পিএসসির পাঁচ দশক: মেয়াদ পূর্ণ করেছেন মাত্র ৪ চেয়ারম্যান
বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশন (পিএসসি) ৫৪ বছর পার করেছে। কিন্তু চেয়ারম্যান পদে পুরো মেয়াদ শেষ করার ঘটনা খুবই কম। স্বাধীনতার পর থেকে এখন পর্যন্ত এই সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানে দায়িত্ব পালন করেছেন মোট ১৮ জন চেয়ারম্যান। তবে তাঁদের মধ্যে মাত্র ৪ জন চেয়ারম্যান নির্ধারিত পুরো মেয়াদ পূর্ণ করতে পেরেছেন। বাকি ১৪ জনই মেয়াদ পূর্ণ করতে পারেননি। নানা রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক পরিস্থিতিতে তাঁদের সরে দাঁড়াতে হয়েছে।
সংবিধান অনুযায়ী, পিএসসি চেয়ারম্যানের কাজের মেয়াদকাল পাঁচ বছর। তবে এ ক্ষেত্রে তাঁর বয়স ৬৫ বছর পূর্ণ হওয়া পর্যন্ত, যা আগে আসে। কিন্তু রাজনৈতিক পরিবর্তন ও সরকারের অনীহার কারণে অধিকাংশ চেয়ারম্যানকে নির্ধারিত সময়ের আগেই দায়িত্ব ছাড়তে দেখা গেছে। এ ছাড়া অভ্যন্তরীণ বিভিন্ন টানাপোড়েনও এর পেছনে কাজ করেছে।
মেয়াদ পূর্ণ করা চার চেয়ারম্যান
পিএসসির ইতিহাসে যে চারজন চেয়ারম্যান সফলভাবে তাঁদের পাঁচ বছরের মেয়াদ শেষ করেছেন, তাঁদের মধ্যে প্রথম ছিলেন এ কিউ এম বজলুল করিম। তিনি ১৯৭২ সালের ১৫ মে থেকে ১৯৭৭ সালের ১৫ ডিসেম্বর পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন। এরপর এম মইদুল ইসলাম ১৯৭৭ সালের ২২ ডিসেম্বর থেকে ১৯৮২ সালের ২১ ডিসেম্বর পর্যন্ত তাঁর পুরো মেয়াদ শেষ করেন। পরবর্তী সময় অধ্যাপক এস এম এ ফায়েজ ১৯৯৩ সালের ১ মার্চ থেকে ১৯৯৮ সালের ৫ মার্চ পর্যন্ত দায়িত্ব সামলান। আর অধ্যাপক জেড এন তাহমিদা বেগম ২০০২ সালের ৯ মে থেকে ২০০৭ সালের ৭ মে পর্যন্ত সফলভাবে পাঁচ বছর পূর্ণ করেন। সা’দত হোসেন ২০০৭ সালের মে থেকে ২০১১ সালের নভেম্বর পর্যন্ত ৪ বছর সাড়ে ৬ মাস দায়িত্ব পালন করেন, যা তাঁর বয়স ৬৫ বছর পূর্ণ হওয়ায় শেষ হয়।
পিএসসির চেয়ারম্যান অধ্যাপক মোবাশ্বের মোনেম গতকাল মঙ্গলবার পদত্যাগ করেছেন। সংবিধান অনুযায়ী, চেয়ারম্যানের মেয়াদ ৫ বছর বা ৬৫ বছর বয়স পর্যন্ত। তবে প্রতিষ্ঠানটির ৫৪ বছরের ইতিহাসে ১৮ জন চেয়ারম্যানের মধ্যে মাত্র ৪ জন পূর্ণ মেয়াদ শেষ করেছেন
অর্ধশতকের ধারা ও চলমান পরিস্থিতি
অন্যদিকে পুরো মেয়াদ সম্পন্ন করতে না পেরে নির্ধারিত সময়ের আগেই বিদায় নিয়েছেন ১০ জন চেয়ারম্যান। তাঁদের মধ্যে সাবেক রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিন আহমেদ, মোস্তফা চৌধুরী, ইকরাম আহমেদ, এ টি আহমেদুল হক চৌধুরীসহ অনেকেই সময়ের আগে পদ ছেড়েছেন। রাজনৈতিক পটপরিবর্তন হলে আগের সরকারের আমলের চেয়ারম্যানকে পদ ছাড়তে দেখা যায়। এটি এখন একধরনের অঘোষিত প্রথা হয়ে দাঁড়িয়েছে। যেমন ২০২৪ সালের ৮ অক্টোবর পদত্যাগ করেন সোহরাব হোসাইন। এ ছাড়া প্রশাসনিক টানাপোড়েন বা শারীরিক অসুস্থতার কারণেও অনেকে পদ ছেড়েছেন। অধ্যাপক মোবাশ্বের মোনেমের পদত্যাগের মধ্য দিয়ে সেই পুরোনো ইতিহাসে নতুন একটি অধ্যায় যুক্ত হলো।
পিএসসির যাত্রা ও সাংবিধানিক কাঠামো
স্বাধীন বাংলাদেশে ১৯৭২ সালে সংবিধানের ১৩৭ অনুচ্ছেদের ওপর ভিত্তি করে সরকারি কর্ম কমিশন গঠিত হয়। এরপর ১৯৭২ সালের ৮ মে একটি আদেশের মাধ্যমে পিএসসি আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করে। পরবর্তী সময় ১৯৭৭ সালে এটি পুনর্গঠিত হয়ে একটি একক কমিশন হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়।
পিএসসি মূলত একজন চেয়ারম্যান ও সংবিধানে নির্ধারিতসংখ্যক সদস্যের সমন্বয়ে গঠিত হয়। সংবিধান অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতির মাধ্যমে পিএসসির চেয়ারম্যান ও অন্য সদস্যরা মেধা ও প্রশাসনিক অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে নিয়োগ পান। কমিশনের অন্তত অর্ধেক সদস্যকে অবশ্যই ন্যূনতম ২০ বছর সরকারি চাকরিতে দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন হতে হয়।
সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে পিএসসির মূল দায়িত্ব হলো প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিয়োগের জন্য উপযুক্ত ও মেধাভিত্তিক প্রার্থী বাছাই করা। সিভিল সার্ভিসের পরীক্ষা পরিচালনা বিষয়ে কাজ করে কমিশন। এ ছাড়া চাকরির শৃঙ্খলা এবং সার্ভিস রুলস প্রণয়নে সরকারকে পরামর্শ দেওয়ার মতো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বও তাঁরা পালন করেন।
পিএসসির স্বাধীন নিরপেক্ষতা বজায় রাখতে এর চেয়ারম্যান ও সদস্যদের সাংবিধানিক সুরক্ষা দেওয়া হয়েছে। সুপ্রিম কোর্টের বিচারকদের যেভাবে অপসারণ করা হয়, সেই সুনির্দিষ্ট প্রক্রিয়া ছাড়া পিএসসি চেয়ারম্যানকে চাইলেই অপসারণ করা যায় না।