বড় হতে হলে আরামদায়ক গণ্ডির বাইরে বের হতে হবে

আইইউবিএটির নবম সমাবর্তন অনুষ্ঠানে সমাবর্তন বক্তা কানাডার ইউনিভার্সিটি অব রেজাইনার প্রেসিডেন্ট অধ্যাপক ড. জেফ কেশেনছবি: আইইউবিএটির সৌজন্যে

সামনে এগিয়ে যাওয়ার পথে ‘না’ এবং ‘হ্যাঁ’ বলার সাহস রাখতে হবে। অভ্যাসের প্রতি লক্ষ রাখতে হবে। কারণ, তা চরিত্র গঠন করে। আর চরিত্রের প্রতি যত্নশীল হতে হবে। কারণ, চরিত্রই ভাগ্য নির্ধারণ করে। বড় হতে হলে নিজের আরামদায়ক গণ্ডির বাইরে বের হতে হবে।

ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব বিজনেস অ্যাগ্রিকালচার অ্যান্ড টেকনোলজির (আইইউবিএটি) নবম সমাবর্তন অনুষ্ঠানে সমাবর্তন বক্তা জেফ কেশেন এ কথা বলেন। কেশেন কানাডার ইউনিভার্সিটি অব রেজাইনার প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

আজ সোমবার রাজধানীর শেরেবাংলা নগরের বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে (বিসিএফসিসি) আয়োজিত ওই সমাবর্তন অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। এতে ২০২৪-এর শরৎ থেকে ২০২৫-এর গ্রীষ্মকালীন সেমিস্টারের প্রায় এক হাজার শিক্ষার্থীকে ডিগ্রি দেওয়া হয়েছে। সমাবর্তনে এমবিএ, এমপিএইচ, বিবিএ, কৃষি, কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং, ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং, সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং, মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং, অর্থনীতি, ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট, নার্সিং, ইংরেজিসহ বিভিন্ন বিষয়ে ডিগ্রি দেওয়া হয়।

অনুষ্ঠানে রাষ্ট্রপতি ও বিশ্ববিদ্যালয়ের আচার্যের প্রতিনিধি হিসেবে সভাপতিত্ব করেন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন। স্বাগত বক্তব্য দেন আইইউবিএটির উপাচার্য আবদুর রব। সমাপনী বক্তব্য দেন বিশ্ববিদ্যালয়ের কোষাধ্যক্ষ সেলিনা নার্গিস। এ সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের বোর্ড অব ট্রাস্টিজের সদস্যসহ শিক্ষক-শিক্ষার্থী, অভিভাবক এবং কর্মকর্তা–কর্মচারীরা উপস্থিত ছিলেন।

রাষ্ট্রপতি ও বিশ্ববিদ্যালয়ের আচার্যের প্রতিনিধি হিসেবে সমাবর্তনে সভাপতি হিসেবে বক্তব্য দেন পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন
ছবি: আইইউবিএটির সৌজন্যে

বৈশ্বিক পটভূমিতে উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার গুরুত্ব এবং আন্তর্জাতিক একাডেমিক সহযোগিতার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন সমাবর্তন বক্তা জেফ কেশেন। শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘এমন একটি পৃথিবীর কথা ভাবুন, যেখানে মানুষ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে অস্ত্র হিসেবে বা কাউকে ঠকানোর মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করবে না। বরং আমাদের সবচেয়ে জরুরি সমস্যাগুলোর সমাধানে সম্পদ হিসেবে ব্যবহার করবেন। তাই শুধু উদ্ভাবন নয়, বরং সেটি কীভাবে ব্যবহৃত হবে, সে ক্ষেত্রেও ভূমিকা পালন করবেন।’

জেফ কেশেন আরও বলেন, সামনে এগিয়ে যাওয়ার পথে ‘না’ এবং ‘হ্যাঁ’ বলার সাহস রাখতে হবে। যা সঠিক, ন্যায্য এবং নৈতিক নয়, তাকে ‘না’ বলতে হবে। কিন্তু সুযোগ কাজে লাগাতে, ঝুঁকি নিতে এবং শিখতে ও বড় হতে নিজের আরামদায়ক গণ্ডির বাইরে বের হতে বলতে হবে ‘হ্যাঁ’।

শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে জেফ কেশেন বলেন, ‘আপনার চিন্তার প্রতি খেয়াল রাখুন, কারণ তা শব্দে পরিণত হয়; শব্দের প্রতি খেয়াল রাখুন, কারণ তা কর্মে রূপ নেয়; কর্মের প্রতি খেয়াল রাখুন, কারণ তা অভ্যাসে পরিণত হয়; অভ্যাসের প্রতি লক্ষ রাখুন, কারণ তা চরিত্র গঠন করে। আর আপনার চরিত্রের প্রতি যত্নশীল হোন, কারণ চরিত্রই আপনার ভাগ্য নির্ধারণ করে। কারণ, আমরা যা চিন্তা করি, আমরা শেষ পর্যন্ত তা–ই হয়ে উঠি।’

আইইউবিএটির গবেষণা কার্যক্রম, বৈশ্বিক র‍্যাঙ্কিং অর্জন এবং টেকসই উন্নয়নবিষয়ক শিক্ষার প্রশংসা করে সভাপতির বক্তব্যে মোহাম্মদ তৌহিদ হোসেন বলেন, ‘সদ্য গ্র্যাজুয়েট হওয়া শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে বলতে চাই, আপনারা এমন এক পৃথিবীতে প্রবেশ করছেন, যা দ্রুত পরিবর্তনশীল এবং চ্যালেঞ্জে ভরপুর। আর এই চ্যালেঞ্জগুলোর সঙ্গেই লুকিয়ে আছে বিশাল সম্ভাবনা।’ তিনি বলেন, অধ্যাপক ড. এম আলিমউল্লাহ মিয়ান একটি লক্ষ্য নিয়ে প্রতিষ্ঠানটি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। সেটি হলো, বাংলাদেশের প্রতিটি গ্রাম থেকে অন্তত একজন করে পেশাদার গ্র্যাজুয়েট তৈরি। আজ এই গ্র্যাজুয়েশনের মাধ্যমে গ্র্যাজুয়েটরা সেই স্বপ্নেরই মশাল বহনকারী হয়ে উঠলেন।

সমাবর্তন অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন আইইউবিএটির উপাচার্য আবদুর রব
ছবি: আইইউবিএটির সৌজন্যে

স্বাগত বক্তব্যে গ্র্যাজুয়েটদের অভিনন্দন জানিয়ে এবং ভবিষ্যৎ সাফল্য কামনা করে আইইউবিএটির উপাচার্য আবদুর রব বলেন, ‘আজ আপনারা কেবল ডিগ্রি নিচ্ছেন না, সঙ্গে নিয়ে যাচ্ছেন দায়িত্ববোধ, নৈতিকতা ও মূল্যবোধ। আপনাদের প্রতি অনুরোধ, কর্মজীবনে সৎ, দয়ালু, নৈতিক ও পেশাদার থাকবেন সব সময়। মনে রাখবেন, শেখার কোনো শেষ নেই। তাই আজকের এই সমাবর্তন মানে আপনার শিক্ষাজীবন শেষ নয়, এখন থেকেই শুরু।’

এবারের সমাবর্তনে কৃতিত্বপূর্ণ একাডেমিক ফলাফলের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনজন মেধাবী শিক্ষার্থীকে ‘মিয়ান স্বর্ণপদক’ দেওয়া হয়। পদকপ্রাপ্তরা হলেন কৃষি বিভাগের শাহরিন খন্দকার, ইংরেজি বিভাগের মোছা. লুৎফুননাহার কামিনী এবং পাবলিক হেলথ বিভাগের মাহারুন্নেসা মিতু। এর মধ্যে শাহরিন খন্দকার সর্বোচ্চ মর্যাদাপূর্ণ ‘আলিমউল্লাহ মিয়ান পুরস্কার’ লাভ করেন।

সমাপনী বক্তব্য দেন আইইউবিএটির কোষাধ্যক্ষ সেলিনা নার্গিস
ছবি: আইইউবিএটির সৌজন্যে

মিয়ান স্বর্ণপদকপ্রাপ্ত মোছা. লুৎফুননাহার কামিনী বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্তর্ভুক্তিমূলক ও অনুপ্রেরণামূলক পরিবেশেই আমার অর্জনের অন্যতম কারণ। পাশাপাশি বিভাগের শিক্ষকদের সহযোগিতা আমার চলার এই পথকে সহজ করেছে। আমি বিশেষভাবে কৃতজ্ঞ আমার পরিবারের প্রতি, যাদের অক্লান্ত পরিশ্রম এবং সহযোগিতায় আমি আজকের এ অবস্থানে পৌঁছাতে পেরেছি।’

অনুষ্ঠানের অতিথি ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের প্রতি কৃতজ্ঞতা ও ধন্যবাদ জানিয়ে সমাপনী বক্তব্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের কোষাধ্যক্ষ সেলিনা নার্গিস বলেন, ‘এই সমাবর্তন কেবল প্রাতিষ্ঠানিক সাফল্যের উদ্‌যাপন নয়, বরং এটি বিশ্বাস, কঠোর পরিশ্রম ও ভবিষ্যতের আশার প্রতিফলন।

সকাল ১০টায় শুরু হওয়া অনুষ্ঠানের প্রথম পর্বে ছিল সমাবর্তন শোভাযাত্রা, পবিত্র ধর্মগ্রন্থসমূহ থেকে পাঠ, জাতীয় সংগীত ও ডিগ্রি প্রদান। দ্বিতীয় পর্বে মধ্যাহ্নভোজ ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। দীর্ঘ শিক্ষাজীবন শেষে সনদ হাতে পেয়ে গ্র্যাজুয়েটদের উল্লাস ও আনন্দঘন পরিবেশে মুখরিত হয়ে ওঠে অনুষ্ঠানস্থল।

১৯৯১ সালে প্রতিষ্ঠিত আইইউবিএটি বাংলাদেশের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর পথিকৃৎ, যা প্রতিষ্ঠা করেন প্রখ্যাত শিক্ষাবিদ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইবিএর সাবেক পরিচালক অধ্যাপক ড. এম আলিমউল্লাহ মিয়ান। প্রতিষ্ঠার পর থেকে আইইউবিএটি একাডেমিক উৎকর্ষ, গবেষণা ও উদ্ভাবনে অসামান্য সাফল্য অর্জন করে আসছে। পাশাপাশি বাংলাদেশের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে উচ্চ বৈশ্বিক র‍্যাঙ্কিং অর্জন করেছে।