প্রাথমিকে সুপারিশপ্রাপ্ত শিক্ষকদের ‘সফল আন্দোলন’ ঘিরে ৩ ঘণ্টা যা যা ঘটল

সহস্রাধিক শিক্ষক রোদ-বৃষ্টি উপেক্ষা করে, সন্তান–অভিভাবকসহ অংশ নেন কর্মসূচিতেছবি: খালেদ সরকার

গত দুই বছরে শাহবাগে অসংখ্য আন্দোলন হয়েছে। এর মধ্যে সফল আন্দোলন প্রায় নেই বললেই চলে। কখনো পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে, আবার কখনো ‘আশ্বাসের ভিত্তিতে’ শেষ হয়েছে আন্দোলন। কখনো আলটিমেটাম দিয়ে চলে গেছেন আন্দোলনকারীরা। তবে দীর্ঘদিন পর একটি সফল আন্দোলন দেখল রাজধানীর শাহবাগ।

আন্দোলনটি ছিল প্রাথমিকে সুপারিশপ্রাপ্ত সহকারী শিক্ষকদের চাকরিতে যোগদান ও পদায়নের প্রজ্ঞাপনের দাবিতে। বেলা ১১টা থেকে শাহবাগে অবস্থান নেন আন্দোলনকারীরা। সব দাবি পূরণ হওয়ায় বেলা ২টায় তাঁরা আন্দোলনের সমাপ্তি ঘোষণা করেন। আন্দোলন ঘিরে সারা দিন যা যা ঘটল—

জড়ো হয়েছিলেন সহস্রাধিক আন্দোলনকারী—

পূর্বঘোষিত কর্মসূচি অনুযায়ী আজ রোববার বেলা ১১টায় শাহবাগে জড়ো হতে থাকেন প্রাথমিকে সুপারিশপ্রাপ্ত সহকারী শিক্ষকেরা। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আন্দোলনকারীদের সংখ্যাও বাড়তে থাকে। আনুমানিক এক সহস্রাধিক আন্দোলনকারী জাতীয় জাদুঘরের সামনে অবস্থান নেন। অনেকেই ঢাকার বাইরে থেকে শুধু আন্দোলনের উদ্দেশ্যে এসেছেন বলে জানান। অনেকে এসেছিলেন পরিবারের সদস্যসহ।

আরও পড়ুন
বেলা ১১টার আগেই শুরু হয় বৃষ্টি। এ সময় অনেকে ছাতা আবার কেউ কেউ প্ল্যাকার্ড দিয়ে বৃষ্টি থেকে নিজেকে আড়াল করার চেষ্টা করেন।
ছবি: প্রথম আলো

ব্যারিকেড, বৃষ্টি ও রোদ

আন্দোলনকারীরা জড়ো হওয়ার আগেই রাস্তায় ব্যারিকেড দেয় পুলিশ। অতিরিক্ত পুলিশ, এবিপিএন ও জলকামান মোতায়েন করা হয়। কর্মসূচির শুরুতেই ছিল ভিন্ন এক দৃশ্য। আন্দোলনকারীরা পুলিশ সদস্যদের হাতে ফুল তুলে দেন। এরপর জাতীয় সংগীত গেয়ে শুরু করেন কর্মসূচি। আন্দোলনকারীরা শাহবাড় মোড় থেকে টিএসসিমুখী সড়কে জাদুঘরের সামনে থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলার ফটক পর্যন্ত অবস্থান নেন।

বেলা ১১টার আগেই শুরু হয় বৃষ্টি। এ সময় অনেকে ছাতা আবার কেউ কেউ প্ল্যাকার্ড দিয়ে বৃষ্টি থেকে নিজেকে আড়াল করার চেষ্টা করেন। অনেকে অবস্থান নেন মেট্রোর পিলারের কাছাকাছি।

এর কিছুক্ষণ পর বৃষ্টি থেমে দেখা দেয় প্রচণ্ড রোদ। এবারও ছাতা, প্ল্যাকার্ড আর মেট্রোর বড় বড় পিলারের আড়ালই ভরসা। পানি ও আইস্ক্রিম বিক্রেতাদের আনাগোনাও বেড়ে যায় এ সময়। তবু আন্দোলনকারীরা রাস্তা ছেড়ে যাননি।

একেই বুঝি বলে রোদে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে আন্দোলন!

মায়ের সঙ্গে এসেছে ছোট শিশুও
ছবি: প্রথম আলো

সৃষ্টি হয় যানজটের

আন্দোলনকারীরা জাদুঘরের সামনের রাস্তায় অবস্থান নিলে যানবাহন চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। তবে শাহবাগ থানার সামনের রাস্তাটি খোলা ছিল। এ সময় তীব্র যানজট সৃষ্টি হওয়ায় চলাচলকারী ব্যক্তিরা দুর্ভোগের মধ্যে পড়েন।

সন্তান, অভিভাবকসহ আন্দোলনে

আন্দোলনস্থল ঘুরে দেখা গেছে, সুপারিশপ্রাপ্ত অনেক শিক্ষক সন্তানদের নিয়ে অবস্থান কর্মসূচিতে অংশ নিয়েছেন। কারও কোলে শিশু, কারও পাশে দাঁড়িয়ে ছোট্ট সন্তান। সন্তানদের দেখাশোনার বিকল্প না থাকায় তাঁদের সঙ্গে নিয়েই আন্দোলনে থাকতে হচ্ছে বলে জানান তাঁরা।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আন্দোলনকারী এক নারী বলেন, ‘ঝালকাঠি থেকে এসেছি দুই সন্তানসহ। আমার স্বামীও এসেছেন নিরাপত্তার খাতিরে।’

বেশ কয়েকজন সুপারিশপ্রাপ্ত নারী সহকারী শিক্ষকের সঙ্গে তাঁদের অভিভাবক এসেছেন। যাত্রাবাড়ী থেকে আগত আলী হোসেন নামের একজন বলেন, ‘মেয়ে আন্দোলনে আসতে চাচ্ছিল। কিন্তু আমি একা ছাড়তে চাইনি। কখন কী হয়, তা বলা যায় না। তাই আমিও সঙ্গে এসেছি।’

নতুন বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের পর আন্দোলনকারীরা রাস্তা পরিষ্কার করে শাহবাগ ত্যাগ করেন
ছবি: প্রথম আলো

পদায়নের তারিখ ঘিরে জটিলতা—

বেলা ১১টায় প্রকাশিত বিজ্ঞপ্তিতে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় জানায়, সহকারী শিক্ষক নিয়োগ ২০২৫-এ চূড়ান্তভাবে নির্বাচিত প্রার্থীদের আগামী ১ অক্টোবর যোগদান করতে হবে। ছড়িয়ে পড়ে ২ অক্টোবর তাঁদের পদায়ন করা হবে।

সুপারিশপ্রাপ্ত সহকারী শিক্ষকরা যোগদানের তারিখ ঘোষণায় আনন্দিত হলেও পদায়নের তারিখ নিয়ে আপত্তি জানান। ২ অক্টোবর শুক্রবার হওয়ায় ৪ অক্টোবর পদায়নের তারিখ হিসেবে ঘোষণা করে প্রজ্ঞাপন জারি করার দাবি জানান তাঁরা। দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত অবস্থান কর্মসূচি চালিয়ে যান সুপারিশপ্রাপ্ত সহকারী শিক্ষকেরা।

আরও পড়ুন

অবশেষে এল কাঙ্ক্ষিত সংবাদ—

সরকার আগামী ১ অক্টোবর যোগদান এবং ৪ অক্টোবর পদায়নের তারিখ ঘোষণা করে বিজ্ঞপ্তি জারি করলে ৩ ঘণ্টার অবস্থান কর্মসূচির পর বেলা ২টার দিকে আন্দোলন প্রত্যাহার করে নেন তাঁরা। দীর্ঘ ১৭৫ দিনের অপেক্ষার অবসান ঘটে সুপারিশপ্রাপ্ত সহকারী শিক্ষকদের।

নতুন বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের পর আন্দোলনকারীরা সরকারকে ধন্যবাদও জানান। পরে নিজেরাই রাস্তা পরিষ্কার করে শাহবাগ ত্যাগ করেন। দীর্ঘ অপেক্ষা, রোদ-বৃষ্টি উপেক্ষা করে অবস্থান এবং সন্তান-পরিবারকে সঙ্গে নিয়ে করা সেই আন্দোলনের সমাপ্তি ঘটে কাঙ্ক্ষিত তারিখ পাওয়ার মধ্য দিয়ে। সেই সঙ্গে শাহবাগও একটি সফল আন্দোলনের সাক্ষী হলো।

আরও পড়ুন