বৃত্তি পরীক্ষার সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার দাবি, অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত অবৈতনিক প্রয়োজন
প্রাথমিক শিক্ষাকে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত উন্নীত করে সেটিকে অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক করার দাবি জানিয়েছে গণসাক্ষরতা অভিযান। বর্তমানে প্রাথমিক শিক্ষা পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত এবং তা অবৈতনিক। এ ছাড়া প্রাথমিকের বৃত্তি পরীক্ষা ও জুনিয়র বৃত্তি পরীক্ষা নেওয়ার সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার দাবি জানানো হয়েছে।
আজ শনিবার জাতীয় প্রেসক্লাবে এক সংবাদ সম্মেলনে এসব দাবিসহ শিক্ষা নিয়ে আরও বিভিন্ন দাবি ও পরামর্শ তুলে ধরেছে শিক্ষা নিয়ে কাজ করা বেসরকারি সংস্থাগুলোর এই মোর্চা। সম্প্রতি শিক্ষা ও প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় ঘোষিত শিক্ষা নিয়ে ১২ দফা প্রতিশ্রুতির বিষয়ে নিজেদের পরামর্শ জানাতে এই সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়।
সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে নিজেদের পরামর্শগুলো তুলে ধরেন গণসাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক ও সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রাথমিক ও গণশিক্ষা উপদেষ্টা রাশেদা কে চৌধূরী। তিনি জানান, ইতিমধ্যে এগুলো সরকারের কাছে দেওয়া হয়েছে।
‘শিক্ষার্থীরা যদি গাইড বই–ই পড়বে, কোচিং সেন্টারেই যাবে, তাহলে স্কুলের দরকার কী?’
শিক্ষা মন্ত্রণালয় ঘোষিত ‘ব্রিজ কোর্স’ (এক ধারা থেকে আরেক ধারায় যাওয়ার পথ সুগম করা ও মাধ্যমিক পর্যায়ে কারিগরি শিক্ষা অন্তর্ভুক্ত করা) প্রসঙ্গে আজ সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে বলা হয় ‘ব্রিজ কোর্স’ চালু করা একটি সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত। তবে শুরুতে প্রাথমিক শিক্ষাকে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত উন্নীত করে সেটিকে অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক করা প্রয়োজন। এরপর যোগ্যতা অনুযায়ী যেকোনো ধরনের পেশাগত (প্রফেশনাল) অথবা বৃত্তিমূলক কোর্সে যুক্ত করা যেতে পারে। এটি নির্বাহী আদেশেই সম্ভব বলে মনে করেন রাশেদা কে চৌধূরী।
বৃত্তি পরীক্ষা পুনর্বিবেচনার আহ্বান
গণসাক্ষরতা অভিযান বলছে, শিক্ষাক্রম ও পরীক্ষার পদ্ধতি ‘রিভিউ’ করার সময় শ্রেণিভিত্তিক ধারাবাহিক মূল্যায়ন নিশ্চিত করার ব্যবস্থা রাখা প্রয়োজন। এর ভিত্তিতে দুর্বল শিক্ষার্থীদের জন্য আলাদা ক্লাসের ব্যবস্থা করা এবং সেসব ক্লাসের শিক্ষকদের অতিরিক্ত প্রণোদনা বা ভাতা দেওয়া যেতে পারে। আর শিক্ষাক্রম ‘রিভিউ’ করার ক্ষেত্রে শিক্ষক, শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও নাগরিক সমাজসহ সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের মতামতের ভিত্তিতে চূড়ান্ত করা দরকার। শিক্ষার্থীরা কোনোভাবেই যেন অসংখ্য পরীক্ষার বেড়াজালে আবদ্ধ হয়ে কোচিং ও গাইড বই–নির্ভর হয়ে না ওঠে, সেদিকে দৃষ্টি দেওয়া সরকারের অগ্রাধিকারে থাকা উচিত।
‘পঞ্চম শ্রেণির বৃত্তি পরীক্ষা বাদ দেওয়া হয়েছিল। এখন বলা হচ্ছে, আবার নেবে। অষ্টম শ্রেণির বৃত্তি পরীক্ষা হয়েছে এবং আবারও হবে। এটা করে আসলে সেই পাবলিক পরীক্ষাকেই ফিরিয়ে আনা হচ্ছে।’
এ বিষয়ে রাশেদা কে চৌধূরী বলেন, পরীক্ষা দিতে দিতে শ্রেণিভিত্তিক ধারাবাহিক মূল্যায়ন গুরুত্বহীন করে ফেলা হয়েছে। তাই এ বিষয়ে গুরুত্ব দিতে হবে।
বৃত্তি পরীক্ষার জন্য শিক্ষার্থীদের কোচিং ও গাইড বই–নির্ভর করে ফেলার প্রসঙ্গ টেনে রাশেদা কে চৌধূরী বলেন, শিক্ষার্থীরা যদি গাইড বই–ই পড়বে, কোচিং সেন্টারেই যাবে, তাহলে স্কুলের দরকার কী? এ জায়গায় এই সরকারকে দৃষ্টি দিতেই হবে। শিক্ষার্থীরা যেন পরীক্ষার্থী হয়ে না যায়।
বৃত্তি পরীক্ষার বিষয়ে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক এবং প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষার মানোন্নয়নে অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত পরামর্শক কমিটির প্রধান মনজুর আহমদ বলেন, অল্প বয়সী শিক্ষার্থীদের জন্য নিচের শ্রেণিগুলোয় পাবলিক পরীক্ষা নয়, এটি বিদ্যালয়ভিত্তিক মূল্যায়ন হওয়া দরকার। পঞ্চম শ্রেণির বৃত্তি পরীক্ষা বাদ দেওয়া হয়েছিল। এখন বলা হচ্ছে, আবার নেবে। অষ্টম শ্রেণির বৃত্তি পরীক্ষা হয়েছে এবং আবারও হবে। এটা করে আসলে সেই পাবলিক পরীক্ষাকেই ফিরিয়ে আনা হচ্ছে।
পর্যালোচনা অনুযায়ী বৃত্তি পরীক্ষায় মানের কোনো উন্নয়ন হয় না উল্লেখ করে অধ্যাপক মনজুর আহমদ বলেন, ১০ থেকে ২০ শতাংশ ভালো শিক্ষার্থী যারা, তাদের একটি পরীক্ষা নিয়ে আরেকটু প্রণোদনা দেওয়া হয়। তারা তো ভালোই করছে, তারা ভালোই আছে। কিন্তু বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী, যারা ভালো নেই, তাদের শিক্ষার মানোন্নয়নের দিকে নজর দেওয়া দরকার। তিনি বলেন ‘আমি বলব, এটি (বৃত্তি পরীক্ষার সিদ্ধান্ত) সুবিবেচনাপ্রসূত হয়নি। এটি সুবিবেচনা করবেন বলে আমি বিশ্বাস করি।’
অন্যান্য দাবি ও পরামর্শ
লিখিত বক্তব্যে তৃতীয় ভাষার শিক্ষা অষ্টম শ্রেণিতে শুরু করা, বাজেট বাস্তবায়নে সক্ষমতা বৃদ্ধি ও স্বচ্ছতা–জবাবদিহি নিশ্চিত করা, মিড ডে মিল ধাপে ধাপে সব বিদ্যালয়গামী শিশুর জন্য নিশ্চিত করা, সমন্বিত শিক্ষা আইন করা, পরামর্শক কমিটির প্রতিবেদনের সুপারিশ বিবেচনা করাসহ আরও বিভিন্ন রকমের পরামর্শ ও দাবি জানিয়েছে গণসাক্ষরতা অভিযান।
শিক্ষা নিয়ে এত দিন ধরে যে অবহেলা চলে আসছে, সেটার অবসান হবে বলে আশা প্রকাশ করেন ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক মনজুর আহমদ। তিনি বলেন, প্রতিশ্রুতির কথা শোনা যাচ্ছে। কিন্তু বাস্তবায়নই বড় বিষয়। পূর্ণাঙ্গ শিক্ষা পরিকল্পনা করতে হবে। এ জন্য বিশেষজ্ঞ বা টাস্কফোর্স গঠন করতে হবে।
অধ্যাপক মনজুর আহমদ বলেন, ‘আমরা শিক্ষা নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গীকার ও প্রতিশ্রুতি চাই যে, শিক্ষাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে, জোর দিতে হবে, বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। শিক্ষাকে ঠিকমতো চালানোর জন্য রাজনৈতিক সমর্থন ও অঙ্গীকার চাই। কিন্তু রাজনৈতিক অপপ্রভাব যেটা আছে, সেটা বন্ধ করতে হবে।’
সংবাদ সম্মেলনে আরও বক্তব্য দেন এডুকেশন ওয়াচের আহ্বায়ক আহমদ মোশতাক রাজা চৌধুরী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক শাহ শামীম আহমেদ, বাংলাদেশ ক্যাথলিক এডুকেশন বোর্ডের সাধারণ সম্পাদক জ্যোতি এফ গমেজ।