১০ হাজার কোটি টাকা ফেরত

বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের প্রকল্পগুলোর মাধ্যমে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) অর্থ খরচ করা হয়। খরচ করতে না পারলে বছরের শেষ দিকে এসে বরাদ্দ কমিয়ে দেওয়া হয়। বছর শেষে সেই সংশোধিত বরাদ্দের টাকাও পুরোটা খরচ করতে পারে না অনেক মন্ত্রণালয়। বিদায়ী ২০১৮–১৯ অর্থবছরের খরচের চিত্রটি বেশ ভয়াবহ। ৫৮টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগের মধ্যে ৫৬টিই সংশোধিত বরাদ্দের পুরো টাকা খরচ করতে পারেনি। এসব মন্ত্রণালয় প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা ফেরত দিয়েছে। 

পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন, পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ (আইএমইডি) বিদায়ী অর্থবছরের সংশোধিত এডিপির বিশ্লেষণ প্রতিবেদন তুলে ধরেছে। সেখানে এই চিত্র পাওয়া গেছে। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি এবং গৃহায়ণ ও গণপূর্ত—শুধু এই দুটি মন্ত্রণালয় বরাদ্দের সব টাকা খরচ করতে পেরেছে।

প্রকল্পের টাকা যাতে বেশি খরচ করা যায়, সে জন্য বিদায়ী অর্থবছরে প্রক্রিয়া সহজ করে অর্থ মন্ত্রণালয়। আগে অর্থবছরের তিন প্রান্তিক পর্যন্ত টাকা খরচে অর্থ মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন নিতে হতো না। শুধু চতুর্থ প্রান্তিকে (এপ্রিল-জুন) টাকা খরচে অনুমোদন নিতে হতো। বিদায়ী অর্থবছরে সেই শর্তও তুলে দেওয়া হয়। প্রকল্পের টাকা খরচে আর অনুমোদন লাগে না। টাকা খরচের প্রক্রিয়া এত সহজ করার পরও মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলো বরাদ্দের পুরো টাকা খরচ করতে পারেনি। 

কেন টাকা খরচ করতে পারছে না—এই বিষয়ে সাবেক সরকারি ব্যয় পর্যালোচনা কমিশনের সদস্য জায়েদ বখত প্রথম আলোকে বলেন, প্রকল্প বাস্তবায়নে প্রশাসনিক দুর্বলতা আছে। সেখানে কোনো উন্নতি হয়নি। কেন প্রকল্প সময়মতো বাস্তবায়িত হয় না, তা অজানা নয়। এখন শুধু সমস্যা দূর করতে সদিচ্ছা প্রয়োজন।

বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) এই সাবেক গবেষণা পরিচালকের মতে, একটি প্রকল্প শুরু হলে জমি নিয়ে মামলা করে দেওয়া হয়, বছরের পর বছর মামলা চলে। এসব মামলা দ্রুত নিষ্পত্তির কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয় না। এ ছাড়া ঘন ঘন প্রকল্প পরিচালক বদলি, বিদেশি সহায়তাপুষ্ট প্রকল্পে পরামর্শক নিয়োগে জটিলতা, কেনাকাটায় অস্বচ্ছতা—এসব কারণেও প্রকল্প বাস্তবায়নে দেরি হয়। সময়মতো প্রকল্প বাস্তবায়নে একটি উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন আন্তমন্ত্রণালয় কমিটি গঠন করার তাগিদ দেন তিনি।

>বিদায়ী অর্থবছরের এডিপি
এডিপি সংশোধন করে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়কে চাহিদা অনুযায়ী বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল
খরচে পিছিয়ে ৪ মন্ত্রণালয় ও বিভাগ
৫৮টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগের মধ্যে ৫৬টিই বরাদ্দের টাকা পুরোটা খরচ করতে পারেনি
সবচেয়ে বেশি ১৭৫০ টাকা টাকা ফেরত দিয়েছে বিদ্যুৎ বিভাগ


টাকা খরচ না হওয়ার প্রায় একই কারণ ব্যাখ্যা করেন উন্নয়ন প্রকল্প তদারককারী সরকারি সংস্থা আইএমইডির ভারপ্রাপ্ত সচিব আবুল মনসুর মো. ফয়েজউল্লাহ। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, এডিপির ৭০-৭৫ শতাংশ প্রকল্পে জমি অধিগ্রহণ করতে হয়। জমি অধিগ্রহণের সময় মামলা–মোকদ্দমা হয়। তাতে প্রকল্পের কাজ শুরু করতেই দেরি হয়ে যায়। এ ছাড়া আনুমানিক ধারণার ওপর প্রকল্প প্রস্তাব তৈরির কারণেও মাঠপর্যায়ে এসে নানা সমস্যার মুখে পড়তে হয়।

যারা অর্ধেক টাকা খরচ করেনি

আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ, অভ্যন্তরীণ সম্পর্ক বিভাগ (আইআরডি), সরকারি কর্ম কমিশন ও জাতীয় সংসদ সচিবালয় বরাদ্দের অর্ধেক টাকাও খরচ করতে পারেনি। সবচেয়ে খারাপ অবস্থা অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের। এই বিভাগের ৭টি প্রকল্পে ২৬৫ কোটি টাকা দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু তারা মাত্র ৪৩ কোটি টাকা খরচ করতে পেরেছে। আইআরডির ৬টি প্রকল্পের অনুকূলে ২৮৮ কোটি টাকা বরাদ্দ থাকলেও খরচ হয়েছে মাত্র ১২০ কোটি টাকা। 

আর বরাদ্দের ৭৫ শতাংশ অর্থ খরচ করতে পারেনি সব মিলিয়ে ১০টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগ। তার মধ্যে ওপরের চারটি বাদে রয়েছে স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবার কল্যাণ বিভাগ, আইন ও বিচার বিভাগ, অর্থ বিভাগ, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়, মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ এবং লেজিসলেটিভ ও সংসদবিষয়ক বিভাগ।

কারা কত ফেরত দিল

আইএমইডি সূত্রে জানা গেছে, সংশোধিত এডিপির সবচেয়ে বেশি ১ হাজার ৭৫০ কোটি টাকা ফেরত দিয়েছে বিদ্যুৎ বিভাগ। এই বিভাগের ১১৭টি প্রকল্পে বরাদ্দ ছিল ২৬ হাজার ৭৭০ কোটি টাকা। শেষ পর্যন্ত খরচ হয়েছে ২৫ হাজার ২০ কোটি টাকা। 

টাকা ফেরতে দ্বিতীয় স্থানে আছে স্থানীয় সরকার বিভাগ। এই বিভাগ ১ হাজার ২৪৭ কোটি টাকা ফেরত দিয়েছে। এই বিভাগের ২৮০টি প্রকল্পে বরাদ্দ ছিল ২৬ হাজার ৬২০ কোটি টাকা। তৃতীয় স্থানে থাকা রেলপথ মন্ত্রণালয়ের প্রায় ১ হাজার ১০০ কোটি টাকা ফেরত গেছে। এ ছাড়া স্বাস্থ্য সেবা বিভাগ ১ হাজার কোটি টাকা, স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবার কল্যাণ বিভাগ ৪৭০ কোটি টাকা, নির্বাচন কমিশন সচিবালয় ৪৩০ কোটি টাকা, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় ২৮৫ কোটি টাকা, পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় ২৫০ কোটি টাকা, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ ২২০ কোটি টাকা, সেতু বিভাগের ১৭০ কোটি টাকা ফেরত গেছে।

বিদায়ী অর্থবছরে দেড় যুগের মধ্যে সবচেয়ে বেশি এডিপি বাস্তবায়িত হয়েছে। গতবার সংশোধিত এডিপির আকার ছিল ১ লাখ ৭৬ হাজার ৬২০ কোটি টাকা। বছর শেষে বাস্তবায়িত হয়েছে ৯৪ দশমিক ৩২ শতাংশ, যা ২০০০ সালের পর সর্বোচ্চ এডিপি বাস্তবায়ন। এবার টাকার অঙ্কে খরচ হয়েছে ১ লাখ ৬৬ হাজার ৬৫৩ কোটি টাকা। 

ছোট প্রকল্পের চেয়ে সরকার এখন বড় প্রকল্পে টাকা খরচের দিকে বেশি মনোযোগী। বিশেষ করে ফাস্ট ট্র্যাকের ১০টি প্রকল্প দ্রুত শেষ করতে চায় সরকার। এতে অনেক ছোট প্রকল্পের টাকা অব্যবহৃত থেকে যাচ্ছে। চলতি অর্থবছরের এডিপির আকার ধরা হয়েছে ২ লাখ ২ হাজার ৭২১ কোটি টাকা। সরকারের অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত ১০টি ফাস্ট ট্র্যাক প্রকল্পের মধ্যে পাঁচটিতে প্রায় ৩২ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। আগামী এডিপিতে সবচেয়ে বেশি বরাদ্দ পেয়েছে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ প্রকল্প। এই প্রকল্পে চলতি অর্থবছরে ১৪ হাজার ৯৮০ কোটি টাকা রাখা হয়েছে। এরপরেই রাজধানীর মেট্রোরেলে ৭ হাজার ২১২ কোটি টাকা, পদ্মা সেতুতে ৫ হাজার ৩৭০ কোটি টাকা, মাতারবাড়ী কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্রে ৩ হাজার ৫৬ কোটি টাকা এবং দোহাজারী (চট্টগ্রাম) থেকে রামু হয়ে কক্সবাজার পর্যন্ত রেলপথ নির্মাণে ১ হাজার ১০৫ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে।