পরিচালনা কমিটির ভূমিকা

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জন্য তহবিল সংগ্রহ, শিক্ষক নিয়োগ, বরখাস্ত, বাতিল বা অপসারণ, নৈমিত্তিক ছুটি মঞ্জুর করা ইত্যাদি পরিচালনার কাজ কমিটির হাতে। উন্নয়ন প্রকল্পের সঙ্গে সম্পর্কিত বাজেটসহ বার্ষিক বাজেট অনুমোদন, সম্পদ রক্ষণাবেক্ষণ, সংরক্ষিত ও সাধারণ তহবিল, অন্যান্য তহবিল, শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন বিলে সই করাসহ মোটামুটি বিদ্যালয়ের অধিকাংশ কাজই হয় পরিচালনা কমিটির মাধ্যমে।

অভিযোগ আছে, অধিকাংশ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেই শিক্ষার মানোন্নয়নের চেয়ে নিয়োগ, প্রতিষ্ঠানের অবকাঠামোগত উন্নয়নসহ যেসব কাজে আর্থিকভাবে লাভ হওয়ার সুযোগ আছে, সেগুলো নিয়েই বেশি আগ্রহী পরিচালনা কমিটিগুলো। এত দিন সহকারী শিক্ষক নিয়োগ দিতে পারত পরিচালনা কমিটি। তবে এখন তা করা হয় বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষের (এনটিআরসিএ) মাধ্যমে। তবে স্কুল-কলেজের অধ্যক্ষ, প্রধান শিক্ষক ও সহকারী প্রধান শিক্ষক নিয়োগ এখনো পরিচালনা কমিটির হাতে। এসব পদে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ঘুষ দিয়ে নিয়োগ পেতে হয় বলে দুর্নীতিবিরোধী প্রতিষ্ঠান ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) এক গবেষণা প্রতিবেদনে দাবি করা হয়। গত বছরের সেপ্টেম্বরে প্রকাশিত ওই প্রতিবেদনে বলা

হয়েছে, এসব নিয়োগে সাড়ে ৩ লাখ থেকে ১৫ লাখ টাকা দিতে হয় নিয়মবহির্ভূতভাবে। এই টাকা দিতে হয় স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা ও পরিচালনা কমিটিকে।

অন্য দেশের পরিচালনা কমিটি কেমন হয়

ঢাকা মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের সাবেক চেয়ারম্যান মু. জিয়াউল হকের নেতৃত্বে ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের পাঁচ কর্মকর্তা বাংলাদেশের সঙ্গে জাপান, ফিনল্যান্ড ও ভিয়েতনামের বিদ্যালয় পরিচালনা সম্পর্কে একটি তুলনামূলক গবেষণা করেন। এতে দেখা গেছে, জাপান, ফিনল্যান্ড ও ভিয়েতনামের চেয়ে বাংলাদেশের বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সদস্য নির্ধারণ এবং শিক্ষকদের নিয়োগপদ্ধতি, বেতন ও মর্যাদা কম। জাপান ও ফিনল্যান্ডে শিক্ষার উদ্দেশ্য যথাযথ বাস্তবায়নের জন্য যোগ্যতাসম্পন্ন সদস্য নিয়োগের ওপর জোর দেওয়া হয়।

বাংলাদেশ ও জাপানে বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সদস্যসংখ্যা প্রায় একই হলেও সদস্য নিয়োগের প্রক্রিয়া আলাদা। আবার বাংলাদেশ ও ভিয়েতনামে যোগ্যতাসম্পন্ন সদস্য নিয়োগের ক্ষেত্রে বিভিন্ন পর্যায় থেকে প্রভাব থাকে। এ জন্য ফিনল্যান্ড ও জাপানের মতো এ দেশেও বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সদস্য বাছাই করার

ব্যবস্থা করার সুপারিশ করা হয়। পরিচালনা কমিটি উন্নত করার পাশাপাশি কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষায় জোর দেওয়ার সুপারিশ করা হয় ওই প্রতিবেদনে।

এ অবস্থায় পরিচালনা কমিটির সভাপতির শিক্ষাগত যোগ্যতা কমপক্ষে স্নাতক করাসহ

কমিটির কার্যক্রমে শিক্ষকসহ শিক্ষাসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের পক্ষ থেকে সংস্কারের দাবি উঠলেও কার্যকর পদক্ষেপ নেই।

সম্প্রতি রাজধানীর উইলস লিটল ফ্লাওয়ার স্কুল অ্যান্ড কলেজের এক শিক্ষক প্রথম আলোকে বলেন, তাদের প্রতিষ্ঠানে পরিচালনা কমিটির সদ্য সাবেক সভাপতি আওয়ামী স্বেচ্ছাসেবক লীগের এক নেতা। তিনি প্রতিষ্ঠানে এলে সবাই ভয়ে থাকতেন।

কীভাবে, কারা আসেন কমিটিতে

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের তথ্য বলছে, দেশে বর্তমানে মাধ্যমিক ও কলেজ পর্যায়ে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আছে ৩৫ হাজারের বেশি। এর মধ্যে নতুন ২ হাজার ৭১৬টিসহ মোট এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ২৯ হাজার ১৬৪টি।

বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিচালিত হয় গভর্নিং বডি ও ম্যানেজিং কমিটি প্রবিধিমালা অনুযায়ী। কলেজ পর্যায়ের পরিচালনা কমিটিকে বলা হয় গভর্নিং বডি এবং মাধ্যমিক বিদ্যালয় পর্যায়ের কমিটিকে বলা হয় ম্যানেজিং কমিটি। ২০০৯ সালের আগের প্রবিধানমালায় সংসদ সদস্যদের উচ্চমাধ্যমিক পর্যন্ত বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোয় সভাপতি হওয়ার কোনো সীমা ছিল না। কিন্তু ২০০৯ সালের প্রবিধানমালা অনুযায়ী একজন সংসদ সদস্য তাঁর নির্বাচনী এলাকার সর্বোচ্চ চারটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সভাপতি হতে পারতেন। কিন্তু নানা ধরনের অনিয়মের অভিযোগ ওঠার পর ২০১৬ সালে ওই প্রবিধানমালার কিছু অংশ অবৈধ ঘোষণা করেন উচ্চ আদালত। ফলে সংসদ সদস্যরা নিজ নির্বাচনী এলাকায় চাইলেও সভাপতি হতে পারেন না। ২০২০ সালে উচ্চ আদালতের আরেক রায়ে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত কলেজগুলোর পরিচালনা পর্ষদেও সংসদ সদস্যরা সভাপতি হতে পারছেন না।

অবশ্য পরোক্ষভাবে এখনো তাঁদের নিয়ন্ত্রণে থাকছে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। যেমন যশোর-৪ আসনের (অভয়নগর, বাঘারপাড়া ও সদরের একাংশ) সংসদ সদস্য রণজিৎ কুমার রায়ের স্ত্রী ও সন্তানেরা একাধিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিচালনা কমিটির সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

খুলনার অবসরপ্রাপ্ত কলেজশিক্ষক ও বাংলাদেশ অধ্যক্ষ পরিষদের সভাপতি মোহাম্মদ মাজহারুল হান্নান প্রথম আলোকে বলেন, একসময় বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো বেতন–ভাতাবাবদ সরকার থেকে কোনো আর্থিক সহায়তা পেত না। তখন গণমান্য ব্যক্তিদের দিয়ে পরিচালনা কমিটি করে আর্থিক সহায়তার ব্যবস্থা করা হতো। তখন পরিচালনা কমিটির লোকেরাও আক্ষরিক অর্থেই প্রতিষ্ঠানের কল্যাণে কাজ করতেন। এখন এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক–কর্মচারীরা মূল বেতনের শতভাগ সরকার থেকে পান। ভাতা কম হলেও কিছুটা পান। তাই বর্তমান অবস্থায় পরিচালনা কমিটির দরকার নেই বলে মনে করেন তিনি। মাজহারুল হান্নান বলেন, দুষ্ট লোকেরা কমিটিতে ঢুকে প্রতিষ্ঠানের কল্যাণের পরিবর্তে অকল্যাণই বেশি করছেন।

‘কমিটির অত্যাচার-নির্যাতন থেকে বাঁচতে চান’

মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের পরিচালনা কমিটি হয় ১১ থেকে ১৪ সদস্যের। এর মধ্যে একজন চেয়ারম্যান বা সভাপতি থাকেন। এ ছাড়া শিক্ষকদের মধ্যে দুজন নির্বাচিত সদস্য ও একজন সংরক্ষিত নারী সদস্য (শিক্ষক), শিক্ষার্থীদের অভিভাবকদের মধ্য থেকে চারজন নির্বাচিত সদস্য ও একজন নারী সদস্য, একজন নির্বাচিত প্রতিষ্ঠাতা সদস্য, একজন দাতা সদস্য এবং প্রতিষ্ঠানপ্রধান সদস্যসচিব হিসেবে থাকেন। উচ্চমাধ্যমিক স্তরের কমিটিও প্রায় কাছাকাছি ধরনের।

পরিচালনা কমিটির নির্বাচন হওয়ার সাত দিনের মধ্যে সভাপতি নির্বাচনের জন্য সভা আহ্বান করা হয়। এই সভায় উপস্থিত সদস্যদের সংখ্যাগরিষ্ঠের সমর্থনে কমিটির সদস্যদের মধ্য থেকে অথবা স্থানীয় শিক্ষানুরাগী ব্যক্তি, খ্যাতিমান সমাজসেবক, জনপ্রতিনিধি বা অবসরপ্রাপ্ত প্রথম শ্রেণির সরকারি কর্মকর্তাদের মধ্য থেকে পরিচালনা কমিটির সভাপতি নির্বাচন করা হয়। তবে কোনো ব্যক্তি দুটির বেশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পরিচালনা কমিটির সভাপতি নির্বাচিত হতে পারেন না।

তবে বাস্তবতা হলো, সারা দেশের অধিকাংশ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেই শিক্ষানুরাগীর পরিবর্তে রাজনৈতিক সংযোগধারী ব্যক্তিরাই পরিচালনা কমিটিতে আসছেন। কোনো শিক্ষককে পছন্দ না হলে তুচ্ছ কারণ দেখিয়ে সাময়িক বরখাস্তের অভিযোগ রয়েছে। বিশেষ করে এক পরিচালনা কমিটি থেকে আরেক কমিটির দায়িত্ব গ্রহণ এবং সরকার পরিবর্তনের সময় এটি বেশি হয়।

সম্প্রতি পরিচালনা কমিটির মাধ্যমে সাময়িক বরখাস্ত হন শিক্ষকনেতা নজরুল ইসলাম। তিনি রাজধানীর মিরপুরের একটি বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ছিলেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে দেওয়া এক পোস্টে তিনি লেখেন, ‘পরিচালনা কমিটির অত্যাচার ও নির্যাতনের কারণে অনেক এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মচারীগণ মুখ খুলতে ভয় পান। অনেক শিক্ষক এই অবস্থা চান না। তাঁরা ম্যানেজিং কমিটির অত্যাচার-নির্যাতন থেকে বাঁচতে চান।’

সভাপতির শিক্ষাগত যোগ্যতা ঝুলে আছে

২০১৯ সালের নভেম্বরে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ব্যবস্থাপনা কমিটির নতুন নীতিমালা জারি করে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়। তাতে বলা হয়, এখন থেকে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি হওয়ার জন্য ন্যূনতম শিক্ষাগত যোগ্যতা স্নাতক ডিগ্রি হতে হবে। নতুন নীতিমালার ফলে এ বিষয়ে আগের সব প্রজ্ঞাপন ও আদেশ বাতিল হয়ে হয়ে গেছে।

এর আগে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ব্যবস্থাপনা কমিটিতে সভাপতি হওয়ার জন্য শিক্ষাগত যোগ্যতার কোনো শর্ত ছিল না। ব্যবস্থাপনা কমিটির সদস্যসংখ্যা সভাপতিসহ ১১। বিভিন্ন পর্যায়ের প্রতিনিধিদের মাধ্যমে তাঁরা নির্বাচিত হবেন। তাঁদের ভেতর বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ও শিক্ষক প্রতিনিধি বাদে অন্য সদস্যদের মধ্য থেকে একজন সভাপতি ও একজন সহসভাপতি নির্বাচিত হবেন। তবে শর্ত হলো, সভাপতিকে ন্যূনতম স্নাতক ডিগ্রিধারী হতে হবে। পদাধিকার বলে প্রধান শিক্ষক বা ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক কমিটির সদস্যসচিবের দায়িত্ব পালন করবেন। একই ব্যক্তি পরপর দুইবারের বেশি একই বিদ্যালয়ের সভাপতি নির্বাচিত হতে পারবেন না। তবে, প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ক্ষেত্রে এই সিদ্ধান্ত হলেও বেসরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও কলেজ বা সমমানের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বিষয়ে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি।

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, তিনি ব্যক্তিগতভাবে চান, পরিচালনা কমিটির সভাপতি ও সদস্যদের শিক্ষাগত যোগ্যতা ন্যূনতম স্নাতক পাস হোক। কিন্তু নানা বাধার কারণে সেটি করা সম্ভব হচ্ছে না।

নিয়মতান্ত্রিক কাঠামোর মধ্যে পরিচালিত হতে হবে

অনেক বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রধান শিক্ষক ও অধ্যক্ষের বিরুদ্ধেও আর্থিক অনিয়মসহ নানা ধরনের অনিয়মের অভিযোগ আছে। তাই ভারসাম্য রক্ষার জন্য এবং শিক্ষার সঙ্গে স্থানীয় লোকদের সম্পৃক্ত রাখার জন্য পরিচালনা কমিটি বা কোনো তদারকের ব্যবস্থা থাকা দরকার বলে শিক্ষাসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করেন।

সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা রাশেদা কে চৌধূরী প্রথম আলোকে বলেন, পরিচালনা কমিটিতে যাঁরা আসেন, তাঁদের অর্থবিত্ত ও রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে অনেক সময় অধ্যক্ষ–শিক্ষক ও শিক্ষা প্রশাসন অসহায় থাকে। তাই একটাই পরামর্শ, যেকোনো ধরনের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান দেশের মাটিতে প্রতিষ্ঠিত হোক না কেন, সেগুলো অবশ্যই নিয়মতান্ত্রিক কাঠামোর মধ্যে পরিচালিত হতে হবে। কীভাবে পরিচালিত হচ্ছে, তা দেখা সরকারের দায়িত্ব। এ জন্য তদারকের ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে।

[প্রতিবেদনে তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করেছেন প্রতিনিধি, লোহাগড়া, নড়াইল]

শিক্ষা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন