বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

আমাদের প্রথম থেকেই জানার পরিধির সীমানা নির্দিষ্ট করে দেওয়া হয়, যা বাস্তব জীবনে প্রয়োগিক ক্ষেত্রে খুবই ঝামেলায় ফেলে। ব্যবসা করতে জাবেদা–রেওয়ামিল জানতে হবে, তা তো আমি জানি না! আবার ল্যাবে চাকরি করতে হলে সায়েন্স জানতে হবে, তা–ও তো নেই। তাহলে উপায় কী? আর্টস বললে অনেকেই ভাবে গাধা শিক্ষার্থীরা কোথাও চান্স না পেয়ে লক্করঝক্কর মার্কা আর্টসে ভর্তি হয় অন্য কোনো উপায় না থাকায়। তাহলে প্রথম থেকে যেখানে এত শিক্ষাসম্পর্কিত ভেজাল, সেখানে শিক্ষক হয়ে ওঠার সুযোগ কোথায়? তা ছাড়া এ দেশের প্রেক্ষাপটে চাকরির বাজার খুবই নাজুক। যে যেদিকে সুযোগ পাচ্ছে, জীবন–জীবিকার তাগিদ, বয়সের কারণে ঢুকে পড়ছেন। কী করবে মানুষ? এত বড় সংসারজীবন চালাবে কে? বাধ্য হয়েই চাকরি যেটা কপালে জোটে, সেটাই নিজের ডেসটিনেশন হিসেবে নিয়ে আমরা লেগে থাকি। আর সরকারি চাকরি তো সোনার হরিণ। মাত্র কয়েক শ সিটের জন্য আবেদনকারী হাজার হাজার। চাকরি কোথায় আছে এমন বিষয়ভিত্তিক? এ দেশে আদৌ কি সেই পরিবেশ সৃষ্টি করতে আমরা পেরেছি?

যা হোক, শিক্ষকতা পেশায় যখন এসেই পড়েছি, বলতে বাধা নেই, প্রথম প্রথম মন খারাপই থাকত। কী পড়াব ছোট ছোট শিশুদের! মাথায় আসত না। মাঝেমধ্যে কাঁদতাম। একসময় শিশুদের সঙ্গে মিশতে মিশতে কখন যে ভালো লাগা, ভালোবাসা তৈরি হয়ে গেছে, নিজেও জানি না। একদম অবুঝ নিষ্পাপ শিশুদের গড়ার প্রথম শিক্ষক আমি নির্বাচিত! পরম করুণাময়ের কাছে মাথা লুটিয়ে পড়ি! এখন আমি প্রাইমারি শিক্ষক হয়ে গর্ব বোধ করি। কারণ, এত প্রশান্তির একটি পবিত্র স্থান কর্মস্থল হিসেবে পৃথিবীতে দ্বিতীয়টি নেই। যদি নীতিবোধ কিছুটা কিঞ্চিৎ পরিমাণ আজও থেকে থাকে, তাহলে একমাত্র তা শিক্ষকদের মধ্যেই পরিলক্ষিত হয়। তাঁরা বিনা স্বার্থে নিজ সন্তানের মতো শিক্ষার্থীদের মানুষ করেন। হয়তো বলতে পারেন, সরকার তো বেতন দেয়। দেখুন একজন সিএনজিচালিত অটোরিকশাচালকও প্রতিদিন একজন শিক্ষকের চেয়ে ভালো আয় করেন। যাঁরা ব্যবসা করেন, তাঁদের কথা বাদই দিলাম। তবুও মুখ উঁচিয়ে শিক্ষকদের বেতন–ভাতাগুলোই কোটি টাকার সমান ভাবে কিছু মানুষ। ভেতরে গিয়ে দেখুন, তাঁদের আর দশজনের মতো অভাবের ছিদ্র হাজারো। কিন্তু শালীন, পরিষ্কার–সাদামাটা পোশাকের ভেতর সব ধামাচাপা থাকে আমৃত্যু।

একটি পেশায় যখন মানুষ চলে আসেন, তখন তাঁরা চান, মনেপ্রাণে সেই পেশায় উন্নতি করতে। কারণ, অন্য কোনো সুযোগ নেই। পাবলিকলি এমন কোনো কথা আমাদের বর্জন করা উচিত, যেখানে শিক্ষক বা যেকোনো পেশার লোকের হৃদয়ে আঘাত যেন না আসে। সারা বিশ্ব মিডিয়া এসব কথা শুনছে, দেখছে। এতে এ দেশের মান ক্ষুণ্ন হচ্ছে বৈকি।

বর্তমান সরকার যেভাবে শিক্ষা খাতকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে, শিক্ষকদের উপযুক্ত প্রশিক্ষণ প্রদান করছে, তাতে তাঁরা একজন যোগ্য শিক্ষক হয়ে উঠতে বাধ্য। শিক্ষাসহায়ক প্রশিক্ষণগুলো এমনই কার্যকর ও ফলপ্রসূ। ঘটনাচক্রে শিক্ষক হলেও জাতিকে আমরা কম দিচ্ছি, তা তো নয়? বরং পরতে পরতে আলো ছড়ানোর চেষ্টা করছি যেটুকু সামর্থ্য বিদ্যমান। কারণ, আমাদের ভেতর বিবেক জাগ্রত, আর মনটা দেশপ্রেমে ভরপুর। মাঠপর্যায়ে আমরাই সৈনিক, যাঁরা শিশুদের জ্ঞানের আলো দান করছি। মনের চক্ষু খুলে দিতে সর্বদা একজন অভিভাবকের ভূমিকা পালন করছি। আজ আমাদের সন্তানসম শিক্ষার্থীরা অনেকেই প্রতিষ্ঠিত। যোগ্য জায়গায় অভিষিক্ত। ঘটনাচক্রে শিক্ষক হলেও আমরা সফল শিক্ষক নই, তা বলার সুযোগ নেই। প্রত্যেক শিক্ষক ইনডেক্স সাফল্যগাথা সোনালি অক্ষরে লেখা আছে। কেউ তাঁর মূল্যায়ন করুক বা না করুক, ওপরওয়ালা একজন নিশ্চয়ই সব দেখছেন।

শিক্ষার নীতিমালা গোড়া থেকে ঠিক করা হোক। কে কী হবে, কোনো পথ তার জন্য উপযুক্ত, সেই বিষয়ে পড়াশোনা করে বিষয়ভিত্তিক চাকরির বাজার, পদ সৃষ্টি করা হোক। এটি হলে কেউ আর ইংরেজি সাহিত্য নিয়ে পড়ে ব্যাংকার হতে যাবে না। আর ঘটনা চক্রের ফাঁদে পড়ে জাতি তার শ্রেষ্ঠ সন্তানদের মেধাও হারাবে না। আমরা চাই, একটি মেধাসমৃদ্ধ সুষ্ঠু নান্দনিক জাতি। দেশ এগিয়ে যাবে আলোকিত পথের সারথিদের সঙ্গে নিয়ে সতত।
*লেখক: পারভীন আকতার: শিক্ষক, কবি ও প্রাবন্ধিক, চট্টগ্রাম

শিক্ষা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন