৪৫তম বিসিএসের নিয়োগ প্রক্রিয়া শেষ প্রায় চার বছরে: জবাবদিহির দাবি

ছবি: প্রথম আলো

প্রায় চার বছর পর শেষ হলো ৪৫তম বিসিএসের নিয়োগের প্রক্রিয়া। ২০২২ সালের নভেম্বরে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের পর প্রিলিমিনারি, লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষা শেষে ২০২৫ সালের নভেম্বরে চূড়ান্ত ফল প্রকাশ করা হয়। এরপর নিয়োগের গেজেট প্রকাশে অপেক্ষা করতে হয়েছে আরও প্রায় ১১ মাস। গতকাল বুধবার রাতে ১ হাজার ৭০২ জনের নামে গেজেট প্রকাশ করেছে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। এর মধ্য দিয়ে দীর্ঘদিনের অপেক্ষার অবসান হয়েছে ঠিকই, তবে একই সঙ্গে সামনে এসেছে সরকারি নিয়োগের প্রক্রিয়ার গতি ও জবাবদিহির বড় প্রশ্ন।

আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে শুরু, গেজেট বিএনপি সরকারের আমলে

৪৫তম বিসিএসের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশিত হয়েছিল ২০২২ সালের ৩০ নভেম্বর, যখন ক্ষমতায় ছিল আওয়ামী লীগ সরকার। ২০২৪ সালের জুলাই ও আগস্টের গণ–অভ্যুত্থানের পর ওই সরকারের পতন ঘটে। ৮ আগস্ট দায়িত্ব নেয় অন্তর্বর্তী সরকার। পরবর্তী সময়ে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার পর ২০২৬ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি বিএনপি সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করে। নতুন সরকারের দায়িত্ব নেওয়ার প্রায় আট মাস পর ১৪ অক্টোবর রাতে ৪৫তম বিসিএসের নিয়োগের গেজেট প্রকাশিত হলো।

এ সময়ের মধ্যে বিসিএসের বিভিন্ন ধাপ শেষ হলেও চূড়ান্ত ফল প্রকাশের পর নিয়োগের প্রজ্ঞাপন পেতে প্রার্থীদের দীর্ঘ অপেক্ষা করতে হয়েছে। তবে পিএসসি ১ হাজার ৮০৭ জনকে সুপারিশ করলেও গেজেটে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে ১ হাজার ৭০২ জনকে। সুপারিশ পাওয়া সবার গেজেট না হওয়া এবং ভেরিফিকেশনে বাদ পড়ার বিষয়টি নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।

আরও পড়ুন

প্রশাসনিক ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়ার এমন অনিয়ন্ত্রিত ধীরগতি নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক রেজওয়ানা করিম স্নিগ্ধা। প্রথম আলোকে তিনি বলেন, ‘রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোয় প্রক্রিয়াগত বিচ্যুতি বর্তমানে একটি কালচারে পরিণত হয়েছে। প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের একটি বছরব্যাপী কাজের পরিকল্পনা থাকা উচিত। বছর শেষে সেই কাজ কতটুকু অর্জিত হলো, না হলে কেন হয়নি, তার জবাবদিহি থাকা উচিত। কিন্তু আমরা এর ধারেকাছে নেই। সরকারি নিয়োগ পরীক্ষা নিয়ে জবাবদিহির সংস্কৃতি অবশ্যই থাকতে হবে।’

দীর্ঘ অপেক্ষায় প্রার্থীদের ব্যক্তিগত সংকট

চূড়ান্ত ফল প্রকাশের পরও নিয়োগের গেজেট না হওয়ায় প্রার্থীদের মধ্যে তীব্র অনিশ্চয়তা ও মানসিক চাপ তৈরি হয়। অনেক প্রার্থী চূড়ান্ত ফলের পর নতুন চাকরির আশায় আগের চাকরি ছেড়ে দিয়ে সঞ্চয় শূন্য করেছেন, আবার কারও পরিবার পড়াশোনার খরচ চালাতে জমি বিক্রি করে নিঃস্ব হয়েছে।

এই প্রশাসনিক অব্যবস্থাপনা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন ইডেন কলেজের শিক্ষার্থী ও গণতান্ত্রিক ছাত্র কাউন্সিল কেন্দ্রীয় কমিটির অর্থ সম্পাদক স্কাইয়া ইসলাম। প্রথম আলোকে তিনি বলেন, ‘এ দেশের যেকোনো অর্জনে ছাত্র ও তরুণেরা সব সময় অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছেন। আন্দোলন–সংগ্রামে নিজের জীবন উৎসর্গ করেছেন। আমাদের ওপর ভর করেই প্রতিটি সরকার ক্ষমতায় আসে। কিন্তু সবচেয়ে বঞ্চনার শিকার হয় এই তরুণ–ছাত্রসমাজ। দেশের যত খারাপ পরিস্থিতিই হোক, একটি বিসিএস শেষ হতে চার বছর লাগা মানে রাষ্ট্র হিসেবে আমরা বারবার ব্যর্থ হচ্ছি।’

আরও পড়ুন

অন্যদিকে দেশের বিপুল বেকার জনগোষ্ঠীর সামাজিক সুরক্ষা ও নিয়োগব্যবস্থার আমলাতান্ত্রিক সংস্কার নিয়ে কথা বলেছেন বাংলাদেশ যুব ফ্রন্ট কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি রাশেদুল ইসলাম। প্রথম আলোকে তিনি বলেন, ‘উচ্চশিক্ষিত ব্যক্তিদের মধ্যে বেকারত্বের হার প্রতিনিয়ত বাড়ছে। সরকারি হিসাবে আমাদের দেশে প্রতিবছর ২০ লাখ মানুষ শ্রমবাজারে প্রবেশ করে, তবে বাস্তবে সংখ্যাটি আরও বেশি। একদিকে বিপুলসংখ্যক মানুষের কাজের সংস্থান নেই, অন্যদিকে সরকারি সুযোগ যতটুকু রয়েছে, সেখানেও চরম দায়িত্বহীনতা ও আমলাতান্ত্রিক দুরবস্থা মেনে নেওয়া যায় না। বিসিএসের বিজ্ঞপ্তি থেকে চূড়ান্ত গেজেট প্রকাশ অবশ্যই এক বছরের মধ্যে শেষ করতে হবে।’

আরও পড়ুন

গেজেট প্রকাশে এই ১১ মাসের বিলম্ব কেন হলো, তা নিয়ে প্রশাসনিক মহলেও নানা মত তৈরি হয়েছে। পিএসসির সাবেক সদস্য সমর পাল প্রথম আলোকে বলেন, ‘একটি বিষয় স্পষ্ট করা দরকার, বিসিএসের গেজেট প্রকাশের কাজ কিন্তু মন্ত্রণালয় করে থাকে। পিএসসি শুধু মন্ত্রণালয়ের চাহিদা অনুযায়ী বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ, পরীক্ষা নেওয়া ও ফল প্রকাশের দায়িত্ব পালন করে। তবে আমি মনে করি, প্রতিটি বিসিএসের বিজ্ঞপ্তি থেকে ফল প্রকাশের একটি যৌক্তিক সময় থাকা দরকার।’

বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ থেকে গেজেট পর্যন্ত তিন ভিন্ন প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক পর্ব পেরিয়ে আসা ৪৫তম বিসিএস প্রমাণ করেছে, নিয়োগের প্রক্রিয়ার ধীরগতির পেছনে কোনো একটি নির্দিষ্ট সরকারের মেয়াদ নয়; বরং পুরো প্রশাসনিক ব্যবস্থার আধুনিকায়নের অভাব দায়ী। নিয়োগের প্রক্রিয়ার প্রতিটি ধাপের সুনির্দিষ্ট সময়সীমা নির্ধারণ ও জবাবদিহি নিশ্চিত না করা গেলে তরুণদের জীবনের অমূল্য সময়ের অপচয় বন্ধ করা সম্ভব হবে না।