স্বপ্নের চাকরি কখন ছাড়বেন, কেন ছাড়বেন
ছোটবেলা থেকেই প্রাণীদের নিয়ে কাজ করতে চেয়েছিলেন ৩৩ বছর বয়সী ভেনেসা কার্পেন্টিয়ার। স্বপ্ন ছিল, কিন্তু এ নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভেটেরিনারি মেডিসিন বিষয়ে পড়ার সুযোগ হয়নি কানাডার মন্ট্রিলের এই বাসিন্দার। কিন্তু স্বপ্ন তো পূরণ করতে হবে! এ কারণে তিনি ভেটেরিনারি টেকনিশিয়ান হিসেবে প্রশিক্ষণ নেন। তারপর কাঙ্ক্ষিত চাকরিও পেয়ে যান।
ভেনেসা বলেন, ভেটেরিনারি টেকনিশিয়ান হিসেবে প্রশিক্ষণ নেওয়ার সিদ্ধান্তটা দারুণ ছিল। প্রশিক্ষণ শেষে এ ক্ষেত্রে চাকরিও জুটে যায়। তখন তাঁর মনে হয়েছিল, জীবনে জিতে গেছেন তিনি।
তবে অল্প কিছুদিনের মধ্যে ভেনেসা বুঝতে পারেন, স্বপ্নের চাকরি যতটা স্বপ্নময় মনে হয়েছিল, আসলে ততটা নয়। এ ক্ষেত্রে বিরক্তিকর সহকর্মী, পোষা প্রাণীর মালিকদের দুর্ব্যবহার ও অতিরিক্ত কাজ করে অল্প বেতনের কারণে ভেনেসার মন বিষিয়ে ওঠে। প্রতিষ্ঠান বদল করে একই চাকরিও করেছেন। কিন্তু এ ক্ষেত্রে একটি সমস্যার সমাধান হলে অন্য আরেকটি সমস্যা এসে সামনে দাঁড়ায় তাঁর।
ভেনেসা বলেন, ‘সকাল সাতটায় কাজ শুরু করতাম। এ কাজ কখনো মধ্যরাতে শেষ হতো। পরের দিন আবার সাতটায় শুরু।’ তিনি আরও বলেন, গত কয়েক বছরে তিনি জানতেন না যে কাজ শেষে ঠিক কখন তিনি বাড়িতে ফিরবেন। এ কারণে পরিবার শুরু করার চিন্তা তিনি আটকে রেখেছিলেন।
নিজের পছন্দের চাকরি টানা ১৩ বছর করার পর ভেনেসা ওই চাকরি ছেড়ে দেন। তিনি বলেন, ‘প্রাণীদের প্রতি সর্বোচ্চ ভালোবাসা দিয়ে কাজটা করছিলাম। পরে বুঝতে পারি, আমি আসলে নিজেকেই ভুলে গেছি। এখন আমি একটি ব্যাংকে ফ্রড এজেন্ট হিসেবে রিমোট কাজ করছি। নিজেকে দেওয়ার মতো এতটা সময় আগে কখনো পাইনি।’
নতুন কোনো প্রতিষ্ঠানে নতুন একটা কাজ করা অনেক কঠিন বিষয়। ভেনেসা যে শুধু প্রাণী ও কাজটা ছেড়ে দিয়েছেন, তা নয়, বরং তিনি এত দিনের গড়ে ওঠা নিজের পরিচয় ও খ্যাতিও ছেড়ে দিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘আমি আগে ক্যারিয়ারের শীর্ষে ছিলাম। যখন কথা বলতাম, মানুষ শুনত; তারা আমাকে বিশ্বাস করেছিল। আর এই নতুন চাকরিতে আমি শুধু একটি সংখ্যা। তবু আমি কখনো আগের চাকরিতে আর ফিরে যেতে চাই না।’
ভেনেসার মতো অনেকেই স্বপ্নের বা পছন্দের চাকরি পেতে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করেছেন, কঠিন পরিস্থিতি মোকাবিলা করেই এ চাকরি পেয়েছেন। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই স্বপ্নের এ চাকরিগুলোতে বিরূপ পরিবেশ ও অর্থনৈতিক অস্থিতিশীলতার কারণে অনেকেই হতাশ হয়ে পড়েন। এমন হলে ওই চাকরি ছেড়ে দেওয়াই ভালো।
কঠিন পরিস্থিতি ও অস্তিত্বের ঝুঁকি
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পছন্দের চাকরি বেছে নেওয়ার পেছনে অনেক ভালো যুক্তি থাকলেও এর কিছু বড় নেতিবাচক দিকও আছে।
অনেকের পছন্দের চাকরি টেকসই না হওয়ার পেছনে একটি কারণ হলো নিবেদিত কর্মীরা প্রায় সময় অতিরিক্ত কাজ করেও অবমূল্যায়িত হন। এরপরও কাজের প্রতি ভালোবাসা থেকেই তাঁরা এমন পরিস্থিতি সহ্য করে কাজ করে যান। ইউনিভার্সিটি অব মিশিগানের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক এরিন চেচ বলেন, ‘যদি কেউ তাঁর কাজের প্রতি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হন এবং এ কাজকে নিজের মূল পরিচয় হিসেবে দেখেন, তাহলে কর্মক্ষেত্রের এমন পরিবেশ প্রতিদিন মানিয়ে নেওয়া তাঁদের পক্ষে অনেক কঠিন।’
চেচ আরও বলেন, এমন কর্মীরা যে শুধু অতিরিক্ত কাজ করেন এমন নয়, তাঁরা প্রতিষ্ঠানের পতন দেখতেও আগ্রহী থাকেন। এটা মূলত ওই প্রতিষ্ঠানের সুপারভাইজার বা সহকর্মীদের চাকরিক্ষেত্রে অন্যায় অনুশীলনের কারণেই দেখতে চান।
এ ধরনের পরিস্থিতিতে চাকরির নিরাপত্তাসংক্রান্ত উদ্বেগ বাড়ে। এতে বাধ্য হয়ে পছন্দের চাকরি ছেড়ে দেওয়ার কথা ভাবেন কর্মীরা। তবে চাকরি ছেড়ে দেওয়া সব সময় কঠিন বলে মনে করেন চেচ। তিনি বলেন, ‘আপনি যদি সেই চাকরি ছেড়ে দেন, তাহলে এত দিন নিজের যে পরিচয় গড়ে তুলেছেন, তা হারানোর ঝুঁকি থাকে। এটি ধ্বংসাত্মক হতে পারে।’
ভেনেসা কার্পেন্টিয়ার বলেন, ‘যখন আমার চাকরি সম্পর্কে মানুষের সঙ্গে কথা বলতাম, আমি খুব গর্ব বোধ করতাম। কিন্তু যখন বুঝলাম, চাকরিটা কত বিরক্তিকর, তখন এটা ভাবা সত্যিই কঠিন ছিল।’ তিনি আরও বলেন, তিনি যখন চাকরি ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, তখন বস তাঁকে ছুটি নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছিলেন। কারণ, বস তাঁর মতো কর্মীকে হারাতে চাননি। কিন্তু তিনি সিদ্ধান্তে অটল ছিলেন। নতুন চাকরির বিষয়ে তিনি আর কারও সঙ্গে কথা বলেন না। এ চাকরিকে তিনি পরিচয়ের অংশও মনে করেন না।
চাকরি কখন ছাড়তে হবে
পছন্দের চাকরি ঠিক কখন ছাড়তে হবে, তা এ কঠিন পরিস্থিতির মধ্যে বোঝা বেশ কঠিন। দীর্ঘদিন ধরে করা পছন্দের চাকরি ছেড়ে দেওয়ার বিষয়টি কারও জন্য বড় আঘাত বা ভীতিকরও হতে পারে বলে মনে করেন চেচ। তিনি বলেন, এমন চাকরি ছাড়ার ক্ষেত্রে প্রথম পদক্ষেপ হলো কাজের পরিবেশের দিকে কঠোর নজর দেওয়া এবং এ চাকরি টেকসই কি না, তা নিশ্চিত হওয়া। কর্মীরা কতটা অতিরিক্ত সময় দিচ্ছেন এবং এর পরিপ্রেক্ষিতে বেতন-ভাতা উপযুক্ত কি না বা তাঁরা শোষণের শিকার হচ্ছেন কি না, তা-ও পর্যবেক্ষণ করতে হবে। যদি সব ঠিকঠাক না চলে, তাহলে চাকরি ছেড়ে দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।
পছন্দের বাইরে চাকরির খোঁজ করাটা গুরুত্বপূর্ণ। যেহেতু স্বপ্নের চাকরি ছেড়ে দিয়ে একজন ব্যক্তিকে তাঁর নতুন পরিচয় তৈরির সংগ্রাম করতে হয়, তাই বিষয়টি বেশ জরুরি।এরিন চেচ, ইউনিভার্সিটি অব মিশিগানের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক
পছন্দের চাকরি ছেড়ে দ্রুত কোথায় চাকরি পেতে পারেন, সে সম্পর্কে ধারণা থাকলে চাকরি ছাড়ার সিদ্ধান্ত নেওয়াটা সহজ হয়। এমন ধারণাই আটলান্টার জর্জিয়াভিত্তিক ৩০ বছর বয়সী ম্যাগি পারকিনসকে শিক্ষকতার চাকরি ছেড়ে দিতে সাহায্য করেছিল। চাকরিটি ম্যাগির অনেক পছন্দের ছিল। ছোটবেলা থেকেই তাঁর স্বপ্ন ছিল—শিক্ষক হবেন। কিন্তু এ স্বপ্নের চাকরিও তাঁকে ছাড়তে হয়েছে।
ম্যাগি পারকিনস বলেন, ‘আমার পরিকল্পনা ছিল এক বছরের জন্য অন্য স্কুলে গিয়ে কাজ করব। পুরো আবেগকে আর কাজে লাগাব না। শুধু শিশুরা নিরাপদ আছে কি না, তা নিশ্চিত করব। আর যদি গ্রীষ্মের মধ্যে একটি আরও ভালো চাকরি খুঁজে পাই, তাহলে এ চাকরি একেবারে ছেড়ে দেব।’ অবশেষে তিনি কস্টকো নামের একটি ওয়্যারহাউস চেইনে চাকরি পেয়ে যান। গত সেপ্টেম্বরে তিনি নতুন চাকরি শুরু করেছেন।
যাঁরা পছন্দের চাকরি ছেড়ে দিতে চান, তাঁদের জন্য এরিন চেচ বলেছেন, পছন্দের বাইরে চাকরির খোঁজ করাটা গুরুত্বপূর্ণ। যেহেতু স্বপ্নের চাকরি ছেড়ে দিয়ে একজন ব্যক্তিকে তাঁর নতুন পরিচয় তৈরির সংগ্রাম করতে হয়, তাই বিষয়টি বেশ জরুরি।
ম্যাগি পারকিনস পছন্দের চাকরি ছেড়ে দিলেও এখনো তিনি ছাত্রদের টিউটরিং ও ডিজিটাল সহায়তা দিয়ে পছন্দের কাজের সঙ্গে সংযুক্ত আছেন। তিনি বলেন, ‘আমি কখনোই পাঠ দেওয়া থেকে বিরত থাকিনি। আমি বুঝতে পেরেছিলাম, এখানকার পরিবেশ খুব অস্বাস্থ্যকর। তাই আমাকে এটি থেকে দূরে যেতে হয়েছিল।’