চাকরিতে পদোন্নতিই কি সব? কেন বড় পদবিতে ‘না’ বলছেন নতুন প্রজন্মের কর্মীরা

কেলিন মসছবি: রয়টার্স

সফলতা মানে কি কেবল বড় পদবি আর আকাশছোঁয়া বেতন? যুগ বদলেছে। এখনকার তরুণ কর্মীদের কাছে সফলতাই শেষ কথা নয়। তাঁরা উচ্চপদের বড় দায়িত্ব আর মানসিক চাপের চেয়ে নিজের ব্যক্তিগত সময় ও প্রশান্তিকেই বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন। এমনকি বেতন দ্বিগুণ হওয়ার প্রস্তাব পেলেও অনেক দক্ষ কর্মী এখন অনায়াসেই পদোন্নতিকে ‘না’ বলে দিচ্ছেন।

২৬ বছর বয়সী সফটওয়্যার প্রকৌশলী কেলিন মস তার উদাহরণ। ২০২২ সালে স্নাতক শেষ করে চাকরিতে যোগ দেন। তিনি স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, পদোন্নতিতে তাঁর কোনো আগ্রহ নেই।

বাংলাদেশের করপোরেট সংস্কৃতিতে এখনো পদোন্নতিকে বড় সাফল্য মনে করা হয়। তবে এ দেশের নতুন প্রজন্মের কর্মীদের মধ্যেও ধীরে ধীরে এই মানসিকতা কম তৈরি হচ্ছে। বিশেষ করে যাঁরা আইটি, ফ্রিল্যান্সিং বা সৃজনশীল পেশায় আছেন, তাঁরা উচ্চপদের চেয়ে কাজের স্বাধীনতাকে বেশি প্রাধান্য দিচ্ছেন।
আরও পড়ুন
বাংলাদেশে যাঁরা আইটি, ফ্রিল্যান্সিং বা সৃজনশীল পেশায় আছেন, তাঁরা উচ্চপদের চেয়ে কাজের স্বাধীনতাকে বেশি প্রাধান্য দিচ্ছেন
ছবি: এআই

উচ্চপদ নয়, মানসিক প্রশান্তি চাই

ব্যক্তিগত সময়ের প্রতি এই ঝোঁক কেবল কেলিনের একার নয়; যুক্তরাজ্যভিত্তিক আন্তর্জাতিক সেবা প্রদানকারী নেটওয়ার্ক ডেলয়েটের ২০২৫ সালের এক জরিপ বলছে, বর্তমান প্রজন্মের মাত্র ৬ শতাংশ কর্মী বড় পদবি বা নেতৃত্বের পদ পাওয়ার স্বপ্ন দেখেন। অন্যরা কাজের পাশাপাশি ব্যক্তিগত বিকাশ আর ‘ওয়ার্ক-লাইফ ব্যালান্স’–কে বেশি প্রাধান্য দিচ্ছেন। তরুণেরা এখন ক্যারিয়ার মানেই কেবল শীর্ষে যাওয়া মনে করছেন না। যুক্তরাষ্ট্রের কেলিন মসের কথাই ধরা যাক। চার বছরের অভিজ্ঞতা থাকলেও তিনি পদোন্নতি নিতে নারাজ। তাঁর মতে, পদোন্নতি মানেই বাড়তি মিটিং, বাড়তি দায়িত্ব আর নিজের স্বাধীনতার বিসর্জন। তিনি দিনে নির্দিষ্ট কয়েক ঘণ্টা কাজ করেন। বাকি সময়টা সমুদ্রসৈকতে বই পড়ে কিংবা বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দিয়ে কাটান। দক্ষিণ ক্যারোলাইনাভিত্তিক এই প্রকৌশলী বছরে প্রায় ১ লাখ ডলার আয় করলেও ২ লাখ ডলারের বেতনের প্রস্তাবেও তিনি রাজি হননি। কারণ, কেলিন এমন জীবন চান, যেখানে মানসিক প্রশান্তি সহজেই মিলবে। তাঁর ভাষায়, উচ্চপদ মানেই বেশি চাপ, বেশি মিটিং এবং সব সময় কাজের মধ্যে ডুবে থাকা। তিনি বলেন, ‘আমি পদন্নোতি চাই না। আমি কাজ শেষে স্পষ্টভাবে বলি, এখন আমার যাওয়ার সময়।’

ক্যারিয়ারের গন্তব্য এখন আর কেবল ‘সিইও’ হওয়া নয়। নিজের মানসিক স্বাস্থ্য ঠিক রেখে সৃজনশীলভাবে কাজ করে যাওয়াই এখনকার মূলমন্ত্র।

নতুন প্রজন্ম: বদলাচ্ছে মানসিকতা

বাংলাদেশের করপোরেট সংস্কৃতিতে এখনো পদোন্নতিকে বড় সাফল্য মনে করা হয়। তবে এ দেশের নতুন প্রজন্মের কর্মীদের মধ্যেও ধীরে ধীরে এই মানসিকতা কমে যাচ্ছে। বিশেষ করে যাঁরা আইটি, ফ্রিল্যান্সিং বা সৃজনশীল পেশায় আছেন, তাঁরা উচ্চপদের চেয়ে কাজের স্বাধীনতাকে বেশি প্রাধান্য দিচ্ছেন। অনেকে বড় কোম্পানির বড় পদের চাপ নিতে না পেরে ছোট কিন্তু স্বাধীন পরিবেশে কাজের প্রতি আগ্রহী হচ্ছেন। এখন অনেকে বুঝতে পারছেন, দিন শেষে সুখী হতে হলে কাজের বাইরেও নিজের একটি জগত থাকা জরুরি। তবে উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে আমাদের এখানে পদোন্নতি এড়িয়ে যাওয়া মাঝেমধ্যে আর্থিক ঝুঁকির কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।

আর্থিক পরিকল্পনাবিদদের মতে, পদোন্নতি না নেওয়া বা বড় পদবি এড়িয়ে চলা খারাপ কিছু নয়। তবে এই পথে হাঁটলে শুরু থেকেই সঠিক আর্থিক পরিকল্পনা থাকা জরুরি। কারণ, পদোন্নতি না নিলে দীর্ঘ মেয়াদে বেতন খুব বেশি বাড়ে না। তাই ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত রাখতে অল্প বয়স থেকেই সঠিক জায়গায় বিনিয়োগ করা প্রয়োজন, যাতে একসময় কাজ না করলেও জমানো টাকা আপনার হয়ে কাজ করে।

আরও পড়ুন

ক্যারিয়ারের গন্তব্য এখন আর কেবল ‘সিইও’ হওয়া নয়। নিজের মানসিক স্বাস্থ্য ঠিক রেখে সৃজনশীলভাবে কাজ করে যাওয়াই এখনকার মূলমন্ত্র। যাঁরা এই পরিবর্তনকে ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করতে পারছেন, তাঁরা কাজের ভেতরেই খুঁজে নিচ্ছেন জীবনের আসল আনন্দ।