>দেশের কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে কৃষি গবেষণার স্বপ্ন নিয়ে পড়ালেখা করছেন অনেক শিক্ষার্থী। এমন তিনজনের গল্প শোনাচ্ছেন তানজিনা আকতারী
default-image

আশিকা আক্তার, সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়
উদ্ভাবনের আনন্দ আছ

ছেলেবেলা থেকেই আশিকা আক্তারের একটু তাড়াতাড়ি ঘুমানোর অভ্যাস। সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের হলে থাকার সময় একবার জন্মদিনে রাত ১২টায় সব বান্ধবী আসেন কেক নিয়ে৷ তাঁরা ভাবতেই পারেননি, যাঁর জন্মদিন সে ততক্ষণে ঘুমে বিভোর। আশিকাকে জন্মদিনে চমকে দিতে এসে উল্টো নিজেরাই চমকে গিয়েছিলেন সহপাঠীরা।

হবিগঞ্জ জেলার শায়েস্তাগঞ্জ বালিকা উচ্চবিদ্যালয় থেকে এসএসসি ও শায়েস্তাগঞ্জ ডিগ্রি কলেজ থেকে এইচএসসির উত্তীর্ণ মেয়েটির জন্ম চাঁদপুরে হলেও বাবার চাকরিসূত্রে ছোটবেলা থেকে বেড়ে উঠেছেন সিলেটে।

ভবিষ্যতে আশিকা একজন কৃষি গবেষক হওয়ার স্বপ্ন দেখেন৷ তাঁর মতে, ‘একটা কিছু উদ্ভাবনের আনন্দ পেতে চাই৷ বাংলাদেশ কৃষিপ্রধান দেশ। তাই অধিক ফলনশীল বা পোকামাকড় ও রোগবালাই প্রতিরোধী কোনো ফসলের জাত যদি উদ্ভাবন করতে পারি, তাহলে দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিই হয়তো একধাপ এগোবে। ফসলের উৎপাদন খরচ কমবে।’ সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়া শেষ করে উচ্চতর শিক্ষার জন্য ভিনদেশে যাওয়ারও ইচ্ছে আছে তাঁর।

স্নাতকের প্রথম বর্ষেই যখন শিক্ষকদের কাছ থেকে কৃষির বিস্তর কর্মক্ষেত্রের কথা শুনেছেন, তখনই একটু একটু করে স্বপ্ন দেখা শুরু৷ এখন কোনো গবেষণাপত্র বা জার্নালে ফসলের নতুন কোনো জাত বা নতুন কৌশল সম্পর্কে পড়লে আরও উদ্বুদ্ধ হন আশিকা। তিনি বলেন, ‘সবকিছুর আগে খাদ্য, আর সেই সঙ্গে খাদ্যনিরাপত্তা। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়েও এখন নতুন অনেক গবেষণার কাজ চলছে৷ বিদেশেও কৃষিবিজ্ঞান, খাদ্যবিজ্ঞানের ওপর গবেষণার অনেক সুযোগ রয়েছে। তাই অন্য পেশা নয়, গবেষণাই টানছে আমাকে। সেই লক্ষ্যে নিজেকে প্রস্তুত করছি।’ আশিকা জানালেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মো. আব্দুল মালেকের তত্ত্বাবধানে ঢ্যাঁড়সের নতুন জাত উদ্ভাবনে বর্তমানে কাজ করছেন তিনি। এ ছাড়া চায়ের জার্মপ্লাজম নিয়ে কাজ করার অভিজ্ঞতাও তাঁর হয়েছে।

পড়াশোনার বাইরে ছেলেবেলা থেকে গান, অভিনয়, বিতর্কের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। স্কুল-কলেজে বিভিন্ন পুরস্কার অর্জনের পাশাপাশি সৃজনশীল মেধা অন্বেষণ ২০১৩ তে জেলা পর্যায়ে প্রথম হয়েছিলেন। রোভার স্কাউটিংয়ে অংশ নিয়ে বিভিন্ন জায়গায় ক্যাম্পিংয়ে গিয়েছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্ত–অনুষদ বিতর্ক প্রতিযোগিতায় রানার্সআপের পুরস্কারও আছে আশিকার ঝুড়িতে। বললেন, জীবনের সব অর্জনের জন্য তিনি সেই প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত পাওয়া শিক্ষকদের কাছে ঋণী।

default-image

মো. কাওসার আলম, শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়
দেশের মানুষ যেন কম খরচে পুষ্টি পায়

ঢাকার শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি অনুষদের প্রাণরসায়ন বিভাগের স্নাতকোত্তর দ্বিতীয় সেমিস্টারের ছাত্র মো. কাওসার আলম। আপাতত চাকরির পাশাপাশি স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করতে চান। তারপর উচ্চশিক্ষার জন্য দেশের বাইরে যাওয়ার প্রবল আগ্রহ এই তরুণের। পড়া শেষে আবার ফিরবেন দেশে, চালিয়ে যাবেন গবেষণার কাজ।

কাওসার বলেন, ‘আমি চেষ্টা করব এমন কিছু ফসলের জাত উদ্ভাবন করতে, যেন অল্প খাবারেই সর্বোচ্চ পুষ্টি পায় দেশের মানুষ। কম খরচে ও অল্প জায়গায় যেন বেশি ফসল উৎপাদন করা যায়। এমন কিছু ফসলের জাত উদ্ভাবন করতে চাই, যেন সেগুলো প্রাকৃতিক দুর্যোগেও টিকে থাকতে পারে এবং চাহিদা অনুযায়ী উৎপাদন দিতে পারে। স্নাতক সম্পন্ন করার পর অধিকাংশ বন্ধু যখন বিসিএসের প্রস্তুতি নিচ্ছে, আমি তখন কৃষি গবেষণা প্রতিষ্ঠানে চাকরির জন্য তৈরি হচ্ছি। বাংলাদেশ পরমাণু কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটে আমার জীবনের প্রথম চাকরির পরীক্ষা ছিল। প্রথম পরীক্ষাতেই সবার দোয়ায় চাকরি পেয়েছি। বাংলাদেশ পরমাণু কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটে (ময়মনসিংহ) আমি বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা পদে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছি।’

কাওসার জানালেন, সবকিছু ঠিক থাকলে, ২০২০ সালের জানুয়ারি থেকে চাকরিতে যোগ দেবেন তিনি। বলছিলেন, ‘আমাদের দেশের উন্নত ফসলের জাত উদ্ভাবন থেকে শুরু করে দেশের কৃষি নিয়ে গবেষণার কাজগুলো মূলত বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তারাই করেন। গবেষণার জন্য অর্থ প্রণোদনা থেকে শুরু করে সরকার সার্বিক সহযোগিতা করে থাকে। সুতরাং কৃষি গবেষক হতে হলে বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা পদে চাকরির চেয়ে ভালো সুযোগ অন্য কোথাও পাওয়া যাবে না। আমি বর্তমানে ঔষধি মাশরুমের জাত “শিতাকে” নিয়ে গবেষণা করছি।’

স্নাতকে ভর্তির পর থেকেই বিশ্ববিদ্যালয়ে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড ও খেলাধুলার সঙ্গে জড়িত ছিলেন কাওসার। ২০১৬ সালে সেরা উপস্থাপক পুরস্কার, ফটোগ্রাফিক সোসাইটি কর্তৃক আয়োজিত প্রতিযোগিতায় প্রথম পুরস্কার ছিল তাঁর দখলে। ২০১৭ সালে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় আয়োজিত কৃষি যান্ত্রিকীকরণ আইডিয়াবিষয়ক দেশব্যাপী একটি প্রতিযোগিতায় জয়ী হয় তাঁর দল। ২০১৮ সালে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) আয়োজিত একটি গবেষণাবিষয়ক আন্তবিশ্ববিদ্যালয় প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের যে দলটি তৃতীয় হয়েছিল, সে দলেরও দলনেতা ছিলেন কাওসার আলম।

default-image

শাহনাজ আক্তার, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ময়মনসিংহ
কৃষকদের জন্য কিছু করতে চাই

শাহনাজ আক্তার স্নাতকোত্তর করছেন বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি অনুষদের কৌলিতত্ত্ব ও উদ্ভিদ প্রজনন বিভাগে। সুযোগ পেলেই বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দেওয়া ও সাইকেল চালিয়ে ক্যাম্পাসে ঘুরে বেড়ানো মেয়েটি ভবিষ্যতে বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা হতে চান। বলছিলেন, ‘যেহেতু আমি একজন কৃষিবিদ, আমার প্রথম দায়িত্ব হলো দেশের কৃষি খাতের আরও উন্নতি করা। কৌলিতত্ত্ব ও উদ্ভিদ প্রজনন বিভাগের ছাত্রী হিসেবে উদ্ভিদ প্রজননে নিজের দক্ষতা বাড়িয়ে অন্তত একটি সময় ও চাহিদা উপযোগী ভালো ফসলের জাত আবিষ্কার করতে চাই।’

স্নাতকোত্তরের থিসিসের জন্য এখন একটি গবেষণা করছেন শাহনাজ। জানালেন, তাঁর গবেষণার বিষয় হলো, গমের প্রজননক্ষম ধাপে লবণের সহনশীলতার প্রটোকল উন্নয়ন করা। ভবিষ্যতে শাহনাজ যুক্তরাষ্ট্রের একটি ভালো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উচ্চশিক্ষা নিতে চান, যেন কৃষি সম্পর্কে তাঁর জ্ঞান ও দক্ষতা বাড়িয়ে দেশে ফিরে একটা কিছু করতে পারেন। শাহনাজ বলছিলেন, ‘আমি একটা সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছি। যাঁদের টাকায় আমরা এত ভালো বিশ্ববিদ্যালয় পেয়েছি, তাঁদের মধ্যে ৮০ শতাংশ কৃষক, আর এই কৃষকদের মধ্যে আমার বাবাও একজন। তাই আমি দেশের কৃষকদের জন্য কিছু করতে চাই। কোনো একটা ভালো ফসলের জাতের পাশে আমার নাম লেখাতে চাই।’

টাঙ্গাইল জেলার মিরিকপুর গঙ্গাচরণ তপশিলী উচ্চবিদ্যালয়, বাসাইল ও বাসাইল এমদাদ হামিদা ডিগ্রি কলেজ তাঁর সাবেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। যে শিক্ষকের সাহায্য ও অনুপ্রেরণায় এত দূর এসেছেন, তাঁরা হলেন জগদীশ চন্দ্র কর্মকার এবং নাজমা খানম। শাহনাজ চার বছর ধরে যুক্ত আছেন স্বেচ্ছায় রক্তদানের সংগঠন বাঁধনের সঙ্গে। স্নাতকে ৩.৮৮ সিজিপিএ ধরে রেখে নিজের মেধার প্রমাণ দিয়েছেন তিনি।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0