এমন পরিস্থিতিতে ২৮ নভেম্বর এ বছরের এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশ করা হচ্ছে। অবশ্য পরীক্ষার ফলাফল নিয়ে অতিরিক্ত মাতামাতি ও পরীক্ষানির্ভরতা প্রভাবের বিষয়টি এখন সরকারও উপলব্ধি করেছে। এ জন্য আগামী বছর থেকে পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়ন হতে যাওয়া নতুন শিক্ষাক্রমে প্রথাগত পরীক্ষার চেয়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেই ধারাবাহিক মূল্যায়নের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ, এখনকার মতো শুধু কাগজ-কলমনির্ভর পরীক্ষা হবে না। অ্যাসাইনমেন্ট, উপস্থাপন, যোগাযোগ, হাতে–কলমের কাজ—বহুমুখী পদ্ধতি ব্যবহার করে শিক্ষার্থীদের মূল্যায়ন করা হবে।

এ ছাড়া নতুন পদ্ধতির মূল্যায়নে এখনকার মতো জিপিএ–ভিত্তিক ফলাফল প্রকাশ করা হবে না। এর বদলে যোগ্যতা অর্জনে শিক্ষার্থীর পারদর্শিতাকে তিনটি শ্রেণিতে ভাগ করে ফলাফল দেওয়া হবে। এর মধ্যে প্রথম স্তরটিকে বলা হবে পারদর্শিতার প্রারম্ভিক স্তর। দ্বিতীয় স্তরটিকে বলা হবে অন্তর্বর্তী বা মাধ্যমিক স্তর। আর সবশেষ, অর্থাৎ সবচেয়ে ভালো স্তরটিকে বলা হবে পারদর্শী স্তর। অবশ্য, এসএসসিতে নতুন শিক্ষাক্রম চালু হতে আরও কয়েক বছর লাগবে।

দেশের শিক্ষার তথ্য নিয়ে কাজ করা বাংলাদেশ শিক্ষাতথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর (ব্যানবেইস) সর্বশেষ শিক্ষা পরিসংখ্যান প্রতিবেদনে অন্যান্য তথ্যের পাশাপাশি এসএসসিসহ বিভিন্ন পাবলিক পরীক্ষার তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। এ প্রতিবেদনের তথ্য বলছে, সর্বশেষ ২০২১ সালের এসএসসি পরীক্ষায় পাস ছিল ৯৪ দশমিক শূন্য ৮ শতাংশ। গেল বছর এসএসসিতে ১৭ লাখ ৯২ হাজার ৩১২ শিক্ষার্থী পরীক্ষা দিয়ে পাস করেছিল ১৬ লাখ ৮৬ হাজার ২১১ জন। আর ৩১ বছর আগে ১৯৯০ সালের এসএসসিতে পাসের হার ছিল ৩১ দশমিক ৭৩। ওই বছর পরীক্ষার্থী ছিল ৪ লাখ ৩৫ হাজার ৯১৮ জন। তথ্য বলছে, এ সময়ের ব্যবধানে পরীক্ষার্থী বেড়েছে প্রায় ৪ গুণ।

পাসের বৃদ্ধির প্রবণতা ১৯৯০ সালের পর পাঁচ বছর অব্যাহত ছিল। ১৯৯১ সালে পাসের হার দ্বিগুণ (প্রায় ৬৫ শতাংশ) হয়ে যায়। ১৯৯৫ সালে এসে পাস দাঁড়ায় ৭৩ শতাংশের বেশি। বাংলাদেশ পরীক্ষা উন্নয়ন ইউনিটের একজন কর্মকর্তা জানান, নব্বইয়ের দশকের শুরুর দিকে বহুনির্বাচনী প্রশ্ন (এমসিকিউ) পদ্ধতি চালু হয়।

ফলাফলের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, এর পর থেকেই মূলত পাবলিক পরীক্ষায় পাসের হার বাড়তে থাকে। সর্বশেষ ১৯৯৫ সালেও এসএসসিতে একটি বিষয়ে নির্ধারিত ৫০০ (প্রশ্নব্যাংক) এমসিকিউ প্রশ্ন মুখস্থ করতে পারলেই ৫০ নম্বর পাওয়া নিশ্চিত ছিল। এর পরের বছর, অর্থাৎ ১৯৯৬ সাল থেকে ৫০০ প্রশ্নব্যাংকের ব্যবস্থা উঠিয়ে দেওয়া হয়। তবে এমসিকিউ ছিল, কিন্তু নির্ধারিত ছিল না। দেখা গেল, ওই বছর পাসের হার রাতারাতি কমে যায়। তখন পাসের হার কমে দাঁড়ায় ৪২ দশমিক ৬১। ওই সময় প্রশ্নব্যাংক রাখার জন্য শিক্ষার্থীরা দাবি করলেও তা মানা হয়নি। তবে এমসিকিউ রাখা হয়, কিন্তু নির্ধারিত প্রশ্নব্যাংক ছিল না।

শুরুর দিকে মোট নম্বরের মধ্যে অর্ধেক এমসিকিউ এবং অর্ধেক ছিল রচনামূলক প্রশ্ন। এখন রচনামূলক প্রশ্নের জায়গায় সৃজনশীল প্রশ্নপদ্ধতি প্রশ্ন চালু হয়েছে। বর্তমানে পরীক্ষায় প্রতিটি বিষয়ে মোট নম্বরের মধ্যে ৭০ শতাংশ নম্বরের প্রশ্ন সৃজনশীলে এবং ৩০ নম্বরের প্রশ্ন করা হয় এমসিকিউ।

ফলাফল বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, ২০০৮ সাল থেকে আবার পাসের হার বাড়তে শুরু করে। ওই বছর পাসের হার দাঁড়ায় প্রায় ৭১। এরপর ২০১১ সাল থেকে পাস সব সময়ই ৮০ শতাংশের বেশি ছিল, যা গত বছর ৯৪ শতাংশের বেশি হয়।

২০১০ সালের পর কয়েক বছর কেউ কেউ বলতেন, উত্তরপত্র মূল্যায়নে নমনীয়তা পাসের হার বৃদ্ধির একটি কারণ। তবে এ ক্ষেত্রে সৃজনশীল প্রশ্নের ভূমিকা রয়েছে বলে মনে করেন শিক্ষাসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের কেউ কেউ। সৃজনশীল পদ্ধতিতে (কাঠামোবদ্ধ প্রশ্ন) একটি বিষয়কে চার ভাগে ভাগ করে প্রশ্ন করা হয়। প্রতিটি অংশের জন্য আলাদা নম্বর আছে। চারটি অংশের একটি অংশ সঠিক হলে ওই অংশের জন্য নম্বর পাওয়া যায়, যা আগের রচনামূলক প্রশ্নে এ সুযোগ ছিল না। তখন একটি প্রশ্নের উত্তরে কোনো ভুল হলে পুরো প্রশ্নের নম্বর কাটা যেত।

এর মধ্যে ২০০১ সালে পাবলিক পরীক্ষার ফলাফলে সনাতন পদ্ধতিতে নম্বর দেওয়ার পরিবর্তে গ্রেড পদ্ধতি চালু করা হয়। ২০০৩ সালে সর্বোচ্চ ৫ সূচকের (পয়েন্ট বা স্কেল) ভিত্তিতে ফলাফল প্রকাশ করা হয়। দেখা যায়, প্রথম দিকে জিপিএ-৫ খুব কম থাকলেও পরে তা লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়তে থাকে। সর্বশেষ গত বছর শুধু সাধারণ শিক্ষা বোর্ডের অধীন এসএসসিতে ফলাফলের এই সর্বোচ্চ সূচক জিপিএ-৫ পেয়েছিল ১ লাখ ৬৩ হাজারের বেশি শিক্ষার্থী। এ নিয়ে আছে নানা কথা।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে মূল্যায়নবিশেষজ্ঞ এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক এস এম হাফিজুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, পরীক্ষার মূল্যায়ননীতির কারণে পরীক্ষায় পাসের হার বৃদ্ধির ক্ষেত্রে সুযোগ তৈরি হয়েছে। যেমন আগে বাংলায় ৬০ পাওয়াই কঠিন ছিল। এখন এ বিষয়ে ৮০ নম্বরের বেশি পাচ্ছে অসংখ্য শিক্ষার্থী। কিন্তু যেটি হচ্ছে সেটি হলো, উন্নত বিশ্বের শিক্ষার্থীরা এত বেশি এগিয়ে যাচ্ছে, যেটা এ দেশের অধিকাংশ শিক্ষার্থীই পারছে না। ফলে উন্নত বিশ্বের সঙ্গে এ দেশের শিক্ষার্থীদের এক বড় ব্যবধান থেকে যাচ্ছে। আবার এ দেশের শিক্ষার্থীদের মধ্যেই বৈষম্য আছে। কিছু শিক্ষার্থী অনেক বেশি এগিয়ে থাকছে, আবার অনেক শিক্ষার্থী পিছিয়ে থাকছে। তাই মূল্যায়ননীতিতে পরিবর্তন আনতে হবে।