default-image

বঙ্গবাণী

রফিকের ছেলেমেয়েরা ইংরেজি স্কুলে পড়ছে। রফিক বিদেশি গান-বাজনা বেশি পছন্দ করেন। কথাও বলেন ইংরেজিতে। অন্যেরা তাঁর সঙ্গে ইংরেজিতে তাল মেলাতে না পারলে তিনি অবজ্ঞা করে বলেন, ‘তোরা তো এখনো বাঙালই রয়ে গেলি।’ রফিকের মা প্রায়ই ছেলেকে বলেন, ‘তোর সাথে কথা বলে সুখ নাই।’

প্রশ্ন

ক. ‘বঙ্গবাণী’ কবিতাটি কোন কাব্যগ্রন্থ থেকে নেওয়া হয়েছে?

খ. ‘হিন্দুর অক্ষর’ বলতে কী বোঝানো হয়েছে?

গ. ‘তোরা তো এখনো বাঙালই রয়ে গেলি’—উক্তিটির মাধ্যমে রফিকের যে মানসিকতার পরিচয় পাওয়া যায়, সে সম্পর্কে কবির অভিমত ব্যাখ্যা করো।

ঘ. ‘তোর সাথে কথা বলে সুখ নাই’—রফিকের মায়ের এ উক্তি কবির মানসিকতাকেই সমর্থন করে—‘বঙ্গবাণী’ কবিতার আলোকে বিশ্লেষণ করো।

উত্তর

ক. ‘বঙ্গবাণী’ কবিতাটি নূরনামা কাব্যগ্রন্থ থেকে নেওয়া হয়েছে।

খ. ‘বঙ্গবাণী’ কবিতায় ‘হিন্দুর অক্ষর’ বলতে বাংলা ভাষাকে বোঝানো হয়েছে।

তৎকালীন এ দেশের রাষ্ট্রভাষা ছিল ফারসি। ধর্মীয় কুসংস্কারাচ্ছন্ন কিছু রক্ষণশীল গোঁড়া ব্যক্তিবর্গ তাদের মাতৃভাষা বাংলাকে বাদ দিয়ে আরবি-ফারসির প্রতি গভীর অনুরাগ দেখাতে থাকে। কূপমণ্ডূকতার কারণে তারা মনে করত, কোরআন-হাদিসের ভাষা যেহেতু আরবি, কাজেই আরবি-ফারসি ভাষা ছাড়া আল্লাহ-রাসুলের সান্নিধ্য লাভ সম্ভব নয়। তা ছাড়া এ দেশের প্রাচীন অধিবাসী ছিল হিন্দু এবং তাদের ভাষা ছিল বাংলা। বাংলা বর্ণমালাগুলো এসেছে ব্রাহ্মীলিপি থেকে, যা হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকদের তৈরি করা। তাই মুসলমান হয়ে এ ভাষাকে ভালোবাসা সম্ভব নয়। এ কারণে তারা বাংলা ভাষাকে অবজ্ঞা করে হিন্দুর অক্ষর বলত।

বিজ্ঞাপন

গ. ‘তোরা এখনো বাঙালই রয়ে গেলি’—এ উক্তির মাধ্যমে রফিকের স্বদেশ ও স্বভাষার প্রতি অবজ্ঞা প্রকাশ পেয়েছে।

‘বঙ্গবাণী’ কবিতায় কবি আবদুল হাকিম মাতৃভাষা অবজ্ঞাকারীদের প্রতি চরম ক্ষোভ ও ধিক্কার প্রদর্শন করেছেন। কবির মতে, যারা এ দেশে জন্মগ্রহণ করে, এ দেশের আলো-বাতাসে বড় হয়ে ভিনদেশি ভাষা ও সংস্কৃতির প্রতি অনুরক্ত এবং মায়ের মুখের ভাষার প্রতি উন্নাসিকতা দেখায়, তারা শেকড়হীন, পরগাছা। কবি মাতৃভাষার প্রতি অনুরাগহীন সেসব পরগাছাকে দেশ ছেড়ে বিদেশে চলে যেতে বলেছেন। আর মাতৃভাষাকে যারা অবজ্ঞা করে বা ঘৃণার চোখে দেখে, কবি তাদের জন্মপরিচয় সম্পর্কে সন্দেহ পোষণ করেছেন। কবির ভাষায়,

‘যে সব বঙ্গেত জন্মি হিংসে বঙ্গবাণী

সেসব কাহার জন্ম নির্ণয় ন জানি।’

আলোচ্য উদ্দীপকে আমরা দেখতে পাই, রফিক এ দেশের সন্তান হয়েও বিদেশি ভাষা ও সংস্কৃতির প্রতি মোহাচ্ছন্ন।

কথা বলা, গান শোনা থেকে শুরু করে সব আচার-আচরণেও তাঁর ভিনদেশি আবহ। শুধু তা-ই নয়, নিজের সন্তানদেরও তিনি মাতৃভাষার চেয়ে বিদেশি ভাষার প্রতি বেশি অনুরাগী করে তুলছেন। ইংরেজির প্রতি তাঁর গভীর মমত্ববোধ।

তাঁর সঙ্গে ইংরেজিতে তাল মেলাতে না পারলেই তিনি অবজ্ঞার সুরে বলেন, ‘তোরা এখনো বাঙালই রয়ে গেলি।’

তাঁর সামগ্রিক আচরণে স্বদেশ, স্বভাষা এবং স্বজাতির প্রতি বীতশ্রদ্ধ মনোভাব প্রকাশ পেয়েছে। আর এ মানসিকতার ধারক ও বাহকদের কবি চরম ধিক্কার দিয়েছেন।


মো. হুমায়ূন কবীর, প্রভাষক
সেন্ট যোসেফ উচ্চমাধ্যমিক বিদ্যালয়, ঢাকা

শিক্ষা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন