সৃজনশীল প্রশ্নোত্তর
প্রিয় শিক্ষার্থীরা, আজ সমাজবিজ্ঞানের অধ্যায়-৩ থেকে একটি সৃজনশীল প্রশ্নোত্তর দেওয়া হলো।

# উদ্দীপকটি পড়ে সংশ্লিষ্ট প্রশ্নগুলোর উত্তর দাও:
১৯৫২ সালে বাংলাদেশে ভাষা আন্দোলন হয়। ‘উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্র ভাষা’—পাকিস্তানিদের এমন ঘোষণার পর পূর্ব বাংলায় চরম ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্র ভাষার দাবিতে আন্দোলন শুরু করে। ভাষার ভিত্তিতে একটি মানসিক ঐক্য গড়ে ওঠে। ভাষার ভিত্তিতে বাঙালি জাতীয়তাবাদও গড়ে ওঠে, যা বাংলাদেশের স্বাধীনতাসংগ্রামকে ত্বরান্বিত করে। প্রতিটি সমাজই মূলত এই মানসিক ঐক্য বা বন্ধনের ভিত্তিতে টিকে থাকে।
প্রশ্ন:
ক. ইবনে খালদুনের বিখ্যাত গ্রন্থটির নাম লেখো।
খ. নৈরাজ্যমূলক আত্মহত্যা বলতে কী বোঝো?
গ. উদ্দীপকের বিষয়টি ইবনে খালদুনের কোন প্রত্যয় দ্বারা ব্যাখ্যা করা যায়?
ঘ. ওই প্রত্যয়ের আলোকে বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রের উৎপত্তি ব্যাখ্যা করো।

উত্তর-ক.
ইবনে খালদুনের বিখ্যাত গ্রন্থটির নাম হলো আল মুকাদ্দিমা ।
উত্তর-খ.
সমাজে যখন বিশৃঙ্খলা ও নৈরাজ্যকর অবস্থা বিরাজ করে, সামাজিক নিয়ন্ত্রণ দুর্বল হয়ে পড়ে তখন আতÄহত্যা বেড়ে যায়। এ ধরনের আতÄহত্যাকে ডুর্খেইম নৈরাজ্যমূলক আতÄহত্যা বলে অভিহিত করেন। বিশেষ করে সমাজে অর্থনৈতিক মন্দা, সংকট ও রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে এ ধরনের আতÄহত্যা বেড়ে যায়। যেমন ২০১০ সালে অর্থনৈতিক মন্দার সময় ইউরোপ-আমেরিকার অনেক লোক আতÄহত্যা করে। সমাজে রাহাজানি ও মূল্যবোধের অবক্ষয়ের কারণে এ ধরনের আতÄহত্যা বাড়ে।

মোহাম্মদ হেদায়েত উল্যাহ
উদ্দীপকে বিষয়টি ইবনে খালদুনের ‘আল আসাবিয়া’ প্রত্যয়টি দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায়।
সহজ অর্থে আল আসাবিয়া বা সামাজিক সংহতি বলতে মানসিক ঐক্যকে বোঝানো হয়, যার দ্বারা মানুষ পরস্পরের সঙ্গে সম্পৃক্ত। যে মানসিক চেতনা বা বন্ধনে মানুষ একে অন্যের সঙ্গে একাতÄবোধ করে, একে অন্যকে সাহায্য-সহযোগিতা করে, তা-ই সামাজিক সংহতি। সামাজিক সংহতি ছাড়া সমাজ গঠন হতে পারে না। সংহতির ওপর ভিত্তি করে মানুষের সামাজিক বন্ধন গড়ে ওঠে। ইবনে খালদুনের সমাজতাত্ত্বিক আলোচনার কেন্দ্রীয় বিষয়ই হল আল আসাবিয়া বা সামাজিক সংহতি। রক্ত, ধর্ম, ভাষা, জাতীয়তা প্রভৃতির মাধ্যমে এ সংহতি গড়ে ওঠে বলেও তিনি মত দেন। এই সংহতিকে তিনি গোষ্ঠী সংহতি (group solidarity) হিসেবেও আখ্যায়িত করেন। তাঁর মতে, সমাজের ভিত্তিই হচ্ছে এই গোষ্ঠী সংহতি।
উদ্দীপকে দেখা যাচ্ছে, ভাষার ভিত্তিতে বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে সামাজিক বন্ধন গড়ে উঠেছে। এ বন্ধনের ভিত্তিতেই বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জিত হয়েছে। মূলত, এর ভিত্তিতেই সমাজ টিকে আছে। এটি খালদুন বর্ণিত আল আসাবিয়া বা সামাজিক সংহতি প্রত্যয়েরই নামান্তর।
উত্তর-ঘ.
সামাজিক সংহতি গড়ে ওঠার ক্ষেত্রে রক্ত, ধর্ম, ভাষা, জাতীয়তা প্রভৃতি ভূমিকা রাখে বলে ইবনে খালদুন মত দেন। বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রের উদ্ভবের ক্ষেত্রে ভাষার ভিত্তিতে গড়ে ওঠা সংহতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। ধর্মীয় সংহতির ভিত্তিতে পাকিস্তান গড়ে ওঠে। পরবর্তী সময়ে ভাষার ভিত্তিতে গড়ে ওঠা জাতীয়তাবাদই বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রের উদ্ভবের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
বাংলা ভাষাকে কেন্দ্র করে এখানে বাঙালি জাতীয়তাবাদ গড়ে ওঠে। গড়ে উঠে বাঙালি সংস্কৃতি। ভাষার জন্য ১৯৫২ সালে এখানকার মানুষ সংগ্রাম করে। দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ পূর্ব পাকিস্তানিদের ভাষা বাংলা হলেও তার রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি ছিল না। তাই এর জন্য সংগ্রাম শুরু হয়। সেই সংগ্রামের পরিপ্রেক্ষিতে এ ধরনের সংহতি জোরালো হয়। অন্যদিকে, পাকিস্তানিদের ভাষা ছিল উর্দু। ভাষাগত মিল না থাকায় একই ধরনের জাতীয়তাবাদ গড়ে ওঠেনি পুরো পাকিস্তানে। পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানে ভিন্ন জাতীয়তাবাদ গড়ে ওঠে।
বাংলা ভাষাকে কেন্দ্র করে একধরনের জোরালো সংহতি গড়ে ওঠে, যা বাংলাদেশ সৃষ্টিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। সংহতির ভিত্তিতে গড়ে উঠে জাতীয়তাবাদ তারপর স্বাধীনতা আন্দোলন এবং স্বাধীন বাংলাদেশ। ধর্মীয় সংহতির ওপর ভিত্তি করে পাকিস্তান গড়ে উঠলেও সে সংহতির চেয়ে পূর্ব বাংলার মানুষের কাছে ভাষার ভিত্তিতে গড়ে ওঠা জাতীয়তাবাদ শক্তিশালী হয়ে ওঠে, যার পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশের জন্ম হয়।
প্রভাষক
এনায়েতবাজার মহিলা কলেজ, চট্টগ্রাম

বিজ্ঞাপন
শিক্ষা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন