
প্রতিবছর একাদশ শ্রেণিতে ভর্তির সময় এলেই কুমিল্লার শিক্ষার্থীদের নজর থাকে কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজের দিকে। এ কলেজে ভর্তি হতে পারা যেন রাজ্য জয় করার মতো। যারা ভর্তি হতে পারে, তারা মহাখুশি। যারা পারে না, তাদের যেন স্বপ্নভঙ্গই হলো। স্নাতক (সম্মান) কোর্সেও একই চিত্র। কলেজে ভর্তির চাপ কেবল এখনই নয়, অবিভক্ত ভারতবর্ষ থেকেই এখানে পড়ার তীব্র আকাঙ্ক্ষা শিক্ষার্থীদের। কারণ, কুমিল্লায় এই বিদ্যাপীঠই হলো কীর্তিমান তৈরির বাতিঘর।
শতবর্ষ আগে থেকেই ছাত্রছাত্রীরা ‘ভিক্টোরিয়ার শিক্ষার্থী’ পরিচয়ে গর্ববোধ করে। বৃহত্তর কুমিল্লা ও নোয়াখালী, চট্টগ্রামের মিরসরাই, পার্বত্য চট্টগ্রাম এলাকা ও সিলেট বিভাগের হবিগঞ্জের শিক্ষার্থীরাও ভর্তি হয় এখানে। প্রায় ১১৭ বছরের ঐতিহ্যে লালিত এই কলেজ তৈরি করেছে প্রথিতযশা রাজনীতিবিদ, শিক্ষাবিদ, চিকিৎসক, প্রকৌশলী, সংস্কৃতিকর্মী, লেখক ও সাংবাদিক। যাঁরা আলোকিত করেছেন পুরো দেশকেই। বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন, বাষট্টির শিক্ষা আন্দোলন, ছয় দফা আন্দোলন, উনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থান, একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধ ও নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে এখানকার শিক্ষার্থীরা সামনে থেকে গণজাগরণ তৈরি করেছেন। কলেজের এমন খ্যাতি আর নাম কেবল বইয়ের পাতায় নয়, খেলার মাঠেও দ্যুতি ছড়িয়েছে। এবারের বিপিএল ক্রিকেটে অংশ নেওয়া কুমিল্লা ভিক্টোরিয়ানস নামটাও ভিক্টোরিয়া কলেজকে মনে রেখেই নেওয়া।
শতক পেরিয়ে
দানবীর ও জমিদার রায় বাহাদুর আনন্দ চন্দ্র রায় ১৮৯৯ সালের ২৪ নভেম্বর এই কলেজ প্রতিষ্ঠা করেন। ১৮৭৬ থেকে ১৯০১ সাল পর্যন্ত মহারানি ভিক্টোরিয়ার শাসনামল ছিল এ অঞ্চলে। তাই রানির স্মরণেই হয়েছিল কলেজের নামকরণ। কুমিল্লা শহরের কান্দিরপাড় এলাকার রানীদিঘির পশ্চিম পাড়ে এখনো অনেক ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে কলেজ ভবন।
কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজে পড়ছেন ২৭ হাজার ৪১৮ জন শিক্ষার্থী। কলেজে ২০টি বিষয়ে স্নাতক ও ১৮টি বিষয়ে স্নাতকোত্তর চালু আছে। ১৫৬ জন শিক্ষক শিক্ষার্থীদের পাঠদান করছেন। তাঁদের সহযোগিতার জন্য রয়েছেন তৃতীয় শ্রেণির ১১ জন, চতুর্থ শ্রেণির ১২৫ জন কর্মী। পুরো কলেজে ১১টি একাডেমিক ভবন আছে। এর বাইরে পরীক্ষা ভবন আছে একটি। ছাত্রাবাসে মোট ১ হাজার ৩৫টি আসনের মধ্যে ৬৩৫টি ছাত্রদের জন্য আর ৪০০টি ছাত্রীদের জন্য বরাদ্দ।
উপমহাদেশের কিংবদন্তি সংগীতজ্ঞ শচীন দেববর্মন, মিডিয়া ব্যক্তিত্ব রামেন্দু মজুমদার, আপেল মাহমুদ, হানিফ সংকেত, অভিনেত্রী লাকী ইনাম, মুজিবনগর সরকারের উপদেষ্টা অধ্যাপক মোজাফফর আহামদ, সেক্টর কমান্ডার মেজর (অব) রফিকুল ইসলাম ও আবু ওসমান চৌধুরী, সাবেক উপাচার্য খান সরওয়ার মুরশিদ, ফজলুল হালিম চৌধুরী, শামসুল হক, প্রয়াত প্রবীণ সাংবাদিক এ বি এম মুসা, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা এ এস এম শাহজাহান, পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির সভাপতি সন্তু লারমা, শিক্ষাবিদ ও বিজ্ঞান লেখক অজয় রায়, ভাষাসৈনিক শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত, আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের অন্যতম রূপকার রফিকুল ইসলাম, জাতীয় পতাকার রূপকার শিব নারায়ণ দাসসহ বহু কীর্তিমান এই কলেজের শিক্ষার্থী ছিলেন।
১৯২১ সাল থেকে ১৯২৩ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজে আড্ডা দিয়েছেন। কলেজের লাগোয়া রানীদিঘির দক্ষিণ-পশ্চিম কোণে বসে কবিতা ও গানের আসর জমাতেন। প্রায় প্রতিদিনই কলেজপড়ুয়া তরুণদের নিয়ে গল্পে মেতে উঠতেন। এখানে বসেই কবি তাঁর প্রেয়সী প্রমিলাকে চিঠি লিখতেন। কবিতার ছন্দে ভরা চিঠি নজরুলের সুহৃদদের মধ্যেও আনন্দের সঞ্চার করত। এখানে বসেই তিনি ‘মাধবী লতা দোলে...’সহ কয়েকটি গান রচনা করেছেন। কবিকে স্মরণ করে এ কলেজে কবির নামে ছাত্রাবাসও প্রতিষ্ঠা হয়েছে।
কেবল কবি নজরুল নন, এ কলেজে পদধূলি দিয়েছেন বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। ১৯২৬ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি কলেজ প্রাঙ্গণে এসে তিনি শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলেন।
বিজয় কেতন
কয়েক দিন আগে এক দুপুরে কলেজ আঙিনার কলা ভবনের সামনে কথা হলো জনা বিশেক শিক্ষার্থীর সঙ্গে। আলাপচারিতায় বললেন, এ কলেজের শিক্ষার্থী হিসেবে তাঁদের গর্বের শেষ নেই। ব্যবস্থাপনা তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী তাসনিম তাবাসসুম বলেন, ‘আমাদের কলেজের নামের সঙ্গে চেতনা জড়িয়ে আছে। কলেজ আমাদের স্বপ্ন দেখায়। সেই স্বপ্নই আমরা পুরো দেশে ছড়িয়ে দিতে চাই।’ প্রাণিবিজ্ঞান তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী আজরা নওশীন বলেন, ‘এখানকার তরুণদের স্বপ্নপূরণের প্রতিষ্ঠান এ কলেজ।’ রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অদৃতা দত্ত, নূরে আলম, আমান উল্লাহ, ফাহাদ ইয়াজদানি কথায়ও একই সুর, ‘এখানে দেশের গুণীজনেরা পড়াশোনা করেছেন। তাঁদের মতো উঁচু স্তরে যেতে চাই আমরা।’
কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজ বিতর্ক পরিষদ, সাংস্কৃতিক সংগঠন নোঙর, নাট্য সংগঠন ভিক্টোরিয়া কলেজ থিয়েটার, রক্তদাতাদের সংগঠন বাঁধন ও রেড ক্রিসেন্ট, বিএনসিসি, রোভার স্কাউট ক্যাম্পাসে কাজ করে যাচ্ছে। ক্যাম্পাস সাহিত্য পত্রিকা নামের একটি প্রকাশনাও বের হচ্ছে নিয়মিত। এই কলেজে ৫০০ আসনবিশিষ্ট একটি মিলনায়তন রয়েছে। মিলনায়তনটি বছরের বিভিন্ন সময়ে সংস্কৃতিকর্মীরা নানা আয়োজনে মাতিয়ে রাখেন। কলেজের নিজস্ব ওয়েবসাইট: www.cvgc.edu.bd
আমাদের শিক্ষার্থী ছড়িয়ে আছে সারা বিশ্বে

মো. আবদুর রশীদ
অধ্যক্ষ, কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজ
এই কলেজের শিক্ষার্থীরা সারা বিশ্বেই ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। উচ্চমাধ্যমিকের পাশাপাশি জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে এ কলেজের শিক্ষার্থীরা ভালো ফল করছে। প্রতিবছর হাজার হাজার মেধাবী শিক্ষার্থী ভর্তি হয়। আমরা এদের তৈরি করে দিই। এখান থেকে বের হওয়ার পর ওরা উচ্চশিক্ষার জন্য বেরিয়ে পড়ে। বিদেশের নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছেন কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজ থেকে পাস করা কিছু মেধাবী শিক্ষার্থী। দেশের কীর্তিমান বহু গুণী ব্যক্তিত্ব এই কলেজের ছাত্র ছিলেন। তাঁদের দৃষ্টান্ত নতুন প্রজন্মের শিক্ষার্থীরা অনুকরণ করে। পড়াশোনার বাইরে বিতর্ক, খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক কর্মযজ্ঞে আমাদের সুনাম আছে।