নতুন শিক্ষাক্রম নিয়ে কারা বিরোধিতা করছেন, জানালেন শিক্ষামন্ত্রী
রাজনৈতিক কারণে ও ধর্মকে অপব্যবহার করে যাঁরা সংকীর্ণ রাজনৈতিক ফায়দা হাসিল করতে চান, তাঁরা নতুন শিক্ষাক্রমের বিরোধিতা করছেন বলে মনে করেন শিক্ষামন্ত্রী দীপু মনি। এ ছাড়া কোচিং ও নোট-গাইড বই বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কাতেও অনেকে এর বিরোধিতা করছেন বলে জানান তিনি।
আজ বুধবার রাজধানীর আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটে নতুন শিক্ষাক্রম নিয়ে সারা দেশের প্রধান শিক্ষকদের অনলাইনে প্রশিক্ষণ কার্যক্রমের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে শিক্ষামন্ত্রী এ কথা বলেন।
বিভিন্ন পক্ষ থেকে নতুন শিক্ষাক্রমের বিরোধিতা করা হচ্ছে জানিয়ে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, ‘এটি নির্বাচনের বছর, রাজনৈতিক বিরোধিতা তো আছেই। সব দেশেই থাকে, আমাদের দেশেও আছে। আমাদের দেশে হয়তো ধরনটা একটু ভিন্ন। এখানে একটি পক্ষ আছে, যারা আমাদের পক্ষটিকে নিশ্চিহ্ন করে দিতে চায়। গ্রেনেড মেরে, বোমা মেরে গুলি করে, নানান পদ্ধতিতে। যেহেতু নির্বাচন সামনে, তাই তারা খুব সক্রিয়। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে খুব বেশি ইস্যু পাওয়া যাচ্ছে না, অতএব শিক্ষাক্রম ও বইয়ের ওপর সওয়ার হয়ে বিরোধিতা করার একটা চেষ্টা হয়েছে।’
দীপু মনি বলেন, আরেকটি পক্ষ, যারা ধর্মকে অপব্যবহার করে সংকীর্ণ রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের জন্য বিরোধিতা করছে। সেই চক্রের অপছন্দের কারণ হলো, শিক্ষার্থীরা যদি ভাবতে শিখে যায়, ভালো-মন্দ, সাদা-কালোর তফাত করতে শিখে যায়, তারা যদি সূক্ষ্ম চিন্তা করতে শেখে, তাহলে তাদের মগজধোলাই আর করা যাবে না। এই চক্রের মূল কাজই হলো মগজধোলাই। সেটি করা যাবে না, কাজেই এটি (শিক্ষাক্রম) নিয়ে তাদের খুব আপত্তি।
কোচিং ও নোট-গাইডের কারণেও অনেকে নতুন শিক্ষাক্রমের বিরোধিতা করছেন উল্লেখ করে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, ‘কোচিংয়ের সবকিছু খারাপ নয়, কিন্তু যাঁরা শ্রেণিকক্ষে পাঠদান না করে শিক্ষার্থীকে কোচিংয়ে যেতে বাধ্য করেন এবং সেখান থেকে অতিরিক্ত রোজগারটা করেন, সেখানেই সমস্যা। শিক্ষার্থীদের যাঁরা কোচিং করান, তাঁদের মহা ভয় হলো শিক্ষাক্রম বাস্তবায়িত হয়ে গেলে কোচিংয়ের দরকার হবে না। আরেকটি পক্ষ আছে, নোট বই-গাইড বইয়ের, এটি অনেক টাকার অর্থনীতি। তাদেরও খুব ভয়, নতুন শিক্ষাক্রম বাস্তবায়িত হয়ে গেলে নোট-গাইড বইয়ের দরকার হবে না। তাদের ভয়টিও অমূলক নয়, এই শিক্ষাক্রম বাস্তবায়িত হলে নোট-গাইড বইয়ের দরকার হবে না। আরেকটি শ্রেণি আছে, সমাজে যাদের অংশ বিশাল বড়, তারা যা আছে তা-ই থাকুক, সেটি চায়।
শিক্ষামন্ত্রী বলেন, ‘সমালোচনা থাকতে পারে, বাধা আসতে পারে, প্রতিবন্ধকতা থাকতে পারে। হয়তো আবার কদর্য ভাষার আশ্রয়ও নিতে পারে, কিচ্ছু যায় আসে না, আমরা এগিয়ে যাবই।’
এ সময় সাংবাদিকদেরও কিছু সমালোচনা করেন দীপু মনি। তিনি বলেন, নিজেদের প্রতিযোগিতার কারণে তারা (গণমাধ্যম) অনেক সময় অধৈর্য হয়ে যায়। এসব (নতুন শিক্ষাক্রম নিয়ে) প্রশ্নের উত্তর দিতে হলে একটি প্রক্রিয়ায় আসতে হবে। কিন্তু তাদের সেই ধৈর্য থাকে না। থাকে না বলে ওই সময়ে নেতিবাচক মন্তব্য করে বসে। তারা বলে, কিছুই হচ্ছে না কিংবা যা হচ্ছে, কিছুই ঠিক হচ্ছে না, এ রকম অনেক কিছু বলে। কিন্তু অনেক সময় সবার একেবারে ইস্পাতকঠিন স্নায়ু থাকে না। সেটার ধাক্কায় অনেকেই কুপোকাত হয়ে যান। তাতে ফলাফল যেটা হয় সেটা হলো, পথচলাটা বাধাগ্রস্ত হয়, অনেক সময় গতি বাধাগ্রস্ত হয়। অনেকের মধ্যে সংশয়ের জন্ম হয়, কাজটি করবেন, নাকি করবেন না।
বক্তব্য দিতে গিয়ে শিক্ষাবিদ অধ্যাপক মুহম্মদ জাফর ইকবাল বলেন, নতুন শিক্ষাক্রম শিশুরা খুবই পছন্দ করেছে। এতে শিশুদের আগ্রহ তৈরির জন্য সবকিছু করা হয়েছে।
মুহম্মদ জাফর ইকবালও তাঁর বক্তৃতায় সাংবাদিকদের সমালোচনা করেন। তিনি অনুষ্ঠানস্থলের পেছনে সারিতে থাকা সাংবাদিকদের দেখিয়ে বলেন, ‘যেকোনো কাজ করতে গেলে প্রথমে বাধা আসে কার কাছ থেকে? ওই যে পেছনে আছেন সাংবাদিকেরা, তাঁদের কাছ থেকে। ওনারা আমাদের জীবনটা অতিষ্ঠ করে দেন। আমি এখন পর্যন্ত দেখলাম না কোনো পত্র-পত্রিকায় বিষয়টি সুন্দরভাবে বিশ্লেষণ করল। কিন্তু সমালোচনায় কেউ পিছিয়ে নেই। আমি অনেক কিছু জানি। যেটা সামনাসামনি আপনাদের বলতে পারলে লজ্জায় কোথায় পালাবেন, তা জানতেন না। সে জন্য মাঝেমধ্যে চিন্তা করি, যেসব পত্র-পত্রিকা এত কঠিনভাবে এর পেছনে লেগেছে, তাদের সঙ্গে টেলিভিশনে বসে সামনাসামনি কথা বলি। আপনি একটা কথা বলেন, আমি একটা কথা বলি। দেখি, কতক্ষণ টিকতে পারেন। কাজেই যাঁরা এর (নতুন শিক্ষাক্রম) প্রক্রিয়ার সঙ্গে আছেন তাঁদের বলব, আপনারা এটা নিয়ে দুর্ভাবনা করবেন না। পত্র-পত্রিকাকে তাদের মতো কথা বলতে দেন, তাদের পত্রিকা বিক্রি করতে হয়। কেউ ভালো কথা শুনতে চায় না। গালাগাল দিলে কথাটা ভালো শোনা যায়।’
মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক নেহাল আহমেদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন শিক্ষা উপমন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী, কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগের জ্যেষ্ঠ সচিব মো. কামাল হোসেন, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিব সোলাইমান খান, সরকারি কর্ম কমিশনের সদস্য অধ্যাপক মো. গোলাম ফারুক, মাদ্রাসা শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক হাবিবুর রহমান, জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের চেয়ারম্যান ফরহাদুল ইসলাম।