‘কেপ ভার্দে-নরওয়ে’ আতঙ্ক মাড়িয়ে সকালে পাঞ্চিং মেশিন: বিপাকে ফুটবলপ্রেমী চাকরিজীবীরা

আমেরিকার বিশ্বকাপে শেষ রাতের ম্যাচ দেখে সকালে অফিসে ছুটছেন লাখো চাকরিজীবী। ঘুম কমছে, কফির কাপ বড় হচ্ছে। বিশ্বের কিছু প্রতিষ্ঠান কর্মীদের জন্য আনছে নমনীয়তা। বাংলাদেশের কর্মক্ষেত্রেও কি এমন ভাবনার সময় এসেছে?

রাত জেগে খেলা দেখে ক্লান্ত কর্মী
ছবি: এআই

সকাল ১০টা। অফিসে ঢুকেই একের পর এক হাই তুলছেন সিনথিয়া নাজনীন (ছদ্মনাম)। চোখ দুটো জবা ফুলের মতো লাল। পাশের সহকর্মী রফিক আদনান মুচকি হেসে বললেন, ‘কী ভাই, কেপ ভার্দে তো ছেড়ে দিয়েছে। এখন ঘুমটা ছাড়ুন।’

সিনথিয়া শুধু একচিলতে ক্লান্ত হাসি দিলেন। বাংলাদেশ সময় ভোর ৪টার ম্যাচ দেখে সরাসরি অফিসে এসেছেন তিনি। রেফারি যখন শেষ বাঁশি বাজিয়েছেন, আকাশে তখন সূর্য উঠছে। ফলে একটু চোখ বোজানোর সময় আর মেলেনি। অবশ্য ‘হঠাৎ জ্বর’ বা অসুস্থতার অজুহাত দিয়ে আজ যে ছুটি নেবেন, সেই উপায়ও ছিল না। কারণ, বিশ্বকাপের এই মৌসুমে এমন অলৌকিক ছুটির মাহাত্ম্য করপোরেট বসেরা এখন আর সহজে বিশ্বাস করতে চান না।

চেনা ডেস্কে অচেনা রুটিন

সিনথিয়া নাজনীনের এই ঘুমঝুল চোখের গল্পটা এখন আর কোনো একক অফিসের চিত্র নয়। যুক্তরাষ্ট্রে অনুষ্ঠিত ফুটবল বিশ্বকাপ বাংলাদেশের হাজারো চাকরিজীবীর চিরচেনা দৈনন্দিন জীবনকে এক ধাক্কায় বদলে দিয়েছে। মাঠে লাল-সবুজের জার্সি নেই, নিকট ভবিষ্যতেও বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের খেলার সম্ভাবনা ক্ষীণ। কিন্তু তাতে কিচ্ছু যায়–আসে না! ফুটবল উন্মাদনায় এ দেশের মানুষ বরাবরের মতোই প্রথম সারিতে। ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা, ইংল্যান্ড কিংবা পর্তুগালের ম্যাচ ঘিরে ডেস্কে ডেস্কে চলছে চুলচেরা বিশ্লেষণ; অফিসের লবি, লিফট থেকে ক্যানটিন—সবখানেই এখন রাজত্ব করছে ফুটবল।

তবে মাঠের দলগুলো যা-ই হোক না কেন, এবারের বিশ্বকাপে বাংলাদেশের চাকরিজীবীদের সবচেয়ে বড় প্রতিপক্ষ কিন্তু কোনো প্রতিপক্ষ ফুটবল দল নয়, বরং ঘড়ির কাঁটা।

ছবি: এআই

ঘুম বনাম ফুটবলের মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ

টাইম জোনের বিপরীত দূরত্বের কারণে বেশির ভাগ গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচই অনুষ্ঠিত হচ্ছে বাংলাদেশ সময় মধ্যরাত কিংবা ভোরে। ফলে ফুটবলপ্রেমীদের সামনে প্রতিদিন ঘুমাতে যাওয়ার আগে একই কঠিন প্রশ্ন হাজির হচ্ছে—ঘুমাবেন, নাকি খেলা দেখবেন? সিংহভাগ মানুষ অবশ্য আপস করছেন নিজের ঘুমের সঙ্গেই। আর রাতের সেই আপসের খেসারত দিতে হচ্ছে পরদিন সকালে, অফিসের ডেস্কে বসে।

তাই সকাল থেকেই বাংলাদেশের অফিস অঞ্চলে এখন দেখা যাচ্ছে এক নতুন দৃশ্যপট। কারও হাতে বড় মগভর্তি ব্ল্যাক কফি, কেউ আবার চতুর্থ কাপ চা খেয়ে ঘুম তাড়ানোর ব্যর্থ চেষ্টা করছেন। অনেকে আবার দিনের প্রথম অনলাইন মিটিংয়ে ক্যামেরা বন্ধ রেখে সুকৌশলে হাই চেপে বসে আছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও চলছে একই গল্প। রাতের গোল নিয়ে ওলটপালট করা উচ্ছ্বাসের ঠিক কয়েক ঘণ্টা পরেই শুরু হয়ে যাচ্ছে সকালে অফিসে টিকে থাকার নানা ‘নিনজা টেকনিক’ শেয়ারিং।

আরও পড়ুন

বিশ্ব যখন নমনীয়, আমরা কোথায়?

রাত জাগার এই অবধারিত প্রভাব যে শুধু আমাদের এখানেই পড়ছে, তা নয়। বৈশ্বিক কর্মক্ষেত্রেও এটি এখন একটি বড় চিন্তার কারণ। যুক্তরাজ্যের সংবাদমাধ্যম ‘দ্য গার্ডিয়ান’–এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বড় ফুটবল টুর্নামেন্টের সময় কর্মীদের ঘুম ও মনোযোগ দুই-ই কমে যায়। আর এই রূঢ় বাস্তবতা মেনে নিয়েই বিশ্বের কিছু দূরদর্শী প্রতিষ্ঠান কর্মীদের জন্য এনেছে নমনীয় কর্মঘণ্টা (ফ্লেক্সিবল আওয়ার)। তারা ম্যাচের পরের দিন কর্মীদের দেরিতে অফিসে আসা কিংবা বাসা থেকে কাজ (ওয়ার্ক ফ্রম হোম) করার সুযোগ দিচ্ছে। লক্ষ্য একটাই—ফুটবলপ্রেমীদের আবেগ ধরে রেখেই কাজের গতি সচল রাখা।

আমাদের দেশের কর্মসংস্কৃতিও এখন ধীরে ধীরে বদলাচ্ছে। অনেক করপোরেট প্রতিষ্ঠান এখন ঘড়ির কাঁটার চেয়ে কর্মীর ‘আউটপুট’ বা ফলাফলকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। তাই চার বছর পরপর আসা এই ফুটবল মহোৎসবে কর্মীদের উৎপাদনশীলতা ধরে রাখতে সীমিত পরিসরে এমন নমনীয়তার ভাবনার সময় হয়তো এবার সত্যিই এসেছে।

ছবি: এআই

তবে অফিস নমনীয় হোক বা না হোক, পুরো বিশ্বকাপজুড়ে নিজেকে কর্মক্ষম ও সুস্থ রাখাটা কিন্তু সম্পূর্ণ নিজের ওপর।

রাত জেগেও অফিসে চাঙা থাকবেন যেভাবে

ম্যাচ বাছুন: সব ম্যাচ লাইভ দেখার দরকার নেই। নিজের প্রিয় দল বা শুধু নকআউটের গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচগুলো বেছে নিন।

পাওয়ার ন্যাপ: রাতে জাগতে হবে জানা থাকলে, সন্ধ্যায় অন্তত ৩০ মিনিটের একটি ছোট ঘুম বা ‘পাওয়ার ন্যাপ’ দিয়ে নিন।

পানির বিকল্প নেই: সকালে ভারী নাশতা কোনোভাবেই বাদ দেবেন না। অতিরিক্ত চা-কফির বদলে শরীরে পানির ভারসাম্য ঠিক রাখতে পর্যাপ্ত পানি পান করুন।

আরও পড়ুন

কাজের অগ্রাধিকার: অফিসে পৌঁছেই বেশি মনোযোগের ও কঠিন কাজগুলো দিনের প্রথম ভাগেই শেষ করে ফেলুন।

ছোট বিরতি: দুপুরের বিরতিতে ডেস্ক থেকে উঠে ১০-১৫ মিনিট চোখ বন্ধ করে বিশ্রাম নিলে ক্লান্তি অনেকটাই কেটে যাবে।

বিশ্বকাপের নকআউট পর্ব যত এগোবে, মাঠের উত্তেজনা তত বাড়বে। সেই সঙ্গে পাল্লা দিয়ে শেষ রাতে জাগার ক্লান্তি আর সকালের হাই তোলার সংখ্যাও দ্বিগুণ হবে। কিন্তু দিন শেষে অফিসের ওই পাঞ্চিং মেশিনে আঙুল ছোঁয়াতেই হবে। কারণ, মাঠের ফুটবল ম্যাচটা শেষ হয়ে যায় ৯০ মিনিটেই, কিন্তু চাকরিজীবীদের টিকে থাকার আসল ম্যাচটা চলে মাসের শেষ কর্মদিবস পর্যন্ত!

আরও পড়ুন