হিয়ার মাঝে লুকিয়ে ছিলে

জান্নাতুল ফেরদৌস। ছবি: খালেদ সরকার
জান্নাতুল ফেরদৌস। ছবি: খালেদ সরকার

‘আমার হিয়ার মাঝে লুকিয়ে ছিলে, দেখতে আমি পাইনি তোমায়, দেখতে আমি পাইনি।’ গানের সঙ্গে জান্নাতুল ফেরদৌসের সম্পর্ক অনেকটা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের এই গানটির মতোই। ছোটবেলায় প্রাতিষ্ঠানিকভাবে গান শেখা হয়নি। অথচ এখন গানের মানুষ হিসেবেই ক্যাম্পাসে পরিচিত তিনি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সংগীত বিভাগের ২০১২-১৩ সেশনের ছাত্রী জান্নাতুল ফেরদৌস। স্নাতক শ্রেণিতে অর্জন করেছেন প্রথম স্থান। এই অর্জনের স্মারক হিসেবে তিনি পাচ্ছেন ‘ফিরোজা বেগম স্মৃতি স্বর্ণপদক ও পুরস্কার-২০১৭’।

কিশোরগঞ্জের করিমগঞ্জ থানার রৌহা গ্রামের মেয়ে জান্নাতুল ফেরদৌস। বাবা মো. ফরিদ উদ্দিন ও মা রোকসানা আক্তারের ছয় সন্তানের মধ্যে তিনি দ্বিতীয়। মফস্বলে বড় হয়েছেন। কিন্তু পড়াশোনায় পিছিয়ে ছিলেন না কখনোই। তার ফল হিসেবে জীবনের অধিকাংশ পরীক্ষাতেই প্রথম স্থান অর্জন করেছেন। স্বপ্ন দেখেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার। তাই বলে সংগীত বিভাগে পড়বেন, এমনটা অবশ্য আগে কখনো ভাবেননি। তাহলে ভালো লাগা আর পড়াশোনার বিষয়টা মিলে গেল কী করে? সে গল্পই বলছিলেন।

‘বাবা ছিলেন লোকগানের ভক্ত। ছোটবেলায় তাঁর সঙ্গে গলা মিলিয়ে গান গাইতাম। হারমোনিয়ামের প্রতি একটা আলাদা টান ছিল। নিজের বাসায় হারমোনিয়াম ছিল না, তাই চাচার বাসায় গিয়ে সারেগামা বাজাতাম।’ ছেলেবেলার কথা দিয়েই শুরু করলেন তিনি।

তাই বলে সংগীত বিষয়ে পড়ার সিদ্ধান্তটা সহজ ছিল না। ভর্তি পরীক্ষার ফল খুব ভালো হয়নি। জান্নাতুল বলছিলেন, ‘সংগীত বিভাগে আমি বাই চান্সে ভর্তি হয়েছি, বাই চয়েজে নয়। ভর্তি হওয়ার সময় পরিবার থেকে বাধা এসেছে। শুনতে হয়েছে প্রতিবেশীদের কটু মন্তব্য। এই বিভাগের নাম শুনে সবাই তাচ্ছিল্য করেছে। বলেছে কোনো চাকরি হবে না। সবাই শুধু নেতিবাচক মন্তব্যই করেছে।’ এমনকি গানভক্ত বাবাও নাকি শুরুতে মানতে পারেননি।

কিন্তু জান্নাতুল ফেরদৌস দমে যাননি। পরিবারের অমতে সংগীত বিভাগে ভর্তি হয়েছেন। তাই নিজেকে প্রমাণ করার প্রবল ইচ্ছেটা ছিল। মফস্বলের মেয়েটিকে ঢাকা শহরে এসে গানের সাধনা করতে কম বেগ পেতে হয়নি! প্রথম বর্ষে থেকেছেন মেসে। সেখানে তাঁর হারমোনিয়াম, তবলা, সেতার কিছুই ছিল না। সেই দিনগুলোতে টেবিলের ওপর তবলা এঁকে গানের চর্চা করেছেন তিনি। কখনো বিভাগের হারমোনিয়াম ব্যবহারের জন্য লম্বা সিরিয়াল ধরে অপেক্ষা করেছেন দিনভর। তবু গানের প্রতি ভালোবাসা কমেনি।

এখন জান্নাতুল ফেরদৌসের গানের ভক্ত তাঁর বন্ধুরা। হল কিংবা বিভাগের ছেলেমেয়েরা গান শোনানোর আবদার করেন যখন-তখন। পরীক্ষার নোটপত্র, গান তুলে দেওয়া, সুর ধরিয়ে দেওয়ার জন্যও নিজ বিভাগের বন্ধুমহলে তিনি সবার প্রিয়। জান্নাতুল ফেরদৌস বিশ্বাস করেন, গান গেয়ে বড় তারকা হওয়ার চেয়ে গানকে ভালোবাসতে পারাটাই বড়।

এখন মেয়ের ভালো রেজাল্ট দেখে বাবা খুব খুশি। গান ভালোবাসলেও শুধু গানেই ক্যারিয়ার গড়ার ইচ্ছে আপাতত নেই জান্নাতুলে। বিসিএস দিয়ে পুলিশ হতে চান তিনি। পাশাপাশি চলবে গানের চর্চা।