কোন চাকরি টিকবে আর কোনটি যাবে: এআই যুগে দেশের বেসরকারি চাকরিজীবীদের ভবিষ্যৎ
অফিসের অভ্যন্তরীণ যোগাযোগ গ্রুপগুলোতে এখন একটা কৌতুক খুব ঘোরে—‘বসকে যে মেইলটা পাঠিয়েছি, সেটা আমি লিখেছি, নাকি আমার হয়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা লিখে দিয়েছে, বস নিজেই তা নিয়ে ধন্দে আছেন!’ বাইরে হাসাহাসি হলেও ভেতরের মানসিক চাপটা কিন্তু সত্যি।
বেসরকারি চাকরি। এমনিতেই কাজের চিরন্তন চাপ, তার ওপর এখন যুক্ত হয়েছে এআই বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা। চ্যাটজিপিটি বা ক্লডের মতো প্রযুক্তিগুলো এখন আর শুধু শখের জিনিস নয়, সরাসরি আমাদের কাজের টেবিলে এসে বসেছে। হিসাব রক্ষণ, ব্যাংকিং, বিপণন, প্রযুক্তি কিংবা গণমাধ্যম—কোনো ক্ষেত্রই আর আগের মতো নেই।
আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম ‘দ্য গার্ডিয়ান’ এই বৈশ্বিক প্রবণতা নিয়ে একটি চমৎকার বিশ্লেষণ করেছে। তাদের মূল কথাটি খুব বাস্তবসম্মত—এআই আপনার কেরানিগিরির খাটুনি হয়তো কমিয়ে দেবে, কিন্তু মানুষের আবেগ, তাৎক্ষণিক বুদ্ধি আর আসল সৃজনশীলতার সামনে রোবট এখনো জিরো। প্রযুক্তির এই নতুন বাজারে কার চাকরিটা থাকবে, আর কার ফাইল বন্ধ হবে? চাকরি-বাকরি ডেস্ক অনুসন্ধান...
হিসাব রক্ষণ ও অর্থ বিভাগ: শুধু তথ্য তুললে বিপদ
মাসের শেষে ভাউচার মেলানো বা হিসাবের খাতা তৈরি করতে আগে দিন–রাত এক হতো। এখন সফটওয়্যার এক ক্লিকেই সব আয়-ব্যয় মিলিয়ে দিচ্ছে। এক বেসরকারি কোম্পানির হিসাব কর্মকর্তা সাজিদ হাসান স্পষ্ট বললেন, ‘এখন শুধু কম্পিউটারে বসে তথ্য তুললে চাকরি থাকবে না। এআই হিসাব মিলিয়ে দিচ্ছে ঠিকই, কিন্তু সেই হিসাব দেখে কোম্পানির লাভ-ক্ষতির কৌশল বানানোর দায়িত্ব আমাদেরই। মানে, শুধু হিসাব রাখার দিন শেষ, এখন বিশ্লেষক হতে হবে।’
প্রাথমিক স্তরের রুটিন কাজ এআই দ্রুত গ্রাস করছে। তবে গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে একটি প্রযুক্তিপ্রতিষ্ঠানের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, আনুষ্ঠানিক কাজ রোবট করলেও বড় ঝুঁকি নেওয়া আর চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের জন্য মানুষের মগজই শেষ কথা।
ব্যাংকিং ও মানব সম্পদ বিভাগ: গ্রাহকসেবায় রোবট
ব্যাংকের জুনিয়র পদের কাজ কিংবা গ্রাহকসেবা কেন্দ্রে এখন মানুষের চেয়ে চ্যাটবটের ব্যবহার বাড়ছে। ছুটির হিসাব বা জীবনবৃত্তান্ত বাছাইয়ের কাজও এখন স্বয়ংক্রিয়। একটি নামী প্রতিষ্ঠানের নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন মানবসম্পদ কর্মকর্তা জানান, প্রাথমিক বাছাইয়ের কাজগুলো এআই নিজে নিজেই করে ফেলছে। ফলে পেছনের সারির কাজের জন্য আগের মতো আর বিশাল দল লাগছে না। স্বভাবতই তরুণ কর্মীদের মনে একধরনের ছাঁটাইয়ের ভয় কাজ করে। তথ্য সংরক্ষণের কাজ কমলেও বিনিয়োগ বা জটিল ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার জায়গায় মানুষের উপস্থিতি আবশ্যক।
প্রযুক্তি ও প্রকৌশল: কোডারদের নতুন লড়াই
এআই এখন নিজেই কোড লিখে দিচ্ছে, ত্রুটি ঠিক করছে। ফলে জুনিয়র প্রোগ্রামার বা যাঁরা শুধু কপি-পেস্টের কাজ করতেন, তাঁদের কপালে ভাঁজ। প্রযুক্তি খাতের ভেতরের খবর হলো, সাধারণ কোডারদের চাহিদা কমছে। কিন্তু যাঁরা তথ্যবিজ্ঞান, সাইবার নিরাপত্তা বা এআই পরিচালনা নিয়ে কাজ করছেন, তাঁদের কদর এখন তুঙ্গে। এআই হয়তো ইটের পর ইট সাজিয়ে কোড তুলতে পারে, কিন্তু পুরো ব্যবস্থার নকশা বানাতে মানুষের মেধারই প্রয়োজন।
গণমাধ্যম ও সৃজনশীল কাজের এলাকা: নকলের দিন শেষ
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের লেখা বা বিজ্ঞাপনের ভাষা এখন এআই দিয়ে দেদার লেখানো হচ্ছে। সাংবাদিকতায় সাধারণ অনুবাদ বা তথ্য খোঁজার কাজও করছে প্রযুক্তি। যাঁরা শুধু গতানুগতিক বা মাঝারি মানের লেখা লিখতেন, তাঁদের বাজার খারাপ। কিন্তু আসল সৃজনশীলতা, মানুষের মনস্তত্ত্ব আর আবেগ রোবটের সিলেবাসে নেই। মাঠপর্যায়ের অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা বা মানুষের জীবনঘনিষ্ঠ গল্প কোনো যন্ত্র অনুভব করতে পারে না।
আর সেবা খাতে রোবট হয়তো হাজারটা মেইলের চমৎকার উত্তর লিখে দেবে, কিন্তু গ্রাহকের সঙ্গে বসে এক কাপ কফি খেতে খেতে চুক্তি চূড়ান্ত করা এআইয়ের সাধ্যের বাইরে।
অফিস সাপোর্ট ও লজিস্টিকস: রোবটের প্রবেশ নিষেধ
সবচেয়ে দারুণ টুইস্টটা কিন্তু এখানেই। এসি রুমে ল্যাপটপ নিয়ে বসা মিড বা টপ লেভেলের কর্মকর্তাদের ডেস্ক যখন প্রযুক্তির কারণে কিছুটা নড়বড়ে, তখন একদম ‘সেফ জোনে’ আছেন ফ্রন্ট ডেস্ক, লজিস্টিকস ও গ্রাউন্ড স্টাফরা। অফিসের অতিথিদের আপ্যায়ন করা, ইন্টারনাল লজিস্টিকস সামলানো কিংবা সার্ভার রুম ও যন্ত্রপাতির হুটহাট মেকানিক্যাল ত্রুটি মেটানো—এসব এআইয়ের সিলেবাসেই নেই। মানুষের এই তাৎক্ষণিক উপস্থিত বুদ্ধি এবং হাতের সূক্ষ্ম কাজ রোবট চাইলেও সহজে ‘কপি’ করতে পারবে না। ফলে এই স্তরের কাজগুলো এখনো পুরোপুরি সুরক্ষিত।
সোজা কথা, আতঙ্কিত হয়ে লাভ নেই। যাঁরা শুধু মুখস্থ বা একঘেয়ে কাজের গণ্ডিতে আটকে থাকবেন, তাঁরা চাকরিক্ষেত্র থেকে ছিটকে যাবেন। আর যাঁরা এআইকে শত্রু না ভেবে নিজের কাজের ব্যক্তিগত সহকারী বানিয়ে নেবেন, রুটিরুজির লড়াইয়ে তাঁরাই নেতৃত্ব দেবেন।