বাংলাদেশের শিক্ষা খাত: অর্জন থেকে উত্তরণের পথে
বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা একটি চলমান ও বিবর্তনশীল প্রক্রিয়া। বিগত পাঁচ দশকেরও বেশি সময় ধরে নানা উত্থান-পতন সত্ত্বেও নীতিগত সংস্কার, প্রাতিষ্ঠানিক বিস্তার ও কাঠামোগত উন্নয়নের মাধ্যমে দেশের শিক্ষা খাত উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। সমাজ, অর্থনীতি, কৃষি, চিকিৎসা, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে যে পরিবর্তন দৃশ্যমান, তার পেছনে শিক্ষাব্যবস্থার অবদান অনস্বীকার্য। সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে নতুন সরকারের কাছে শিক্ষক, শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও শিক্ষাবিদদের প্রত্যাশা হলো, অর্জনকে ধরে রেখে সীমাবদ্ধতাগুলো চিহ্নিত করা এবং টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজিএস) অর্জনে শিক্ষা খাতে সবার জন্য সমতাভিত্তিক ও মানসম্মত শিক্ষা, দক্ষ শিক্ষক, আধুনিক প্রযুক্তি ও নিরাপদ শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত করে বিশ্বমানের শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলা।
স্বাধীনতার পর থেকে বিভিন্ন সরকারের আমলে বাংলাদেশের শিক্ষা খাতে যে পুনর্গঠন শুরু হয়, তার একটি বড় পদক্ষেপ ছিল প্রাথমিক বিদ্যালয়ের জাতীয়করণ ও এরপর কুদরাত-এ-খুদা শিক্ষা কমিশনের সুপারিশ শিক্ষাসংস্কারের ভিত্তি রচনা করে। নিরক্ষরতা দূরীকরণ কর্মসূচি, বিশেষ করে নারীশিক্ষায় উপবৃত্তি চালু, প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ে ছেলে–মেয়ের সমতা অর্জনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। দক্ষিণ এশিয়ার প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ নারীশিক্ষায় অগ্রগতির একটি রোল মডেল হিসেবে পরিচিতি পায়।
মুখস্থনির্ভরতা কমিয়ে দক্ষতা ও সৃজনশীলতাভিত্তিক শিক্ষায় জোর দিয়ে নতুন কারিকুলাম ও পরীক্ষাপদ্ধতি চালু করা হয়। উদ্দেশ্য ছিল শিক্ষার্থীদের বিশ্লেষণী ক্ষমতা, সমস্যা সমাধান দক্ষতা এবং বাস্তব জীবনমুখী জ্ঞান বৃদ্ধি।
বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার ক্রমবিকাশে বিভিন্ন সরকারের গৃহীত নানা গুরুত্বপূর্ণ ও ইতিবাচক উদ্যোগ এই খাতের অগ্রগতিতে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করেছে। ১৯৯০-এর দশকে প্রাথমিক শিক্ষা বাধ্যতামূলক ঘোষণা, ‘সবার জন্য শিক্ষা’ কার্যক্রম, ষষ্ঠ শ্রেণি পর্যন্ত মেয়েদের উপবৃত্তি চালু এবং ঝরে পড়া রোধে কার্যকর উদ্যোগ নারীশিক্ষার বিস্তার ও শিক্ষার হার বৃদ্ধিতে বিশেষ অবদান রাখে। এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের জন্য নিবন্ধন পরীক্ষার প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো গড়ে তোলা হয় বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষের (এসটিআরসিএ) মাধ্যমে। এতে শিক্ষক নিয়োগে মান নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হয়। এবং ১৯৯২ সালের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন উচ্চশিক্ষার সম্প্রসারণে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে।
উল্লেখ্য যে, ২০২৬ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশে মাসিক বেতন আদেশ (এমপিও) প্রকল্পের অধীন পরিচালিত প্রায় ৩১ হাজার ৮২৬টি বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে এবং বাংলাদেশে ১১৬টি অনুমোদিত বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে। তাই বলা যেতে পারে যে বর্তমানে এমপিও স্কুল ও কলেজ এবং বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোই শিক্ষা খাতের অন্যতম বৃহত্তম অংশীদার। পরবর্তী সময়ে ২০১০ সালে প্রণীত জাতীয় শিক্ষানীতি শিক্ষাব্যবস্থাকে আধুনিক ও মানবিক করার একটি উচ্চাভিলাষী প্রচেষ্টা ছিল। বছরের শুরুতেই কোটি কোটি শিক্ষার্থীর হাতে বিনা মূল্যে পাঠ্যপুস্তক বিতরণ একটি নজিরবিহীন উদ্যোগ হিসেবে প্রশংসিত হয়। এটা বিদ্যালয়ে ভর্তির হার বৃদ্ধি এবং ঝরে পড়া কমাতে সহায়তা করে।
বাংলাদেশের বিগত সরকারগুলোর আমলে শিক্ষা খাতে অবকাঠামোগত সম্প্রসারণ ঘটে। বহু স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয় এবং নতুন ভবন নির্মাণ করা হয়। দেশজুড়ে অনেক কলেজ জাতীয়করণ করা হয়, বিশেষ করে যেসব উপজেলায় কোনো সরকারি কলেজ ছিল না, সেখানে অন্তত একটি সরকারি কলেজ জাতীয়করণ করা হয়। অনেক মাধ্যমিক বিদ্যালয় এবং নিবন্ধিত বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ও জাতীয়করণের আওতায় আসে। ফলে গ্রামীণ ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর শিক্ষার্থীরা সরকারি সুবিধা লাভের সুযোগ পায় এবং উচ্চশিক্ষায় প্রবেশাধিকারের বৈষম্য কিছুটা হ্রাস পায়। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম, কম্পিউটার ল্যাব এবং অনলাইন প্রশাসনিক ব্যবস্থা চালু করা হয়। অনেক প্রতিষ্ঠানে আইসিটি ভবন নির্মাণের মাধ্যমে একটি প্রযুক্তিভিত্তিক শিক্ষার পরিবেশ তৈরি করা হয়। তথ্যপ্রযুক্তিভিত্তিক শিক্ষার প্রসার শিক্ষার্থীদের বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণের সক্ষমতা বাড়াতে সাহায্য করেছে। মুখস্থনির্ভরতা কমিয়ে দক্ষতা ও সৃজনশীলতাভিত্তিক শিক্ষায় জোর দিয়ে নতুন কারিকুলাম ও পরীক্ষাপদ্ধতি চালু করা হয়। উদ্দেশ্য ছিল শিক্ষার্থীদের বিশ্লেষণী ক্ষমতা, সমস্যা সমাধানের দক্ষতা এবং বাস্তব জীবনমুখী জ্ঞান বৃদ্ধি। তবে বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ায় পর্যাপ্ত প্রস্তুতি, শিক্ষক প্রশিক্ষণ, পর্যাপ্ত পাইলটিং ও অবকাঠামোগত সক্ষমতার ঘাটতির কারণে ব্যাপক সমালোচনা দেখা দেয়। অনেক অভিভাবক বিভ্রান্ত ও উদ্বিগ্ন হয়ে প্রতিবাদ জানান। পরবর্তী সময়ে অন্তর্বর্তী সরকার নতুন কারিকুলাম স্থগিত করে আগের কাঠামোয় ফিরে যায়। এতে সাময়িক স্বস্তি এলেও শিক্ষা মহলে দীর্ঘমেয়াদি দিকনির্দেশনা নিয়ে প্রশ্ন থেকে যায়।
জাতীয়করণের ফলে সুযোগ বৃদ্ধি পেলেও নতুন সমস্যা তৈরি হয়। নবনিযুক্ত সরকারি কলেজ শিক্ষকদের জ্যেষ্ঠতা, বেতনকাঠামো ও পদোন্নতি–সংক্রান্ত জটিলতা দীর্ঘস্থায়ী অসন্তোষ সৃষ্টি করে। দীর্ঘদিন নিয়োগ বন্ধ থাকায় বহু প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক–সংকট তীব্র হয়। অবসর, মৃত্যু বা পদত্যাগের ফলে শূন্য পদ বাড়লেও নিয়োগ না হওয়ায় পাঠদান ব্যাহত হয় এবং শিক্ষার মান ক্ষতিগ্রস্ত হয়। অনেক প্রতিষ্ঠান অতিথি শিক্ষকের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে, যা শিক্ষার ধারাবাহিকতা ও গুণগত মানের জন্য যথেষ্ট নয়। একই সঙ্গে সরকারি কলেজগুলোতে, বিশেষ করে গ্রামীণ অঞ্চলে, বহু গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষক ও কর্মচারীর পদ দীর্ঘদিন ধরে শূন্য থাকায় পাঠদান ব্যাহত হচ্ছে এবং শিক্ষার মান ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে গভর্নিং বডির সভাপতি বা শিক্ষানুরাগী সদস্য হওয়ার ক্ষেত্রে বর্তমানে ন্যূনতম স্নাতক ডিগ্রি থাকা বাধ্যতামূলক এবং উচ্চ আদালতের রায় অনুযায়ী সংসদ সদস্যদের এই পদে থাকার সুযোগ নেই। তবে বাস্তবতায় অনেক ক্ষেত্রে কাগজে-কলমে ‘শিক্ষানুরাগী’ হলেও পর্যাপ্ত একাডেমিক জ্ঞান ও শিক্ষা প্রশাসনের ধারণা ছাড়া ব্যক্তিদের কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়, ফলে তারা ক্লাসরুম ও পাঠদানপদ্ধতির মতো সূক্ষ্ম বিষয়ে অনধিকার হস্তক্ষেপ করে শিক্ষকদের মনোবল ক্ষুণ্ন করেন এবং প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব আয়ের ব্যবস্থাপনায় আর্থিক অনিয়ম ও স্বচ্ছতার ঘাটতি দেখা দেয়। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় একজন রাজনৈতিক ব্যক্তি বা সংসদ সদস্য গভর্নিং বডির সভাপতি হতে পারলেও তার আওতাধীন প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা সর্বোচ্চ ৩ থেকে ৪টিতে সীমাবদ্ধ রাখা এবং সদস্য নির্বাচনের ক্ষেত্রে শিক্ষাগত যোগ্যতার পাশাপাশি শিক্ষা প্রশাসন ও আর্থিক ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে ন্যূনতম ধারণা নিশ্চিত করতে দায়িত্ব গ্রহণের আগে সংক্ষিপ্ত প্রশিক্ষণ বা ওরিয়েন্টেশন কর্মসূচি চালু করা প্রয়োজন।
নতুন সরকারের কাছে প্রত্যাশিত করণীয়—
১. সমন্বিত ও বাস্তবসম্মত কারিকুলাম
নতুন ও পুরোনো কারিকুলামের ইতিবাচক দিকসমূহ বিশ্লেষণ করে শিক্ষাবিদ, শিক্ষক, অভিভাবক ও শিক্ষার্থীদের মতামতের ভিত্তিতে একটি যুগোপযোগী, আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন ও বাস্তবভিত্তিক কারিকুলাম প্রণয়ন জরুরি। বাস্তবায়নের আগে পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ ও পাইলটিং নিশ্চিত করা উচিত।
২. পৃথক বেতনকাঠামো, প্রণোদনা ও পর্যাপ্ত অর্থায়ন
প্রাথমিক থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায় পর্যন্ত শিক্ষকদের জন্য আকর্ষণীয় ও মর্যাদাপূর্ণ বেতনকাঠামো চালু করা প্রয়োজন। মেধাবীদের শিক্ষকতায় আকৃষ্ট করতে গবেষণা ভাতা, প্রশিক্ষণ ও পেশাগত উন্নয়নের সুযোগ বাড়াতে হবে। পাশাপাশি শিক্ষা খাতে পর্যাপ্ত বাজেট বরাদ্দ নিশ্চিত করে কার্যকর নীতি প্রণয়ন ও তার সঠিক বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা জরুরি।
৩. জাতীয়কৃত প্রতিষ্ঠানের জটিলতা নিরসন
জাতীয়কৃত কলেজ ও বিদ্যালয়ের শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন, জ্যেষ্ঠতা ও পদোন্নতির বিষয়গুলো ন্যায্য ও স্বচ্ছ নীতির মাধ্যমে সমাধান করতে হবে। দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা নিয়োগ দ্রুত চালু করে শিক্ষক–সংকট নিরসন অপরিহার্য।
৪. গবেষণা ও কর্মমুখী শিক্ষা
চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের প্রেক্ষাপটে প্রযুক্তি, কারিগরি ও উদ্ভাবনমূলক শিক্ষায় বিনিয়োগ বাড়ানো জরুরি। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে গবেষণাকেন্দ্রিক প্রতিষ্ঠানে রূপান্তর করতে দীর্ঘমেয়াদি নীতি, গবেষণা তহবিল এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বৃদ্ধি করতে হবে।
৫. প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি
শিক্ষা প্রশাসনে রাজনৈতিক প্রভাব কমিয়ে দক্ষ ও পেশাদার ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে হবে। নিয়োগ, বদলি ও পদোন্নতিতে স্বচ্ছতা প্রতিষ্ঠা শিক্ষাঙ্গনে স্থিতিশীলতা আনবে।
বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা আজ এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে, যেখানে অতীতের অর্জন যেমন গর্বের, তেমনি সীমাবদ্ধতাগুলোও উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। নতুন সরকার যদি সমন্বিত পরিকল্পনা, জাতীয় ঐকমত্য ও গবেষণাভিত্তিক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে এগিয়ে আসে, তবে শিক্ষা খাতই জাতীয় পুনর্জাগরণের প্রধান শক্তি হয়ে উঠতে পারে। কারণ, শিক্ষা কেবল পাঠ্যবই বা পরীক্ষার ফলাফলে সীমাবদ্ধ নয়; এটি মানবসম্পদ উন্নয়ন, নৈতিক মূল্যবোধ গঠন এবং অর্থনৈতিক অগ্রগতির মৌলিক ভিত্তি। তাই শিক্ষা নীতির প্রতিটি সিদ্ধান্ত সুদূরপ্রসারী চিন্তা, অংশগ্রহণমূলক পরামর্শ ও জাতীয় স্বার্থের আলোকে গ্রহণ করা জরুরি। আমরা আশা করি, সরকারের কার্যকর নীতি, পর্যাপ্ত অর্থায়ন ও মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করার মাধ্যমেই টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (SDGS) অর্জন সম্ভব, এবং একটি সমতাভিত্তিক, দক্ষ ও প্রযুক্তিনির্ভর বিশ্বমানের শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলাই এ লক্ষ্য অর্জনের মূল চাবিকাঠি।
*লেখক: শুভাশীষ দাশ, বিভাগীয় প্রধান, ইংরেজি, সরকারি ইকবাল মেমোরিয়াল কলেজ, ফেনী
ই-মেইল: [email protected]