বিসিএস ও সরকারি চাকরির বাইরে যে দেশ আমরা গড়তে পারিনি

চাকরির পরীক্ষার আগে কেন্দ্রের বাইরে পড়াশোনা করছেন এক প্রার্থীপ্রথম আলো ফাইল ছবি

ভোর ৬টা। দেশের যেকোনো প্রথম সারির পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের সামনে দাঁড়ালে এক অদ্ভুত দৃশ্য চোখে পড়ে। শত শত তরুণ-তরুণী লাইন ধরে দাঁড়িয়ে আছেন। উদ্দেশ্য, লাইব্রেরি খুললেই একটি সিটে বসে পড়াশোনা করা। কিন্তু অবাক করা বিষয় হলো, এই মেধাবী শিক্ষার্থীদের টেবিলে কোনো আন্তর্জাতিক মানের জার্নাল, গবেষণাপত্র বা নতুন কোনো উদ্ভাবনী আইডিয়ার বই নেই। তাঁদের সামনে স্তূপ করে রাখা আছে এমপিথ্রি, প্রফেসরস বা অ্যাসিওরেন্সের মতো বিসিএস এবং সরকারি চাকরির গাইড বই।

একটি জাতির সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠগুলোর অবস্থা যখন এমন হয়, তখন বুঝতে হবে সেই দেশের কাঠামোগত চিন্তায় বড় কোনো গলদ রয়ে গেছে। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ যখন স্বাধীন হয়, তখন বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে শুভানুধ্যায়ীরা বলেছিলেন, এই দেশটি টিকবে না। হেনরি কিসিঞ্জার তো বলেছিলেন তলাবিহীন ঝুড়ি। কিন্তু বাংলাদেশ টিকেছে। বরং গত পাঁচ দশকে যেভাবে মাথাপিছু আয় বেড়েছে, যেভাবে শিশুমৃত্যু কমেছে, তা বিশ্বকে অবাক করেছে। টিকে থাকার এই লড়াইয়ে বাংলাদেশ এর জন্য সব থেকে বড় বাধা ছিল দেশের শিক্ষাব্যবস্থা এবং প্রতিটি ক্ষেত্রে আমলাদের হস্তক্ষেপ।

আরও পড়ুন

আমরা প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম ধরে সার্টিফিকেট আর সরকারি চাকরির জন্য আমাদের শিক্ষার্থীদের তৈরি করছি। আমরা এমন এক বাংলাদেশ গড়ে তুলেছি, যেখানে একজন বিশ্বমানের গবেষক বা সফল উদ্যোক্তার চেয়ে একজন সরকারি আমলার সামাজিক মর্যাদা বহুগুণ বেশি। তাঁদের চাকরির কাছে অন্যদের পেশাকে হেয়প্রতিপন্ন করা হয়; এবং সব ধরনের জবাবদিহিতার বাইরে তাঁদের রাখা হয়। তাঁদের পারফরম্যান্স মূল্যায়ন এ জনসাধারণের কোনো অংশগ্রহণ নেই। আর এই লোভনীয় বন্দোবস্তের দিকে ঢলে পড়েছে প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম। আর এই আমলাতান্ত্রিক সংস্কৃতি এবং সরকারি চাকরিকেন্দ্রিক সামাজিক মানসিকতা আমাদের তরুণ প্রজন্মের সৃজনশীলতাকে গলা টিপে হত্যা করছে।

আর তাই, কিউএস ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি র‍্যাংকিংসে বাংলাদেশের কোনো বিশ্ববিদ্যালয় শীর্ষ ৪০০ হিসেবে স্থান পায় না। টাইমস হায়ার এডুকেশনের সাম্প্রতিক বিশ্লেষণ (মে ২০২৬) সরাসরি বলছে, বিগত দুই দশকে বাংলাদেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো দলীয় পৃষ্ঠপোষকতার যন্ত্রে পরিণত হয়েছে। এই মানসিকতার শিকড় খুঁজতে আমাদের একটু ইতিহাসে তাকাতে হবে। ১৮৩৫ সালের ২ ফেব্রুয়ারি। ব্রিটিশ ভারতের সুপ্রিম কাউন্সিলের সদস্য লর্ড থমাস ব্যাবিংটন মেকলে তাঁর বিখ্যাত মিনিট অন এডুকেশন উপস্থাপন করেন। তাঁর উদ্দেশ্য ছিল এমন একদল মানুষ তৈরি করা, যারা রক্তে ও বর্ণে হবে ভারতীয়, কিন্তু রুচি, মতাদর্শ, নৈতিকতা ও বুদ্ধিবৃত্তিতে হবে ইংরেজ। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের প্রশাসনিক কাজ চালানোর জন্য তাদের প্রয়োজন ছিল অনুগত কেরানি ও প্রশাসক, কোনো স্বাধীন চিন্তার উদ্ভাবক নয়।

লেখক
আরও পড়ুন

আশ্চর্যজনক সত্য হলো, প্রায় ১৯০ বছর পর আজও আমরা মেকলের সেই কেরানি তৈরির ফাঁদ থেকে বের হতে পারিনি! আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা ও উচ্চশিক্ষার রাজনৈতিকীকরণ এমন এক ইকোসিস্টেম তৈরি করেছে, যেখানে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকেরাও গবেষণার চেয়ে প্রশাসনিক পদ বা রাজনৈতিক লেজুড়বৃত্তিতে বেশি সময় দিচ্ছেন। ফলে শিক্ষার্থীরাও শিখছে কীভাবে সিস্টেমের অংশ হয়ে ক্ষমতা ও নিরঙ্কুশ নিরাপত্তার স্বাদ নেওয়া যায়, কীভাবে নতুন কিছু সৃষ্টি করতে হয়, তা তারা শিখছে না।

বিশ্বের শীর্ষ বিশ্ববিদ্যালয়গুলো, যেমন এমআইটি বা স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় মূলত একটি নীতিতে পরিচালিত হয়। সেখানে গবেষণা সবার আগে। তাদের শিক্ষার্থীরা সমস্যা খোঁজেন এবং সমাধান তৈরি করেন। ১৯৩৯ সালে স্ট্যানফোর্ডের দুজন গ্র্যাজুয়েট ছাত্র উইলিয়াম হিউলেট এবং ডেভিড প্যাকার্ড তাদের গ্যারেজে বসে হিউলেট-প্যাকার্ড প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। সেই গ্যারেজটিকে এখন সিলিকন ভ্যালির জন্মস্থান বলা হয়। বিপরীতে বাংলাদেশে একজন মেধাবী ছাত্র যদি তাঁর বিশ্ববিদ্যালয়ের ল্যাবে স্টার্টআপের পরিকল্পনা করেন, পরিবার ও সমাজ তাঁকে বলবে, আগে একটা সরকারি চাকরি নাও, তারপর ব্যবসা করো। আর তাই প্রতিবছর মাত্র তিন হাজার পদের জন্য গড়ে তিন লাখ মেধাবী তরুণ প্রতিবছর একটি পরীক্ষার পেছনে দৌড়ান। যাঁরা ব্যর্থ হন, তাঁরা বেসরকারি চাকরির জন্য হয় রাজধানী ঢাকাতে পাড়ি জমান আর না হয় শেষমেশ দেশ ছাড়েন।

ব্রিটিশ কাউন্সিলের নেক্সট জেনারেশন বাংলাদেশ ২০২৪ শীর্ষক গবেষণায় দেখা গেছে, ১৮ থেকে ৩৫ বছর বয়সী ৫৫ শতাংশ তরুণ বিদেশে চলে যেতে চান। হিউম্যান ফ্লাইট অ্যান্ড ব্রেন ড্রেন ২০২৪ নামের সূচকে বাংলাদেশের স্কোর ১০-এর মধ্যে ৬.৭, যেখানে বৈশ্বিক গড় মাত্র ৪.৯৮। এই সূচকে আমরা ১৭৬টি দেশের মধ্যে ৩৭তম। বাংলাদেশের মেধাবীদের আমরা বারংবার দেশ ছেড়ে চলে যেতে দেখছি, এখানে গবেষকদের জন্য সম্মান নেই, উদ্যোক্তাদের জন্য কাজ করার পরিবেশ নেই। একজন তরুণ গবেষক যখন দেখেন তাঁর কাজের জন্য সরঞ্জাম নেই, ফান্ড নেই, প্রকাশনার পরিবেশ নেই—তখন দেশ ছেড়ে যাওয়াটা তো বিশ্বাসঘাতকতা নয়, তার বেঁচে থাকার সিদ্ধান্ত। ভারতে ২০২১ সালে ৮৫টিরও বেশি ইউনিকর্ন ছিল। ২০২১ সালে বাংলাদেশের প্রথম ইউনিকর্ন হয়েছে বিকাশ।

আরও পড়ুন

তিক্ত সত্য হচ্ছে—বাংলাদেশে ব্যবসা শুরু করতে গেলে একজন উদ্যোক্তাকে গড়ে ১৯-২১টি সরকারি কার্যালয়ে যেতে হয়, বিভিন্ন লাইসেন্স ও ছাড়পত্র সংগ্রহ করতে হয়। ইজ অব ডুইং বিজনেস সূচকে বাংলাদেশ ১৯০টি দেশের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে ১৬৮ নম্বরের আশপাশে থাকে। তুলনায় ভারত ৬৩তম, ইন্দোনেশিয়া ৭৩তম। আমাদের উদ্যোক্তারা সরকারি প্রক্রিয়ার ভেতরে ক্লান্ত হয়ে হাল ছেড়ে দেন, অথবা বিকল্প পথে চলতে বাধ্য হন; আর এভাবেই ব্রেইন ড্রেইন হয়ে দেশের মেধাবীরা অন্য দেশের অর্থনীতির উন্নয়নে কাজ করে। আর বারবার মুখ থুবড়ে পড়ে বাংলাদেশে অপার সম্ভাবনা। সেই সম্ভাবনার গল্প শুধু নেতা আর আমলাদের দেখানো নথি আর বুলির অংশ হয়েই রয়ে যায়, বাস্তবতার মুখ দেখে না।

বিশ্বের কাছে বাংলাদেশ আজ একটি সস্তা শ্রমের বাজার হিসেবে পরিচিত। আমরা গর্ব করি আমাদের তৈরি পোশাকশিল্প এবং প্রবাসী আয় (রেমিট্যান্স) নিয়ে। কিন্তু একটু তলিয়ে দেখলে বুঝব, এই দুটি খাতেই আমরা মূলত আমাদের সস্তা কায়িক শ্রম বিক্রি করছি।

ওয়ার্ল্ড ইন্টেলেকচুয়াল প্রপার্টি অর্গানাইজেশনের গ্লোবাল ইনোভেশন ইনডেক্স অনুযায়ী, উদ্ভাবনী সক্ষমতায় বিশ্বের ১৩০টির বেশি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ধারাবাহিকভাবে তলানির দিকে (১০৫-১১০–এর ঘরে)। পেটেন্ট বা মেধাস্বত্ব নিবন্ধনের ক্ষেত্রেও অবস্থান অত্যন্ত হতাশাজনক। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো থেকে বিশ্বমানের পেটেন্ট বের হচ্ছে না। যে বয়সটিতে একজন তরুণের মার্ক জাকারবার্গ (ফেসবুক), ল্যারি পেজ (গুগল) বা অন্তত দেশীয় কোনো সমস্যার প্রযুক্তিগত সমাধান বের করার কথা, সেই মহামূল্যবান সময় তিনি পার করছেন ‘কঙ্গোর রাজধানী কী’ তা মুখস্থ করে! অথচ চিত্রটা ভিন্ন হতে পারত। অক্সফোর্ড ইন্টারনেট ইনস্টিটিউটের অনলাইন লেবার ইনডেক্স অনুযায়ী, ফ্রিল্যান্সিং বা গিগ ইকোনমিতে বাংলাদেশ বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম শ্রম সরবরাহকারী দেশ। আমাদের তরুণেরা প্রমাণ করেছে যে সুযোগ পেলে তারা বৈশ্বিক ডিজিটাল অর্থনীতিতে অবদান রাখতে পারেন। কিন্তু এখানেও একটি আক্ষেপ রয়ে গেছে। আমরা মূলত ডেটা এন্ট্রি বা গ্রাফিকসের মতো লো-স্কিল কাজগুলো করছি। আমাদের দরকার ডিপ টেক, এআই, রোবোটিকস এবং সাসটেইনেবল ক্লাইমেট ইনোভেশন নিয়ে কাজ করা।

আমাদের সামাজিক উদ্যোগ ও সৃজনশীল শিল্পে বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে। যদি আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ‘ট্রিপল হেলিক্স মডেল’ অর্থাৎ বিশ্ববিদ্যালয়, শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও সরকারের মধ্যে সমন্বয় বাস্তবায়ন করতে পারত, তবে আজকের এই চাকরিপ্রার্থীরাই আগামী দিনের জব-ক্রিয়েটর বা চাকরিদাতা হতে পারত। এর জন্য সবার আগে প্রয়োজন আমাদের মানসিকতার পরিবর্তন। পরিবার ও সমাজকে বুঝতে হবে, বিসিএস বা সরকারি চাকরিই জীবনের একমাত্র বা চূড়ান্ত সাফল্য নয়। একজন তরুণ যখন তার স্টার্টআপ নিয়ে ব্যর্থ হয়, সমাজকে তার পাশে দাঁড়াতে হবে; তাকে তিরস্কার করার বদলে তার সাহসকে সাধুবাদ জানাতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে সনাতনী শিক্ষাকাঠামোর খোলস ভেঙে গ্লোবাল ইনোভেশন হাবে রূপান্তরিত হতে হবে। যেদিন তরুণেরা চাকরির নিশ্চয়তার চেয়ে উদ্ভাবনের ঝুঁকি নিতে বেশি ভালোবাসবেন, সেদিনই জন্ম নেবে বিসিএসের বাইরের সেই স্বপ্নের বাংলাদেশ।

সিঙ্গাপুর ১৯৬৫ সালে স্বাধীন হয়েছিল, আজ মাথাপিছু আয়ে বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ দেশ। দক্ষিণ কোরিয়া ১৯৫০-এর যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ থেকে স্যামসাং, হুন্দাই আর বিটিএসের দেশ হয়েছে। ১৩ লাখ জনসংখ্যার এস্তোনিয়া ডিজিটাল গভর্ন্যান্সে বিশ্বকে পথ দেখাচ্ছে। এই রূপান্তরের পেছনে ছিল শিক্ষায় বিনিয়োগ, উদ্ভাবনকে সম্মান করা এবং সরকারি চাকরির বাইরেও বড় হওয়ার সুযোগ তৈরি করা।

বাংলাদেশের সেই উপাদানগুলো আছে। তরুণ আছে, মেধা আছে, সংযোগ আছে, যা নেই তা হলো, সেই স্বপ্ন দেখার অনুমতি, সেই ব্যর্থতা থেকে শেখার সাহস এবং সেই প্রতিষ্ঠানগুলো, যা এই স্বপ্নকে বাস্তবে পরিণত করতে সাহায্য করবে। বিসিএস খারাপ নয়। রাষ্ট্রের প্রয়োজনে দক্ষ সিভিল সার্ভেন্ট দরকার। কিন্তু প্রতিবছর যখন তিন লাখ মেধাবী মানুষের শ্রেষ্ঠ বছরগুলো একমাত্র পরীক্ষার প্রস্তুতিতে ব্যয় হয়ে যায়, তখন একটি দেশ হিসেবে আমাদের কিছু জিজ্ঞাসা করা উচিত, এই মেধার আর কোনো গন্তব্য নেই কি? এই প্রশ্নের উত্তরেই লুকিয়ে আছে বাংলাদেশের পরবর্তী অধ্যায়। আমি বিশ্বাস করি, সেই অধ্যায় উজ্জ্বল। তবে সেটি লেখার কলম আমাদের নিজেদের হাতে নিতে হবে, অফিস ফাইলের ভেতর নয়, ল্যাবরেটরিতে, কোডিং টার্মিনালে, গবেষণার ডেস্কে এবং উদ্যোক্তার সাহসী স্বপ্নের ক্যানভাসে।

*লেখক: সিফাত খান, প্রভাষক, নর্দার্ন ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ