পিএসসির সদস্য এখন ২০: এবার কি কাটবে নিয়োগের দীর্ঘসূত্রতা

৫০তম বিসিএস প্রিলিমিনারি পরীক্ষা শেষে কেন্দ্র থেকে বের হচ্ছে পরীক্ষার্থীরা। গভর্নমেন্ট কলেজ অব অ্যাপ্লাইড হিউমান সায়েন্স, আজিমপুর, ঢাকা, ৩০ জানুয়ারি ২০২৫ছবি : তানভীর আহাম্মেদ

বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশন (পিএসসি) এখন আবার পূর্ণাঙ্গ। নতুন করে চারজন সদস্য নিয়োগের মধ্য দিয়ে চেয়ারম্যানসহ কমিশনের সদস্যসংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২১–এ। দীর্ঘদিনের সদস্যসংকটের পর এটি নিঃসন্দেহে একটি ইতিবাচক খবর। তবে সদস্যসংখ্যা পূর্ণ হওয়াই শেষ কথা নয়। এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—এই পূর্ণাঙ্গ কমিশন কি সরকারি নিয়োগপ্রক্রিয়ার দীর্ঘদিনের জট কাটাতে পারবে?

সদস্যরা ব্যস্ত থাকেন নানা কাজে। চাপও অনেক তাঁদের। এবার কাজ ভাগাভাগি করে সেই চাপ কমিয়ে এগিয়ে যাওয়ার পালা।

চাকরিপ্রার্থীদের প্রত্যাশা খুবই সরল। তাঁরা চান, বিসিএসের প্রতিটি ধাপ দ্রুত শেষ হোক, কিন্তু কোনোভাবেই পরীক্ষার মান ও স্বচ্ছতার সঙ্গে আপস করা যাবে না। একই সঙ্গে নন-ক্যাডার নিয়োগের কাজও দ্রুত এগিয়ে নিতে হবে। কারণ, পিএসসির একটি সিদ্ধান্তের সঙ্গে শুধু একটি পরীক্ষার ফল নয়, হাজারো তরুণের ভবিষ্যৎ জড়িয়ে থাকে।

আরও পড়ুন

একটি বিসিএস পরীক্ষার বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ থেকে চূড়ান্ত ফল প্রকাশ পর্যন্ত দীর্ঘ সময় লেগে যাওয়া এখন অনেকটা স্বাভাবিক বিষয়ে পরিণত হয়েছে। প্রিলিমিনারি পরীক্ষা, ফল প্রকাশ, লিখিত পরীক্ষা, লিখিত পরীক্ষার ফল, মৌখিক পরীক্ষা এবং চূড়ান্ত ফল—প্রতিটি ধাপের মধ্যেই দীর্ঘ অপেক্ষা করতে হয় প্রার্থীদের। একটি বিসিএসের কার্যক্রম শেষ হওয়ার আগেই পরবর্তী বিসিএসের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ হয়ে যায়। ফলে একই সময়ে কয়েকটি বিসিএসের প্রস্তুতি, পরীক্ষা ও ফলাফলের অপেক্ষায় থাকতে হয় একজন চাকরিপ্রার্থীকে।

এই দীর্ঘসূত্রতার সবচেয়ে বড় মূল্য দিতে হয় তরুণদের। একজন প্রার্থী যখন একটি বিসিএসের চূড়ান্ত ফলের অপেক্ষায় থাকেন, তখন তাঁর বয়সসীমা এগিয়ে যায়। অন্য চাকরির সুযোগ, উচ্চশিক্ষা কিংবা বিদেশে যাওয়ার পরিকল্পনাও অনেক সময় আটকে থাকে। অথচ সরকারি চাকরির বয়সসীমা নির্দিষ্ট। ফলে নিয়োগপ্রক্রিয়ায় কয়েক মাসের বিলম্বও কোনো কোনো প্রার্থীর জন্য বড় হয়ে উঠতে পারে।

আরও পড়ুন

এখন নতুন কমিশনের সামনে তাই প্রথম কাজ হওয়া উচিত সময় ব্যবস্থাপনা প্রিলিমিনারি পরীক্ষার ফল যত দ্রুত সম্ভব প্রকাশ করা দরকার। একইভাবে লিখিত পরীক্ষার খাতা মূল্যায়ন শেষ করে ফল প্রকাশের জন্য একটি বাস্তবসম্মত সময়সীমা নির্ধারণ করা যেতে পারে। প্রার্থীরা জানবেন, পরীক্ষা দেওয়ার পর কত দিনের মধ্যে ফল পাওয়ার প্রত্যাশা করতে পারেন।

তবে দ্রুততার অর্থ যেন কোনোভাবেই মান কমিয়ে দেওয়া না হয়। পিএসসির সবচেয়ে বড় শক্তি হলো এর নিরপেক্ষতা, প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষা এবং মেধাভিত্তিক নিয়োগের প্রতি মানুষের আস্থা। দ্রুত ফল প্রকাশ করতে গিয়ে যদি মূল্যায়নের মান নিয়ে প্রশ্ন ওঠে, তাহলে সেটি হবে আরও বড় সমস্যা। তাই লক্ষ্য হওয়া উচিত দ্রুততা ও মান, দুটোই নিশ্চিত করা।

প্রযুক্তির ব্যবহার এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। প্রশ্নপত্র ব্যবস্থাপনা, পরীক্ষার খাতা গ্রহণ ও বণ্টন, ফলাফল প্রস্তুত এবং প্রশাসনিক যোগাযোগের বিভিন্ন ধাপে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো গেলে সময় কমানো সম্ভব। একই সঙ্গে কাজের চাপ অনুযায়ী পরীক্ষকদের সংখ্যা, মূল্যায়নব্যবস্থা এবং প্রশাসনিক জনবল সমন্বয় করা প্রয়োজন।

ভাইভা পরীক্ষার ক্ষেত্রেও নতুন করে ভাবার সুযোগ আছে। অনেক বিসিএস প্রার্থী লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার পর মৌখিক পরীক্ষার জন্য দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করেন। একেকটি বিসিএসের ভাইভা শেষ করতেই দীর্ঘ সময় লেগে যায়। ফলে পরবর্তী ধাপের চূড়ান্ত ফলও পিছিয়ে যায়। প্রয়োজন হলে ভাইভার সময় ও ব্যবস্থাপনা আরও কার্যকর করে প্রতিদিন বেশিসংখ্যক প্রার্থীর পরীক্ষা নেওয়া যেতে পারে। তবে এখানেও মান ও নিরপেক্ষতার সঙ্গে কোনো আপস করা যাবে না।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো নন-ক্যাডার নিয়োগ। বিসিএসে ক্যাডার পদ না পেলেও অনেক যোগ্য প্রার্থী নন-ক্যাডার পদে নিয়োগের সুযোগ পান। তাঁদের জন্য পিএসসির নন-ক্যাডার সুপারিশ একটি বড় আশার জায়গা। কিন্তু এই প্রক্রিয়াও দীর্ঘ হলে প্রার্থীদের অপেক্ষা আরও বাড়ে। তাই নতুন কমিশনের অন্যতম অগ্রাধিকার হওয়া উচিত নন-ক্যাডার নিয়োগের কাজ দ্রুত এগিয়ে নেওয়া।

পিএসসির কাজ শুধু বিসিএসের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানের নিয়োগ পরীক্ষাও কমিশনের মাধ্যমে হয়। ফলে সদস্যসংকটের অবসান শুধু বিসিএস নয়, সামগ্রিক সরকারি নিয়োগব্যবস্থার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। পূর্ণাঙ্গ কমিশন এখন যদি কাজের অগ্রাধিকার নির্ধারণ করে এগোয়, তাহলে দীর্ঘদিনের জমে থাকা কাজ ধীরে ধীরে কমানো সম্ভব।

আরও পড়ুন

এখানে আরেকটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ—পিএসসিকে শুধু প্রতিক্রিয়াশীল নয়, সময়সচেতন প্রতিষ্ঠান হতে হবে। একটি পরীক্ষা শুরু হওয়ার পর কোন ধাপে কত সময় লাগবে, তার একটি অভ্যন্তরীণ কর্মপরিকল্পনা থাকা দরকার। কোনো কারণে নির্ধারিত সময়ের বেশি লাগলে তার কারণও পর্যালোচনা করা যেতে পারে।

নতুন চার সদস্য নিয়োগের পর পিএসসির সামনে তাই বড় সুযোগ তৈরি হয়েছে। সদস্যসংকটের কারণে যে চাপ ও সীমাবদ্ধতা তৈরি হয়েছিল, তা কাটিয়ে এখন প্রতিষ্ঠানটিকে আরও গতিশীল করা সম্ভব। কিন্তু এর জন্য শুধু নতুন সদস্যদের যোগদান যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন প্রশাসনিক সংস্কৃতি ও সময় ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তন।

চাকরিপ্রার্থীদের প্রত্যাশা খুব বেশি কিছু নয়। তাঁরা চান—প্রিলিমিনারির ফল দ্রুত, লিখিত পরীক্ষার ফল দ্রুত, ভাইভা দ্রুত; কিন্তু প্রতিটি ধাপে মান, স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতা অটুট থাকুক। তাঁরা চান নন-ক্যাডার নিয়োগও দ্রুত এগিয়ে যাক। তাঁরা চান, একটি বিসিএসের জন্য বছরের পর বছর অপেক্ষা না করে একটি পূর্বানুমেয় সময়ের মধ্যে নিয়োগপ্রক্রিয়া শেষ হোক।

আরও পড়ুন

পিএসসি এখন ২০ সদস্যের পূর্ণাঙ্গ কমিশন। এই পূর্ণতা যেন শুধু সংখ্যায় সীমাবদ্ধ না থাকে; কাজের গতিতেও তার প্রতিফলন ঘটুক—এটাই এখন সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা। হাজারো তরুণের মেধা, শ্রম ও ভবিষ্যৎ এই প্রতিষ্ঠানের সিদ্ধান্তের সঙ্গে জড়িয়ে আছে। তাই নতুন কমিশনের সাফল্যের সবচেয়ে বড় মাপকাঠি হবে একটি বিষয় কত দ্রুত, কতটা স্বচ্ছভাবে এবং মান বজায় রেখে যোগ্য প্রার্থীদের হাতে নিয়োগের ফল পৌঁছে দিতে পারে।

এবার তাই অপেক্ষার অবসান হোক। পিএসসি পূর্ণ হয়েছে, এখন প্রয়োজন গতিশীলতা। ঝুলে থাকা বিসিএসের কাজ এগিয়ে যাক, নন-ক্যাডার নিয়োগের গতি বাড়ুক, আর সরকারি নিয়োগব্যবস্থায় ফিরে আসুক সময়ের শৃঙ্খলা।