারা চাকরিপ্রার্থীরা

যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের উপজেলা সহকারী যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা পদের নিয়োগ পরীক্ষা স্থগিত হওয়ার ঘটনায় সড়ক অবরোধ করে প্রতিবাদ জানান ক্ষুব্ধ পরীক্ষার্থীরাফাইল ছবি

১০ অক্টোবর যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল। সহকারী উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা পদের এই নিয়োগ পরীক্ষায় অংশ নিতে সারা দেশ থেকে ঢাকায় এসেছিলেন লাখ লাখ বেকার তরুণ–তরুণী। তবে বেলা ১১টায় পরীক্ষা শুরুর আগেই (আগের দিন রাত) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে প্রশ্নপত্রের ছবি। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে সকাল ১০টা ৩ মিনিটে মাত্র দুই মিনিটের নোটিশে পরীক্ষা স্থগিতের ঘোষণা দেয় কর্তৃপক্ষ। ২৪২টি শূন্যপদের বিপরীতে ৩ লাখ ১৮ হাজার ৯৭৬ জন চাকরিপ্রার্থী আবেদন করেছিলেন। পরে বিশেষ নজরদারিতে পুনরায় পরীক্ষা নেওয়া হলেও ঘটনাটি সরকারি নিয়োগব্যবস্থার সার্বিক নিরাপত্তা ও প্রাতিষ্ঠানিক স্বচ্ছতা নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন তুলে দিয়েছে।

ঘটনার তদন্তে নেমে স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি) প্রশ্নপত্র ফাঁস ও চক্রের মাধ্যমে উত্তর সরবরাহের চাঞ্চল্যকর তথ্য পায়। তদন্তের তথ্য অনুযায়ী, পরীক্ষার দিন ভোর ৪টা ৪৩ মিনিটে নূর মোহাম্মদ নামের এক ব্যক্তির কাছে প্রশ্নপত্রের অস্পষ্ট ছবি পৌঁছায়। এরপর সকাল ৬টা ১৫ মিনিটে প্রশ্নপত্রের স্পষ্ট ছবি পান জাহাঙ্গীর নামের আরেক সদস্য। উত্তর প্রস্তুত করে তা পরীক্ষার্থীদের কাছে পৌঁছে দেওয়ার জন্য চক্রটি ভুয়া হোয়াটসঅ্যাপ আইডি ব্যবহার করত। অনুসন্ধানে জানা যায়, তৃতীয় শ্রেণির পদের জন্য ৮ থেকে ১০ লাখ টাকা এবং দ্বিতীয় শ্রেণির পদের জন্য ১৫ থেকে ২০ লাখ টাকা পর্যন্ত হাঁকানো হচ্ছিল। এ ঘটনায় গ্রেপ্তার সাতজনের মধ্যে পাঁচজনই বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের কর্মচারী।

প্রশ্নপত্র ফাঁসের পাশাপশি  ‘কেন্দ্র-কন্ট্র্যাক্ট’ও আলোচনায়

নিয়োগ পরীক্ষার অনিয়ম কেবল আগেই প্রশ্ন ছড়ানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এখন কেন্দ্রভিত্তিক সূক্ষ্ম কারচুপি বা ‘কেন্দ্র-কন্ট্র্যাক্ট’ নতুন আতঙ্ক হিসেবে সামনে এসেছে। পরীক্ষা হলের ভেতরে একশ্রেণির অসাধু কর্মকর্তা ও পরীক্ষাকেন্দ্রের যোগসাজশে নির্দিষ্ট কিছু প্রার্থীকে বিশেষ সুবিধা দেওয়া হয়। ডিজিটাল ডিভাইসের মাধ্যমে বাইরে থেকে সমাধান পাঠানো কিংবা হলে দায়িত্বপ্রাপ্ত শিক্ষকদের নীরব সমর্থনের অভিযোগও হরহামেশাই উঠছে।

সম্প্রতি সমাপ্ত সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়াতেও এমন তিক্ত অভিজ্ঞতা দেখা গেছে। ২০২৫ সালের ৯ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত লিখিত পরীক্ষার পর ১৪ হাজার ৩৮৪ জনকে চূড়ান্তভাবে সুপারিশ করা হয়। তবে নীলফামারীর একটি কেন্দ্রে পরীক্ষা শুরুর পরপরই বাইরে থেকে উত্তর সরবরাহ করা এবং নির্দিষ্ট কক্ষে বিশেষ সুবিধার গুরুতর অভিযোগ ওঠে। প্রার্থীরা সেখানে তাৎক্ষণিক প্রতিবাদ জানালেও সে বিষয়ে কোনো দৃশ্যমান প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। বছরের পর বছর কঠোর পরিশ্রম আর পরিবারের জমানো টাকা খরচ করে পরীক্ষা দিতে এসে প্রার্থীরা যখন এমন জালিয়াতি দেখেন, তখন তাঁদের সব আশা ভেঙে চুরমার হয়ে যায়।

এ বিষয়ে নিজের ক্ষোভ ও হতাশা প্রকাশ করে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ইশরাত জাহান ইরা প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা যারা বহুদূর থেকে কষ্ট করে কেন্দ্রে পরীক্ষা দিতে আসি, ধারদেনা করে বই কেনা আর যাতায়াতের খরচ জোগাই, পরীক্ষা শুরুর পর ওএমআর কেটে নেওয়া বা প্রশ্নপত্র ফাঁসের খবর শুনলে আমাদের মাথার ওপর আকাশ ভেঙে পড়ে। দিনরাত এক করে পড়াশোনা করার পর যখন দেখি মেধার বদলে টাকার জোরে চাকরি বিক্রি হচ্ছে, তখন পুরো নিয়োগব্যবস্থার ওপর আর কোনো আস্থা থাকে না। আমরা শুধু পরীক্ষা বাতিলের সাময়িক লোকদেখানো সিদ্ধান্ত চাই না; যারা প্রশ্ন বিক্রি করে আর যারা টাকার জোরে চাকরি কেনে—দুই পক্ষেরই দৃষ্টান্তমূলক সাজা দেখতে চাই।’

আরও পড়ুন

একজন আবেদ আলী ও ধীরগতির বিচারব্যবস্থা

প্রশ্নপত্র ফাঁস ও নিয়োগ–বাণিজ্যের শিকড় কত দূর গভীরে পৌঁছেছে, তার সবচেয়ে বড় উদাহরণ পিএসসির সাবেক গাড়িচালক সৈয়দ আবেদ আলীর ঘটনাটি। সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান পিএসসির ভেতরে থেকে তিনি ও তাঁর সহযোগীরা বছরের পর বছর ধরে প্রশ্নপত্র ফাঁস ও নিয়োগ–বাণিজ্যের নেটওয়ার্ক চালিয়ে গেছেন।

২০১৪ সালে পিএসসির একটি নিয়োগ পরীক্ষায় পরীক্ষার্থীর কাছে লিখিত উত্তরপত্র পাওয়ার ঘটনায় প্রথম মামলা হয়। পুলিশের তদন্তে আবেদ আলী ও তাঁর সহযোগীদের সরাসরি সম্পৃক্ততা পাওয়া যায়। ২০১৫ সালে বিচারকাজ শুরুর আদেশ হলেও পরবর্তী ১০ বছরে ১২ জন সাক্ষীর মধ্যে মাত্র ২ জনকে আদালতে হাজির করতে পেরেছে প্রসিকিউশন। এই দীর্ঘ বিচারহীনতা ও নজরদারির অভাবকেই কাল হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।

সাজার মুখোমুখি না হওয়ার সুযোগে ২০২৪ সালে বাংলাদেশ রেলওয়ের উপসহকারী প্রকৌশলী নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগে আবারও গ্রেপ্তার হন আবেদ আলী, তাঁর ছেলে এবং পিএসসির একাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারী। দীর্ঘ তদন্ত শেষে ৫৫ জনের বিরুদ্ধে চার্জশিট দেওয়া হলেও আগের মামলার সুরাহা না হওয়ায় চক্রটি বারবার পার পেয়ে গেছে।

আরও পড়ুন

পরীক্ষা কমিটিতে রাজনৈতিক বিবেচনার প্রভাব

নিয়োগপ্রক্রিয়ায় বারবার এই ধস নামার পেছনে কেবল প্রযুক্তিগত বা ব্যক্তিপর্যায়ের দুর্নীতি নয়, বরং প্রাতিষ্ঠানিক অসততা ও রাজনৈতিক বিবেচনাকে দায়ী করছেন বিশষজ্ঞরা।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক তানজিম উদ্দীন খান প্রথম আলোকে বলেন, ‘সাধারণত রাজনৈতিক সরকার ক্ষমতায় এলে সরকারের বিভিন্ন দপ্তরের পরীক্ষা কমিটির দায়িত্ব বণ্টন করা হয় রাজনৈতিক বিবেচনায়। অথচ পরীক্ষা কমিটিতে যাঁরা থাকবেন, তাঁদের যোগ্যতার একমাত্র মাপকাঠি হওয়া দরকার সততা ও দক্ষতা। এটি সব সময় আমাদের দেশে উপেক্ষিত হয়েছে, বর্তমানেও তাই চলছে।’

নিজের বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করে এই অধ্যাপক আরও বলেন, ‘আমি নিজে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন পরীক্ষা কমিটিতে দায়িত্ব পালন করেছি। আমার অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি, একটি পরীক্ষা সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হবে কি না, সেটি নির্ভর করে পরীক্ষা কমিটির ওপর। পরীক্ষা কমিটির একজন সদস্যও যদি অসৎ হন, তবে সেই পরীক্ষা সুষ্ঠুভাবে অনুষ্ঠিত হওয়ার ক্ষেত্রে বড় ঝুঁকি থাকে। এত বড় একটা গণ-অভ্যুত্থান হলো, এতগুলো তাজা প্রাণ ঝরল, কিন্তু আমরা কোনো শিক্ষা নিলাম না! অসততা ও অন্যায়ের চর্চা আগের থেকে বেশি মাত্রায় কীভাবে করা যায়, সমাজ ও রাষ্ট্রে আমরা যেন এখন তার প্রতিযোগিতা দেখছি।’

বিশ্লেষকদের মতে, শুধু পরীক্ষা স্থগিত করা বা দু-একজন নিচের সারির অপরাধীকে গ্রেপ্তার করে এই বড় সংকট থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব নয়। প্রশ্নপত্র ফাঁসে যুক্ত মূল হোতা, প্রশ্ন কেনা অসৎ প্রার্থী এবং ভেতরের জড়িত কর্মকর্তাদের দ্রুত চিহ্নিত করতে হবে। বিশেষ ট্রাইব্যুনালে তাঁদের দৃষ্টান্তমূলক সাজা নিশ্চিত করা না গেলে সরকারি নিয়োগ পরীক্ষার ওপর সাধারণ মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনা কঠিন হবে।

আরও পড়ুন