ঈদের ছুটিতেও কি তাড়া করছে অফিসের ক্লান্তি? জেনে নিন বার্নআউট কাটানোর উপায়

মডেল: মার্শিয়াছবি: প্রথম আলো

প্রিয়জনের সঙ্গে উৎসবের আনন্দ ভাগ করে নিতে এখন নাড়ির টানে বাড়ি ফিরছে মানুষ। শুরু হয়েছে ঈদের লম্বা ছুটি। অফিসের হাড়ভাঙা খাটুনি আর রাজপথের জ্যাম ঠেলে ঘরমুখী মানুষের একটাই চাওয়া—একটুখানি প্রশান্তি। আমাদের ধারণা, ল্যাপটপ আর অফিসের ফাইল থেকে দূরে থাকলে সব ক্লান্তি এক নিমেষেই দূর হয়ে যাবে। কিন্তু অনেকের ক্ষেত্রে দেখা যায়, ছুটির আমেজেও মনটা সতেজ হচ্ছে না। এক গভীর শূন্যতা আর বিষণ্নতা গ্রাস করছে চারপাশ থেকে। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় একেই বলা হয় ‘বার্নআউট’।

যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া ইউনিভার্সিটির মনোবিজ্ঞানের অধ্যাপক ক্রিস্টিনা মাসলাক মনে করেন, এটি কেবল সাধারণ ক্লান্তি নয়; বরং কর্মক্ষেত্রের দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপের একটি প্রতিক্রিয়া। ক্যালিফোর্নিয়া ইউনিভার্সিটির এক গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ৬৬ শতাংশ কর্মী কোনো না কোনোভাবে এই সংকটের মধ্য দিয়ে যান। বাংলাদেশের পটভূমিতে, যেখানে মাত্রাতিরিক্ত কর্মঘণ্টা আর দুঃসহ যাতায়াতই নিয়ম, সেখানে পেশাজীবীদের জন্য এই অবসাদ আরও প্রকট হয়ে দেখা দিচ্ছে।

বার্নআউট কি কেবল সাধারণ ক্লান্তি

অনেকে মনে করেন, ঈদের ছুটির এই দিনগুলোতে লম্বা ঘুম দিলেই সব ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু বার্নআউটের লক্ষণগুলো আরও গভীর। এর প্রথম ধাপ হলো চরম অবসাদ, যা ছুটির মধ্যেও কাটে না। দ্বিতীয় ধাপ হলো কাজে অনীহা এবং নিজেকে সবার থেকে গুটিয়ে নেওয়া। আপনি হয়তো পরিবারের সঙ্গে ঈদের আড্ডা দিচ্ছেন, কিন্তু মনে মনে একধরনের বিরক্তি কাজ করছে। আর তৃতীয় লক্ষণ হলো নিজের প্রতি আত্মবিশ্বাস কমে যাওয়া। আপনার মনে হতে পারে আপনি আর আগের মতো দক্ষ নন। ঈদের এই লম্বা ছুটিতে যদি আপনার মনে হয় কারও সঙ্গে কথা বলতে ভালো লাগছে না, তবে বুঝতে হবে আপনি বার্নআউটের শিকার।

আরও পড়ুন

কেন ঈদের ছুটিতেও আমাদের মন সতেজ হয় না

আমাদের মধ্যে একটা সাধারণ ভুল ধারণা আছে—একটু ঘুরে এলেই বার্নআউট কেটে যাবে। কিন্তু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যদি আপনার ওপর কাজের চাপ মাত্রাতিরিক্ত থাকে, তবে খুব ছোট ছুটি জাদুর মতো কাজ করে না। বার্নআউট কাটিয়ে উঠতে প্রয়োজন মনের বিশ্রাম। অনেক সময় দেখা যায়, ঈদের ছুটিতে গ্রামে গিয়েও আমাদের হাত বারবার ফোনের দিকে যায়। অফিসের মেইল বা সহকর্মীদের মেসেজ দেখার একধরনের তাগিদ কাজ করে। এই ডিজিটাল আসক্তি আপনাকে ছুটির আসল আমেজ থেকে দূরে সরিয়ে রাখে। ফলে শরীর বিশ্রাম পেলেও মন থেকে অফিসের দুশ্চিন্তা সরে যায় না।

ছবি: প্রথম আলো

বার্নআউট কাটানোর উপায় কী

ঈদের এই লম্বা ছুটি আপনার জন্য নিজেকে ফিরে পাওয়ার সেরা সুযোগ হতে পারে। গবেষকদের মতে, বার্নআউট থেকে বাঁচতে হলে ‘মাইক্রো-রিকভারি’ বা ছোট ছোট প্রশান্তি খুব জরুরি। ফোন হাতে নিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা স্ক্রল না করে প্রিয়জনের চোখের দিকে তাকিয়ে কথা বলুন। ছোটবেলার বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দিন। পরিবারের সঙ্গে মিলেমিশে ঈদের রান্না বা ঘরের কাজে হাত দিন। ঘরের কোণে অন্ধকার করে শুয়ে না থেকে সকালের রোদে কিংবা খোলা আকাশের নিচে কিছুক্ষণ হাঁটাহাঁটি করুন। মনে রাখবেন, সামাজিক যোগাযোগ এবং মানুষের সঙ্গে সরাসরি কথা বলা ক্লান্তি কমাতে দারুণ কাজ করে।

আরও পড়ুন

কাজ জীবনের অংশ, তবে...

প্রত্যেকের মনে রাখা উচিত কাজ জীবনের থেকে মূল্যবান নয়। আমাদের সমাজে অনেক সময় অতিরিক্ত খাটুনিকে সফলতার মাপকাঠি ধরা হয়। জেনে রাখুন, যাঁরা কাজকে খুব বেশি ভালোবাসেন, তাঁরাই সবচেয়ে বেশি বার্নআউটে ভোগেন। শরীর আর মনকে অবহেলা করে যে কাজই করুন, তা কোনো দিন টেকসই হতে পারে না। এই ঈদের ছুটিতে নিজেকে সময় দিন। অফিসের কাজ যেন আপনার ব্যক্তিগত আনন্দটুকু কেড়ে নিতে না পারে সেদিকে কড়া নজর রাখুন। যদি আপনার বার্নআউট খুব গুরুতর হয়, তবে ঈদের ছুটির পর নিজের কাজের ধরন এবং জীবনযাত্রা নিয়ে নতুন করে ভাবুন।

ঈদের এই আনন্দময় সময়টুকু হোক আপনার মানসিক প্রশান্তির এক নতুন শুরু। কাজের চাপ তো সব সময় থাকবেই, কিন্তু নিজেকে সুস্থ রাখা তার চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ। এই ঈদে ক্লান্তির পাহাড় টপকে আপনি ফিরে আসুন চনমনে–প্রাণবন্ত মানুষ হিসেবে।

আরও পড়ুন