ঢাকা সিটি কলেজ: ১৯৮ শিক্ষকের ১০৫ জনের নিয়োগ নিয়েই প্রশ্ন

ঢাকা সিটি কলেজফাইল ছবি: প্রথম আলো

দেশের পরিচিত বেসরকারি কলেজগুলোর একটি ঢাকা সিটি কলেজ। কলেজটির ১৯৮ জন শিক্ষকের মধ্যে ১০৫ জনের নিয়োগই বিধিসম্মতভাবে হয়নি। ২৮ লাখ টাকার বেশি ভ্যাট ও প্রায় ৩ লাখ টাকার আয়কর সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়া হয়নি। আর পরিচালনা কমিটি বিধিবহির্ভূতভাবে প্রায় পৌনে দুই কোটি টাকা সম্মানী নিয়েছে।

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীন পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তরের (ডিআইএ) পরিদর্শন ও নিরীক্ষা প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। ১৪ জুলাই প্রতিবেদনটি চূড়ান্ত করা হয়। ১৯ জুলাই ডিআইএর পরিচালক অধ্যাপক এম এম সহিদুল ইসলাম প্রতিবেদনটি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিবের কাছে পাঠিয়েছেন।

তবে পরিদর্শনটি হয়েছিল ২০২২ সালের আগস্টে। পরিদর্শন করেন ডিআইএর তৎকালীন সহকারী শিক্ষা পরিদর্শক মনিরুজ্জামান ও অডিট কর্মকর্তা চন্দন কুমার দেব। পরে আনুষঙ্গিক কার্যক্রম শেষে প্রতিবেদনটি চূড়ান্ত করা হয়।

জানতে চাইলে ডিআইএর পরিচালক অধ্যাপক এম এম সহিদুল ইসলাম গতকাল প্রথম আলোকে বলেন, তাঁদের পরিদর্শন ও নিরীক্ষায় যেসব আপত্তি পেয়েছেন, সেগুলো প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছেন। প্রতিবেদন মন্ত্রণালয়ে জমা দিয়েছেন। এখন বিধি মোতাবেক পরবর্তী ব্যবস্থা নেবে মন্ত্রণালয়।

১৯৫৭ সালে প্রতিষ্ঠিত ঢাকা সিটি কলেজে বর্তমানে উচ্চমাধ্যমিক, স্নাতক, স্নাতক (সম্মান) ও স্নাতকোত্তর পর্যায়ে পাঠদান করা হয়। ২০২২ সালে পরিদর্শনের সময় কলেজটিতে শিক্ষার্থী ছিল ১০ হাজার ৮১১ জন। কলেজটি আগে এমপিওভুক্ত ছিল। তবে এখন সেই তালিকায় নেই।

১৯৫৭ সালে প্রতিষ্ঠিত ঢাকা সিটি কলেজে বর্তমানে উচ্চমাধ্যমিক, স্নাতক, স্নাতক (সম্মান) ও স্নাতকোত্তর পর্যায়ে পাঠদান করা হয়। পরিদর্শনের সময় কলেজটিতে শিক্ষার্থী ছিল ১০ হাজার ৮১১ জন। কলেজটি প্রথমে সরকারি অনুদানভুক্ত ছিল। পরে এমপিওভুক্ত হয়। তবে ১৯৯৯ সালে এমপিও–সুবিধা প্রত্যাহার করা হয়। অর্থাৎ শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন-ভাতার জন্য সরকারি অনুদান নেওয়া বন্ধ হয়। বর্তমানে কলেজটি এমপিওভুক্ত নয়।

ডিআইএর প্রতিবেদনের বিষয়ে বক্তব্য জানতে সিটি কলেজের অধ্যক্ষ (ভারপ্রাপ্ত) কাজী নেয়ামুল হকের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা চালিয়েও পাওয়া যায়নি। তাঁর মুঠোফোনের নম্বরে কল করা হয়েছিল, রিং হলেও তিনি ধরেননি।

বিধি উপেক্ষা করে ১০৫ নিয়োগ

প্রতিবেদনের এক অংশে ১০০ জন শিক্ষকের নাম উল্লেখ করে বলা হয়েছে, তাঁদের নিয়োগের ক্ষেত্রে ১৯৮২ সালের নিয়োগবিধি অনুসরণ করা হয়নি।

এসব নিয়োগে শুধু সংবাদপত্রে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ ও সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়। কিন্তু নিয়োগ বোর্ডে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর কিংবা জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো প্রতিনিধি ছিলেন না। এ ছাড়া বিধি অনুযায়ী নিয়োগ কমিটিও গঠন করা হয়নি। প্রতিবেদনে বলা হয়, পরিচালনা কমিটির (গভর্নিং বডি) অনুমোদনের প্রমাণও প্রদর্শন করা হয়নি। ফলে এসব নিয়োগ বিধিসম্মত হয়নি।

আরেকটি তালিকায় পাঁচজন শিক্ষকের নাম উল্লেখ করে বলা হয়েছে, তাঁদের নিয়োগের ক্ষেত্রেও ১৯৮২ সালের নিয়োগবিধি অনুসরণ করা হয়নি। এ ক্ষেত্রে পত্রিকায় নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়নি। মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর ও জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে নিয়োগ কমিটিও গঠন করা হয়নি। এমনকি সাক্ষাৎকারও নেওয়া হয়নি। ফলে এসব নিয়োগও বিধিসম্মত হয়নি।

প্রতিবেদনে ১০৫ জনের নিয়োগ নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে। তাঁদের মধ্যে ১৮ জন অধ্যাপক, অন্যরা সহযোগী অধ্যাপক, সহকারী অধ্যাপক, প্রভাষক ও ডেমোনস্ট্রেটর (প্রদর্শক)। ব্যাংক চেকের মাধ্যমে পরিশোধ না করে ৯ অর্থবছরে মোট ৭২ লাখ ৭৭ হাজার টাকার বেশি নগদ অর্থ হাতে রেখে ব্যয় নিয়েও তোলা হয়েছে প্রশ্ন। এ ছাড়া পরিচালনা কমিটির সদস্যদের সম্মানী ভাতা হিসেবে ১ কোটি ৯৭ লাখ ৩৪ হাজার টাকা ব্যয়ও বিধি মেনে হয়নি।

এ দুই তালিকায় থাকা ১০৫ জনের মধ্যে ১৮ জন অধ্যাপক। অন্যরা সহযোগী অধ্যাপক, সহকারী অধ্যাপক, প্রভাষক ও ডেমোনস্ট্রেটর (প্রদর্শক)।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, প্রতিষ্ঠানের স্টাফিং প্যাটার্ন যাচাই করে দেখা গেছে, বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জনবলকাঠামো ও এমপিও নীতিমালা এবং জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের নীতিমালার তুলনায় প্রতিষ্ঠানে প্রাপ্যতার অতিরিক্ত শিক্ষক-কর্মচারী রয়েছেন। বিধিবহির্ভূতভাবে ৩৪ জন অধ্যাপক ও ৪৭ জন সহযোগী অধ্যাপক যথাক্রমে চতুর্থ ও পঞ্চম গ্রেডে বেতন-ভাতা পাচ্ছেন।

আর্থিক অনিয়ম

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রতিষ্ঠানের সরবরাহ করা তথ্য অনুযায়ী আয়-ব্যয়ের সব ধরনের অর্থ ব্যাংক চেকের মাধ্যমে পরিশোধ না করে ৯ অর্থবছরে মোট ৭২ লাখ ৭৭ হাজার টাকার বেশি নগদ অর্থ হাতে রেখে ব্যয় করা হয়েছে, যা আর্থিক বিধির লঙ্ঘন।

বিভিন্ন খাতের তথ্য বিশ্লেষণ করে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১২-১৩ থেকে ২০২০-২১ অর্থবছরের জুন পর্যন্ত সময়ের ভ্যাট বাবদ সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়ার কথা ছিল ২৮ লাখ ৩২ হাজার ৬৯২ টাকা। এই অর্থ ট্রেজারি চালানের মাধ্যমে সরকারি কোষাগারে জমা দিয়ে তার কপি মন্ত্রণালয়ে দাখিল করতে বলা হয়েছে। একইভাবে উৎসে কর্তন না করা ২ লাখ ৯২ হাজার টাকার আয়করও ট্রেজারি চালানের মাধ্যমে সরকারি কোষাগারে জমা দিতে বলা হয়েছে।

এ ছাড়া প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পরিচালনা কমিটির সদস্যরা ২০১২-১৩ অর্থবছর থেকে শুরু করে নিরীক্ষার সময় পর্যন্ত ‘সিটিং অ্যালাউন্স’ হিসেবে ১ কোটি ৯৭ লাখ ৩৪ হাজার টাকা গ্রহণ করেছেন, যা বিধিবহির্ভূত। এ অর্থ সরকারি কোষাগারে জমা দিয়ে ট্রেজারি চালানের কপি মন্ত্রণালয়ে দাখিল করতে বলা হয়েছে।

প্রতিবেদনে সিটি কলেজের পাঠ ব্যবস্থাপনা এবং ফলাফল নিয়ে সন্তোষ প্রকাশ করা হয়েছে। কলেজে পৃথক পাঠাগার রয়েছে, যেখানে ২৪ হাজারের বেশি বই রয়েছে। পৃথক বিজ্ঞানাগারও আছে। শিক্ষার্থীর তুলনায় প্রয়োজনীয় বৈজ্ঞানিক যন্ত্রপাতিও রয়েছে। এইচএসসি পরীক্ষার ফলাফলের গুণগত ও সংখ্যাগত মান সন্তোষজনক।

ফলাফল সন্তোষজনক

প্রতিবেদনে সিটি কলেজের পাঠ ব্যবস্থাপনা এবং ফলাফল নিয়ে সন্তোষ প্রকাশ করা হয়েছে।

সিটি কলেজের নিজস্ব জমির পরিমাণ ৩৯৪ দশমিক ৩ শতাংশ। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজনীয় জমি রয়েছে। কলেজটিতে ১৮০টি কক্ষ রয়েছে। তবে ভবনগুলো প্রয়োজনীয় মেরামত ও সংস্কার করে ব্যবহার করতে হবে। প্রতিষ্ঠানে সুপেয় পানির ব্যবস্থা রয়েছে। ছেলে ও মেয়েদের জন্য পৃথক ওয়াশ ব্লকও আছে।

শিক্ষাবর্ষের শুরুতেই পাঠপরিকল্পনা তৈরি করে তা শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিতরণ করে সে অনুযায়ী নিয়মিত শ্রেণি কার্যক্রম পরিচালনা এবং শ্রেণিকক্ষে সহায়ক উপকরণ ব্যবহারের বিষয়টি প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়। দুর্বল ও অমনোযোগী শিক্ষার্থীদের চিহ্নিত করে তাদের পাঠোন্নয়নের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়টিও নজরে এসেছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পরিদর্শকদের।

সিটি কলেজে পৃথক পাঠাগার রয়েছে, যেখানে ২৪ হাজারের বেশি বই রয়েছে। পৃথক বিজ্ঞানাগারও আছে। শিক্ষার্থীর তুলনায় প্রয়োজনীয় বৈজ্ঞানিক যন্ত্রপাতিও রয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কলেজটির এইচএসসি পরীক্ষার ফলাফলের গুণগত ও সংখ্যাগত মান সন্তোষজনক। তবে ফল আরও উন্নত করতে সব শিক্ষককে আন্তরিকভাবে প্রচেষ্টা চালাতে হবে।