এটি শুধু সিলেটের সরকারীকৃত এ কলেজের চিত্র নয়, বরং এ চিত্র উপজেলাভিত্তিক সরকারি হওয়া সারা দেশের কলেজগুলোর। প্রধানমন্ত্রী ২০১৬ সালে প্রতিটি উপজেলায় একটি করে কলেজ ও একটি করে হাইস্কুল সরকারীকরণের ঘোষণা দেন। এরপর শুরু হয় সরকারীকরণের কাজ। তিন শতাধিক কলেজ বর্তমানে এ প্রক্রিয়ায় থাকলেও দীর্ঘ সাত বছরে মাত্র একটি কলেজের নিয়োগ সম্পন্ন হয়েছে। এতে কলেজগুলোয় যে সংকট সৃষ্টি হয়েছে, তা খুবই উদ্বেগজনক।

চলমান সংকট
শিক্ষকসংকট

সরকারীকৃত কলেজগুলোর শিক্ষকসংকট এখন চরমে। বেশির ভাগ কলেজের গত সাত বছরে প্রায় অর্ধেক শিক্ষকের পদ শূন্য হয়েছে। পাঠদান কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে ব্যাপকভাবে। এসব কলেজের শিক্ষার্থীরা বেশির ভাগই গরিব ঘরের সন্তান। টিউশন বা কোচিং সেন্টারে বাড়তি টাকা খরচ করে পড়াশোনা করা তাদের পক্ষে অসম্ভব। কলেজের পাঠদান কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ায় তারাই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। শিক্ষাব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন আনতে প্রধানমন্ত্রী যে স্বপ্ন নিয়ে উপজেলাভিত্তিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সরকারি করেছেন, এসব কারণে তা অনেকটা বাধাগ্রস্ত বলেই প্রতীয়মান হচ্ছে।

শিক্ষার্থীরা আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত

প্রধানমন্ত্রী মূলত দেশের গ্রামীণ এলাকার শিক্ষাব্যবস্থার মানোন্নয়নের লক্ষ্যে প্রতিষ্ঠান সরকারীকরণের কাজে মনোনিবেশ করেন। গ্রামীণ এলাকার জনগণ যাতে অল্প বেতনে তাঁদের সন্তানদের শহরের উন্নত পড়াশোনার আদলে মফস্বলেই পড়াশোনা করাতে পারেন, সেটাই ছিল মূল উদ্দেশ্য। কিন্তু এতে বোধ হয় হিতে বিপরীতই হলো! কারণ, শিক্ষার্থীরা অনলাইনে ‘সরকারি কলেজ’ লেখা দেখে ভর্তির জন্য আবেদন করে। কিন্তু সুযোগ পেয়ে যখন কলেজে ভর্তি হতে আসে, তখন বেসরকারি নিয়মে বেতন ও ফি পরিশোধ করতে তারা হিমশিম খায়। গরিব অভিভাবকদের কষ্টের তখন কোনো সীমা থাকে না। সরকারি কলেজে বেসরকারি নিয়ম! এ যেন মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা!

প্রশাসনিক স্থবিরতা

সরকারীকৃত এসব কলেজের বেশির ভাগই এখন অভিভাবকশূন্য। বেশির ভাগ কলেজের অধ্যক্ষ ও উপাধ্যক্ষেরা অবসরে গেছেন। ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ দিয়ে চলছে প্রশাসনিক কার্যক্রম। অফিস স্টাফদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ অবসরে যাওয়ায় কলেজ পরিচালনায় হিমশিম খেতে হচ্ছে প্রশাসনকে। অনেক সময় বাধ্য হয়ে শিক্ষকদেরই করতে হচ্ছে অফিশিয়াল কাজ।

নন-এমপিও শিক্ষকদের দুরবস্থা

সরকারীকৃত এসব কলেজে দুই ধরনের শিক্ষক রয়েছেন। এমপিওভুক্ত ও নন-এমপিও। এমপিওভুক্ত শিক্ষকেরা সরকারি বেতন-ভাতার অংশ পেলেও নন-এমপিও শিক্ষকেরা প্রতিষ্ঠান থেকে যৎসামান্য বেতন-ভাতা পান। এসব কলেজের দু-একটি বাদ দিয়ে বেশির ভাগ কলেজেই অনার্স কোর্স চালু রয়েছে। অনার্স কোর্সের শিক্ষকেরা প্রায় ২৮ বছর ধরে এমপিওভুক্তির সুযোগ থেকে বঞ্চিত। কিন্তু সরকারীকরণের পর এবং পরবর্তী সময়ে করোনা অতিমারির কারণে এসব কলেজের আর্থিক সংকট এখন চরমে। ২০১৭ সালের ২০ এপ্রিল এসব কলেজের স্থাবর-অস্থাবর সব সম্পত্তি দানপত্র দলিলের মাধ্যমে সরকারের অনুকূলে হস্তান্তর করা হয়। বর্তমানে প্রায় ৯০ শতাংশ কলেজের শিক্ষক-কর্মচারীদের প্রতিষ্ঠান প্রদত্ত বেতন-ভাতা বন্ধ হয়েছে। এসব শিক্ষক-কর্মচারী পরিবার-পরিজনের ব্যয়ভার বহন করতে গিয়ে রীতিমতো মানবেতর জীবন যাপন করছেন। দীর্ঘ সাত বছর ধরে আত্তীকরণের কাজ ঝুলে থাকায় কবে সরকারি বেতন পাবেন, তা নিয়েও তাঁরা রয়েছেন চরম উৎকণ্ঠায়।

অবসরে যাওয়া শিক্ষকদের অনিশ্চয়তা

ইতিমধ্যে এসব কলেজের জিও জারির পর প্রায় এক-তৃতীয়াংশ শিক্ষক-কর্মচারী অবসরে গেছেন। ‘সরকারীকৃত কলেজশিক্ষক ও কর্মচারী আত্তীকরণ বিধিমালা ২০১৮’ অনুসারে জিও জারির সময় যাঁরা চাকরিরত ছিলেন, তাঁদের সবাই সরকারীকরণের আওতায় আসার কথা স্পষ্ট না থাকলেও মৌখিকভাবে মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা একাধিকবার নিশ্চিত করেছেন, তাঁরা সরকারি সুযোগ-সুবিধা পাবেন। দেশের সর্বাধিক জনপ্রিয় জাতীয় দৈনিক প্রথম আলো পত্রিকায় ২০২০ সালের ২০ সেপ্টেম্বর ‘জাতীয়করণের দিন থেকে সুবিধা পাবেন স্কুল-কলেজের শিক্ষক-কর্মচারীরা’ শিরোনামে সংবাদও প্রকাশিত হয়েছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে কোনো পরিপত্র জারি না হওয়ায় এসব শিক্ষক চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছেন। তা ছাড়া প্রতিদিনই কেউ না কেউ অবসরে যাচ্ছেন। আদৌ তাঁরা সরকারি সুযোগ-সুবিধা পাবেন কি না, সেটা অনেকটা সুদূরপরাহত।

সংকটের যেভাবে শুরু

মূলত ২০১৬ সাল থেকে সরকারীকরণের কাজ শুরু হয়। প্রথমে মাউশি অধিদপ্তরের আঞ্চলিক কর্মকর্তারা সরেজমিন এসব কলেজের যাবতীয় কাগজপত্র যাচাই-বাছাই করেন। পরবর্তী সময় মাউশি অধিদপ্তর ঢাকায় দ্বিতীয়বার একই কাগজপত্র যাচাই-বাছাই করা হয়। এরপর শিক্ষা মন্ত্রণালয় তৃতীয়বারের মতো একই কাগজপত্রের যাচাই-বাছাই শেষ করে। এর মধ্যে বিসিএস ক্যাডারের শিক্ষক কর্তৃক ‘নো বিসিএস, নো ক্যাডার’ আন্দোলনের দ্বারা এসব কলেজের সরকারীকরণের কাজ দীর্ঘদিন বাধাগ্রস্ত হয়। স্বাধীনতার পর থেকে আত্তীকরণ বিধিমালা ২০১৮ প্রণয়নের আগপর্যন্ত নতুন সরকারি হওয়া কলেজের শিক্ষকেরা শিক্ষা ক্যাডারের অন্তর্ভুক্ত হয়ে এসেছেন। কলেজশিক্ষকদের মধ্যে তখন কোনো পার্থক্য ছিল না।

কিন্তু ক্যাডার শিক্ষকদের অব্যাহত আন্দোলনের কারণে দীর্ঘদিন আত্তীকরণের কাজ স্থবির থাকার পর ২০১৮ সালের ৩১ জুলাই ‘সরকারীকৃত কলেজশিক্ষক ও কর্মচারী আত্তীকরণ বিধিমালা, ২০১৮’ নামক নন-ক্যাডার বিধিমালার গেজেট প্রকাশ হয়। নতুন এ বিধিমালার দ্বারা প্রথমবারের মতো কলেজশিক্ষকদের মধ্যে ক্যাডার এবং নন-ক্যাডার দ্বারা বিভাজন সৃষ্টি হয়। অবশেষে ২০১৮ সালের ১২ আগস্ট ২৭১টি কলেজকে একযোগে সরকারি করার প্রজ্ঞাপনে ২০১৮ সালের ৮ আগস্ট থেকে কার্যকর ঘোষণা করা হয়। পর্যায়ক্রমে আরও কিছু কলেজ এ তালিকায় যোগ হলে এ পর্যন্ত ৩২১টি কলেজ সরকারীকরণের প্রক্রিয়ায় আসে। অনেকটা ঢিলেঢালাভাবে চলছে সরকারীকরণের কাজ। তিনবার যাচাই-বাছাইসহ বিভিন্ন আন্দোলনের কারণে বাধাগ্রস্ত হয়েছে আত্তীকরণের কাজ। অনেক ক্ষেত্রে কর্মকর্তাদের সদিচ্ছা থাকা সত্ত্বেও লোকবলের সংকটে সময়-সময় ভাটা পড়েছে কাজে। করোনা পরিস্থিতির কারণেও অনেকটা সময় নষ্ট হয়েছে। এ পর্যন্ত ৩২১টি কলেজের তালিকা থেকে শুধু মুন্সিগঞ্জের বিক্রমপুর কে বি কলেজ নামক একটি কলেজের শিক্ষক-কর্মচারীদের নিয়োগ সম্পন্ন হলেও এখন পর্যন্ত তাঁরা সরকারি বেতন-ভাতা উত্তোলন করতে পারেননি।
সংকট থেকে উত্তরণের উপায়
দ্রুত আত্তীকরণের ব্যবস্থা

চলমান সংকট নিরসনের জন্য সরকারীকৃত এসব কলেজের শিক্ষক-কর্মচারীদের দ্রুত আত্তীকরণের কোনো বিকল্প নেই। শিক্ষক-কর্মচারীদের দ্রুততম সময়ের মধ্যে অ্যাডহক নিয়োগ দিতে পারলে ৯০ শতাংশ সমস্যা এমনিতেই সমাধান হয়ে যাবে। অ্যাডহক নিয়োগ সম্পন্ন হলে একদিকে যেমন শিক্ষক-কর্মচারীরা সরকারি বেতন-ভাতা পাবেন, অন্যদিকে শিক্ষার্থীদের সরকারি নামমাত্র বেতনে পড়াশোনা করার আদেশ জারি হবে। এ ছাড়া শিক্ষকদের নিয়োগের পর নিয়োগ–নিষেধাজ্ঞা উঠে যাবে এবং নতুন করে এসব কলেজে শিক্ষক নিয়োগ দিতে আর কোনো বাধা থাকবে না। এ তিন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় শিক্ষকদের আত্তীকরণের সঙ্গে সম্পৃক্ত।

কর্মকর্তাদের সদিচ্ছা থাকা আবশ্যক

শিক্ষক-কর্মচারীদের দ্রুত আত্তীকরণের কাজ সম্পন্নের ব্যাপারটি সম্পূর্ণভাবে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সদিচ্ছার ওপর নির্ভরশীল। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা আন্তরিক না হলে দ্রুত আত্তীকরণ কখনো সম্ভব হবে না। উপজেলাভিত্তিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সরকারীকরণ প্রধানমন্ত্রীর একটি বিশেষ উপহার। শিক্ষাক্ষেত্রে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনয়ন এবং গ্রামীণ জনগণের দোরগোড়ায় এর সুফল পৌঁছে দেওয়ার জন্য প্রধানমন্ত্রীর গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ এটি। তাই কর্মকর্তাদের এর গুরুত্ব বিবেচনা করে আত্তীকরণের কাজটি দ্রুত সম্পন্ন করা অতীব প্রয়োজন।

প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ জরুরি

সর্বোপরি সরকারের এ মহতী উদ্যোগকে সমালোচনার বেড়াজাল থেকে বের করে আনতে এবং দ্রুত এর বাস্তবায়নে প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ প্রয়োজন। গ্রামবাংলার আপামর জনসাধারণ যাতে এর সুফল পায়, সে জন্য অগ্রাধিকার ভিত্তিতে কাজটি শেষ করার জন্য তাঁর নির্দেশনা জরুরি। অথবা তিনি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের যাচাই-বাছাইয়ের তালিকা থেকে বৈধ নিয়োগপ্রাপ্ত সব শিক্ষক-কর্মচারীকে এখনই অ্যাডহক নিয়োগ সম্পন্নকরণ এবং শিক্ষার্থীদের সরকারি বেতনে পড়াশোনার অনুশাসন প্রদান করতে পারেন। এ সময় চলমান কাজ চলতে থাকবে এবং পরবর্তী সময়ে কোনো সমস্যার সৃষ্টি হলে তা বিদ্যমান নীতিমালা অনুসারে সমাধানযোগ্য হবে। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় দ্রুতই সব সমস্যার সমাধান হবে—এ প্রত্যাশা রাখি।

*লেখক: মো. শরীফ উদ্দিন আহমেদ, শিক্ষক

শিক্ষা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন