বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

ম্যাপল লিফ ইন্টারন্যাশনাল স্কুলের ক্লাস ‘ওয়ান জুন’ আর ক্লাস ‘ওয়ান জানুয়ারি’—দুই শাখার ভবন দুটি ১১ নম্বর সড়কের এ মাথা আর ও মাথায়। জানুয়ারি সেকশনের রাফিন সেকশন ভুল করে আরেকটিতে ঢুকে পড়ে। বন্ধুদের মুখ না দেখতে পেয়েই টের পেয়েছে নিজের বিভাগটি অন্য। ভাগ্য ভালো, অভিভাবক তখনো প্রবেশপথে দাঁড়িয়ে।

২০২০ সালে করোনা অতিমারি শুরুর পর এই শিশুটি কোনো কারণে জুন সেকশনে একদিন প্রবেশ করেছিল। শ্রেণিকক্ষ ভুল হওয়ার জন্য দেড় বছর একটা দীর্ঘ সময় নিশ্চয়ই; তবে এর চেয়ে বড় কারণ, গতকাল থেকে উচ্ছ্বাসে তালগোল পাকিয়েছে ওর মনে। আজ যে শিশুরা বিদ্যালয়ে প্রবেশ করেছে, তাদের অধিকাংশই আনন্দ আর দুশ্চিন্তায় ঘুমায়নি গত রাতে। এক শিশুকে মাথা ঝাঁকিয়ে হাঁটতে দেখে মনে হচ্ছিল, শুরু হলো সেই ঘুম ঘুম চোখে স্কুল-ইউনিফর্ম জীবন। ব্যাপারটা তা নয়; সাদা শার্ট, ছাইরঙা প্যান্টের ছেলেটার জুতা জোড়া কেনা হয়েছে গতকাল। সেটা এখনই অভ্যস্ত হয়নি পায়ে। ঘুরেফিরে তাই বারবার চোখ যাচ্ছে নতুন জুতায়। ম্যাপল লিফ ইন্টারন্যাশনাল স্কুলের আরেকটি শাখা দুই গলি পর ১৪/এ নম্বর রোডে। সেখানে দেখা গেল এক অভিনব দৃশ্য। এ বিভাগে প্রথম দিন এসেছে ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থীরা। সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থীরা আসবে আগামীকাল। সপ্তাহে এক দিন করে ক্লাস।

default-image

ম্যাপল লিফ ইন্টারন্যাশনাল স্কুলের ষষ্ঠ শ্রেণির তত্ত্বাবধান করেন মো. মিরন হোসেন। তিনি জানান, সিনিয়র সেকশনে আগে এক কক্ষে ৪০ জনের মতো বসত। আজ ১১–১২ জন করে বসানো হচ্ছে। কথা বলতে বলতে চোখের সামনে দিয়ে দুই ছাত্র ঢুকল, যাদের গায়ে টি-শার্ট। একজন শিক্ষক হেসে বললেন, ‘আজ প্রথম দিন, তাই অনেকে পোশাক বানাতে পারেনি। অনেকের আবার আগেরটাই ঠিক আছে। তবে আমরা স্কুলে আসতে উৎসাহ দিচ্ছি, প্রথম দিনেই পোশাক নিয়ে কিছু বলছি না। আগামী ক্লাসে, অর্থাৎ এক সপ্তাহ পরের ক্লাসে সবাই স্কুলড্রেসেই থাকবে আশা করি। এ স্কুলের দ্বিতীয় শ্রেণি আর সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থীরা আসবে আগামীকাল। তবে সশরীর স্কুলে উপস্থিতির পাশাপাশি চালু আছে অনলাইনের ক্লাস। তাই অনেক অভিভাবক এখনই স্কুলে পাঠাতে চান না​ সন্তানকে।’

কলাবাগানে থাকেন সাদাফ আফরোজ। তাঁর ছেলে পড়ে ম্যাপল লিফ ইন্টারন্যাশনাল স্কুলে, দ্বিতীয় শ্রেণিতে। মোবাইল ফোনে সাদাফ জানান, অনলাইনে ক্লাসের সুবিধা না থাকলে আসলে যেতেই হতো। শিক্ষকেরা জানালেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আজ খুললেও পাঠ্যসূচি শেষ করার মতো নির্ভরতা এখনই করা যাচ্ছে না এভাবে। অনলাইনের ওপরই নির্ভর করতে হবে। সাদাফও এখনই প্রস্তুত নন ছেলেকে স্কুলে পাঠাতে।

এই ভয় যারা উপস্থিত হয়েছে, তাদের মধ্যেও কাজ করেছে। সেন্ট্রাল রোডের মুহম্মদ আবরার আর উম্মে আইমান দুই ভাই–বোনই এই ইংরেজি মাধ্যম স্কুলের শিক্ষার্থী। প্রথম শ্রেণির আবরার আজ বাড়ি ফিরে ওর বোনকে নিরাপত্তা নিশ্চিত হওয়ার ‘মৌখিক সনদ’ দিলে সোমবার সপ্তম শ্রেণির আইমান আসবে স্কুলে। তবে ধানমন্ডির এই পথ দিয়ে যাওয়ার সময় এমনভাবে ‘আমাদের স্কুলের পথ’ বলে চিৎকার করে যে মনে হয় কোনো বহুজাতিক কোম্পানির প্রতিষ্ঠাতা ওরা। এ মন্তব্য আমাদের নয়, দুই শিক্ষার্থীর মায়ের। আবরারকে ভেতরে দিয়ে বাইরে অপেক্ষা করছিলেন মা। দুই ঘণ্টা পর আবার নিতে আসতে হবে বলে আজ অধিকাংশ অভিভাবক আর বাসায় যাননি।

default-image

যেকোনো প্রস্তুতির জন্য নির্দেশনার চেয়ে বেশি দরকার হৃদয় দিয়ে সেই প্রয়োজন অনুভব করা। ম্যাপল লিফ ইন্টারন্যাশনাল স্কুলের ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্রদের বরণ করে নিতে শিক্ষকেরা দাঁড়িয়ে ছিলেন প্রবেশপথে। পরিশীলিত কণ্ঠে বারবার সালামের শব্দ পেয়ে খেয়াল করলে দেখা গেল, একজন শিক্ষক তাঁর ছাত্রদের সালাম দিচ্ছেন। তাঁর কণ্ঠ আর্দ্র হয়ে আসছে। ছাত্রদের সালাম দেওয়ার কারণ জানতে চাইলে চকচকে দৃষ্টি নিয়ে ওই শিক্ষক বলেন, ‘কত দিন পর ওদের কাছ থেকে দেখলাম! অনলাইনের ক্লাস করাতেও আমরা স্কুলে এসেছি, মনিটরে বাচ্চাদের মুখ দেখেছি। কিন্তু আমাদের সামনে দিয়ে আমাদের শিক্ষার্থীরা হেঁটে যাচ্ছে কত দিন পর। দেড় বছরে বড় হয়ে গেছে অনেক। কত দিন পর মনে হচ্ছে জীবন আবার স্বাভাবিক হবে, এমন বিশ্বাস করতে পারি। এ বিশ্বাসটা পাচ্ছি আমাদের ছাত্রদের সামনাসামনি দেখে। তাই ওদের আমি আগে সালাম দিচ্ছি।’

ধানমন্ডির পরিচিত সচ্ছল মানুষের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে এবার আপাতসরল এক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দিকে যাই, যেখানে ছয়টি শ্রেণি মিলে শিক্ষার্থীর সংখ্যা ২০০।

টাবনের কাছে শহীদ বুদ্ধিজীবী ড. আমিন উদ্দিন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে আজ তৃতীয় শ্রেণির জন্য নির্ধারিত সময় সকাল নয়টা। কিন্তু সকাল সোয়া আটটায় পৌঁছে দেখা গেল, দুই রকম পোশাকে বসে আছে দুজন সহপাঠী। স্কুলের সহকারী শফিকুল গ্লাভস পরে দৌড়াদৌড়ি করছেন স্প্রে নিয়ে। এ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কম্পাউন্ডের ভেতর প্রবেশ করলেই মনে হয় রাজধানীর বাইরে খুব মায়া নিয়ে একেকটা ইট গেঁথে তৈরি হয়েছে এর সব দেয়াল। গাছগাছালির ভেতর একটা ভবন। রবীন্দ্রনাথ, নজরুল আর বেগম রোকেয়ার নামে শ্রেণিকক্ষ।

default-image

সেসব কক্ষের ভেতরের দেয়ালে সাঁটানো শিশুদের হাতে আঁকা ছবি। গত বছর স্কুল বন্ধের আগে এঁকেছিল ওরা। বাগানে বসে থাকা তৃতীয় শ্রেণির জান্নাতের মন একটু খারাপ ছিল। সে যতখানি উৎসাহ নিয়ে এক ঘণ্টা আগে এসেছে, এত উৎসাহ নিয়ে বন্ধুরা এখনো আসেনি।
আরও একটা ঘটনা সে ঘটিয়েছে, যা জান্নাত বলতেই চায়নি। স্কুল বন্ধ বলে ওর কানে দুল পরানোর জন্য ছিদ্র করার চেষ্টা করা হয়। সে এমনই ভয় পেয়েছে যে জান্নাতের নানি নাতির ডান কানে ছিদ্র করেই হাত সরিয়ে নিতে বাধ্য হন। এক কান পুরোপুরি সেরে উঠলে সে কানে দুল দিয়ে পছন্দ হলে অন্য কান ছিদ্র করার অনুমতি দেবে সে। জান্নাতের ডান কানে একটা ছোট্ট ফুল। সে এবার আশ্বস্ত। বাঁ কান আজ ছিদ্র করার কথা। হঠাৎ স্কুল খুলে যাওয়ায় সে খুব বিপদে পড়েছে। এখন বন্ধুরা হাসাহাসি করবে কি না, তা নিয়ে খুব দুশ্চিন্তায় আছে ও।

default-image

এ স্কুলের প্রধান শিক্ষক রিনা পারভিন নিজেই একটা সতর্কবার্তা শ্রেণিকক্ষের দরজায় ঝুলিয়ে দিচ্ছিলেন। সেখানে লেখা আছে, ‘কারও সঙ্গে রূঢ় হয়ো না।’ তাপমাত্রা মেপে শিক্ষার্থীদের প্রবেশ করানো হচ্ছিল। একেকটা বেঞ্চে বসেছে একজন করে শিক্ষার্থী। শুরু হলো তৃতীয় শ্রেণির পাঠ। স্কুলমাঠের রঙ্গন ফুল দুলতে দুলতে হাসল একবার।

বহুদিন পর তার আঙিনা আজ শব্দময়। এই অল্প শিক্ষার্থীর ছোট্ট স্কুলটি একটু বিশেষ। আমিন উদ্দিন ছিলেন বাংলাদেশ বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষণা পরিষদ (বিসিএসআইআর) এর জ্যেষ্ঠ বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা। ১৯৭১ সালের ১৪ ডিসেম্বর পাকিস্তানি সেনাদের হাতে প্রাণ হারান তিনি। তখন তাঁর একমাত্র সন্তানের বয়স কয়েক মাস। দেশের জন্য আত্মত্যাগী এই মহান মানুষকে স্মরণ করেই ২০১৪ সালে স্থাপিবিত হয়েছে এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। প্রধান শিক্ষকের কক্ষের দেয়ালে সাদাকালো ছবি একজন তরুণের। কী অসামান্য তাঁর প্রজ্ঞা আর চারিত্রিক দৃঢ়তা। এমন মানুষের স্মরণে যে শিক্ষার ব্যবস্থা, সে আয়োজন যত সামান্যই হোক, তা বিপুল বৈভবের। মন অনেক দিন খারাপ থাকার পর আজ ওই শিক্ষাকেন্দ্রে শোনা গেল টুকরা টুকরা হাসির শব্দ। বন্ধুকে স্পর্শে নিষেধাজ্ঞা থাকলেও তার মুখোমুখি বসে থাকার আনন্দ প্রতিমুহূর্তে বয়ে গেল। যেন কেউ ক্রমাগত গেয়ে চলেছে—‘প্রাঙ্গণে মোর শিরীষ শাখায় ফাগুন মাসে কি উচ্ছ্বাসে ক্লান্তিবিহীন ফুল ফোটানোর খেলা।’ রাজধানীর একটি কম পরিচিত স্কুলের মাঠেও এই ভাদ্রের শেষ সময় হয়ে উঠল ফাগুন মাস।

প্রতে৵ক শিক্ষার্থীর মতো প্রতিটি স্কুলের নিয়মনীতি ও ধরন ভিন্ন। এ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে বের হয়ে একটু এগিয়ে গেলে নীলক্ষেত হাইস্কুল। ছোট্ট গেট দিয়ে প্রবেশ করতেই দেখা গেল শিক্ষকদের আলাপ-আলোচনায় দুশ্চিন্তার ছাপ। ছোট্ট জান্নাত যেমন এক কানে দুল পরেই চলে এসেছে, এ স্কুলের শিক্ষার্থীরা একটু বেশি এক ধাপ। দশম শ্রেণির ক্লাস শুরু হবে বেলা সাড়ে ১১টায়। একদল উপস্থিত হয়েছে সকাল ৯টায়। এদিকে স্কুল খুললেও এত অল্প সময়ের মধ্যে তো আর ক্যানটিন খোলেনি। এদিকে বাইরে যাওয়ারও এখন কোনো সুযোগ নেই। অতি আগ্রহে আগে চলে আসা শিক্ষার্থীরা শিক্ষকদের জানাল খিদের কথা। শিক্ষকেরা ওদের কাছ থেকে খাবারের মেনু শুনছেন আর লিখে নিচ্ছেন। পরে একজনকে বাইরে পাঠিয়ে আনানো হবে সব খাবার। এর মধ্যেই আবার একজন নারী এলেন চেয়ার–টেবিল ঠিকঠাক পরিচ্ছন্ন করতে পেরেছেন কি না, তার স্বীকৃতি চাইতে। নীলক্ষেত হাইস্কুলের জ্যেষ্ঠ শিক্ষক আবেদা সুলতানা সেই স্বীকৃতি দিতে দিতে হাসিমুখে বললেন, ‘আজ সব সামলাতে আমরা হিমশিম খেয়ে যাচ্ছি, তবু কত দিন পর মনে হচ্ছে স্কুল মানে তো এ–ই। মা–বাবার পর শিক্ষক ছাড়া আর কাকে এমন অকপটে নিজের প্রয়োজনের কথা বলা যায়?’ আবেদা সুলতানা বলছিলেন, ‘দেখুন, অনেক কিছু সময়ে বদলায়; কিন্তু শিক্ষকেরা দায়িত্ব নেবেন আর শিক্ষার্থীরা সন্তানসম হবে, এ রীতি আপনার-আমার সময়েও ছিল, তার আগেও ছিল। বর্তমান ও ভবিষ্যতের জন্যও অপরিবর্তনীয়।’

default-image

করোনা অতিমারির জন্য ১৮ মাস বন্ধ থাকার পর আজ খুলল দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। রাজধানীর তিনটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ঘুরে শোনা গেল, ‘আহা, আজি এই বসন্তে/ এত ফুল ফুটে...’ গান বেজে চলেছে অবিরত। কেননা, নিজের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সব শিক্ষার্থীর জন্যই তীর্থস্থান। সেই অনুভব তখনই বোঝা সম্ভব, যখন সেখানে শত ইচ্ছায়ও যাওয়ার সুযোগ থাকে না। যে শিক্ষার্থী রোজ সকালে স্কুলে যেতে হবে বলে নানা বাহানায় দেরি করেছে, সে-ই এসেছে আজ সবার আগে।

শিক্ষা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন