শুধু প্রথম শ্রেণি নয়, পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত লটারিতে ভর্তির পরিকল্পনা
প্রথম শ্রেণির পর এবার প্রাথমিকের দ্বিতীয় থেকে পঞ্চম শ্রেণিতেও লটারির মাধ্যমে শিক্ষার্থী ভর্তির পরিকল্পনা করছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। অর্থাৎ ২০২৭ শিক্ষাবর্ষ থেকে প্রাথমিকের প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত কোনো ভর্তি পরীক্ষা না নিয়ে লটারির মাধ্যমেই শিক্ষার্থী ভর্তি করা হতে পারে। তবে মাধ্যমিক স্তরে ভর্তি পরীক্ষা চালুর সিদ্ধান্ত বহাল থাকবে।
প্রথম শ্রেণি বাদে অন্যান্য শ্রেণিতে ভর্তি পরীক্ষা চালুর সিদ্ধান্ত নিয়ে শিক্ষাসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের অনেকের মধ্যে আপত্তি ছিল। কারণ, এ ভর্তি পরীক্ষাকে ঘিরে কোচিং বাণিজ্যের পাশাপাশি শিশুদের ওপর চাপসহ নানামুখী অসুবিধার আশঙ্কা করা হচ্ছিল। পাশাপাশি এত বিপুলসংখ্যক শিশুকে নিয়ে নতুন করে ভর্তি পরীক্ষা আয়োজন করাও শিক্ষা বিভাগের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে।
তাঁরা বিষয়টি পর্যালোচনা করছেন। শিক্ষাসংশ্লিষ্ট অংশীজনদের মতামতের ভিত্তিতেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন
এমন পরিস্থিতিতে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীন বিদ্যালয়গুলোতে প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত ভর্তি আগের মতোই লটারির মাধ্যমেই করার কথা ভাবছেন নীতিনির্ধারকেরা। শিক্ষা বিভাগের ঊর্ধ্বতন দুটি সূত্র প্রথম আলোকে এ পরিকল্পনার কথা জানিয়েছে।
পরিকল্পনাটি বাস্তবায়িত হলে ২০২৭ শিক্ষাবর্ষে প্রাথমিকের কোনো শ্রেণিতেই ভর্তি পরীক্ষা থাকবে না। লটারির মাধ্যমে ভর্তি কার্যক্রম পরিচালিত হবে। তবে মাধ্যমিক স্তরের অন্যান্য শ্রেণিতে ভর্তি পরীক্ষা নেওয়ার সিদ্ধান্ত বহাল থাকবে।
জানতে চাইলে শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন গত সোমবার সচিবালয়ে প্রথম আলোকে বলেন, তাঁরা বিষয়টি পর্যালোচনা করছেন। শিক্ষাসংশ্লিষ্ট অংশীজনদের মতামতের ভিত্তিতেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
গত মার্চে এক সংবাদ সম্মেলনে শিক্ষামন্ত্রী ঘোষণা দিয়েছিলেন, ভর্তিতে লটারির পরিবর্তে ভর্তি পরীক্ষা চালু করা হবে। সে সময় তিনি বলেছিলেন, ‘আমরা লটারি ব্যবস্থা প্রত্যাহার করলাম।’
শিক্ষা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, ভর্তির সময় যেহেতু ঘনিয়ে আসছে তাই এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত দ্রুত নেওয়া দরকার।
এর পর থেকেই শিক্ষাবিদ ও শিক্ষাসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলে আসছিলেন, বিশেষ করে প্রাথমিক স্তরে লটারির পরিবর্তে ভর্তি পরীক্ষা চালু হলে শিশুদের ওপর অপ্রয়োজনীয় চাপ বাড়বে। পাশাপাশি কোচিং ও প্রাইভেটনির্ভরতা নতুন করে বাড়তে পারে, যা শিক্ষাব্যবস্থায় বৈষম্য আরও বাড়াবে। এরই মধ্যে ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতির নামে ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় কোচিং কার্যক্রম শুরুর অভিযোগও উঠেছে।
একসময় বিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষার নামে অল্প বয়সেই শিশুদের কঠিন প্রতিযোগিতার মুখে পড়তে হতো। কোচিং ও প্রাইভেট ছিল সাধারণ ঘটনা। নামী বিদ্যালয়ে সন্তানকে ভর্তি করাতে অনেক পরিবার কোচিং সেন্টারের দ্বারস্থ হতো। ভর্তিকে ঘিরে অনিয়ম, দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতির অভিযোগও ছিল। ফলে সাধারণ ও দরিদ্র পরিবারের অনেক শিক্ষার্থীর জন্য ভালো বিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়া কঠিন হয়ে পড়ত। এ নিয়ে গণমাধ্যমে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা-সমালোচনা হয়েছে।
শিক্ষার্থীদের কথা বিবেচনা করে আমরা ভর্তিতে লটারিকেই শ্রেয়তর পদ্ধতি বলব। তবে এই লটারির স্বচ্ছতা নিয়েও অভিভাবকদের মধ্যে সন্দেহ রয়েছে। তাই পুরো প্রক্রিয়ায় আরও স্বচ্ছতা আনা দরকার।তারিক মনজুর, অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
এমন প্রেক্ষাপটে প্রথমে শুধু প্রথম শ্রেণিতে লটারি পদ্ধতি চালু করা হয়। ২০১১ শিক্ষাবর্ষ থেকে সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোয়, যেসব বিদ্যালয়ে প্রথম শ্রেণি রয়েছে, সেখানে প্রথম শ্রেণিতে ভর্তি পরীক্ষার পরিবর্তে লটারির মাধ্যমে শিক্ষার্থী ভর্তি বাধ্যতামূলক করা হয়। পরের বছর বেসরকারি বিদ্যালয়েও একই পদ্ধতি চালু হয়। তবে দ্বিতীয় থেকে নবম শ্রেণি পর্যন্ত ভর্তি তখনো পরীক্ষার মাধ্যমেই হতো।
পরে করোনাভাইরাসের সংক্রমণের কারণে ২০২১ শিক্ষাবর্ষে সব শ্রেণিতেই লটারির মাধ্যমে শিক্ষার্থী ভর্তি করা হয়। এরপর এই পদ্ধতিই অব্যাহত ছিল।
এখন তাতে পরিবর্তনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে গত ৮ আগস্ট প্রথম শ্রেণির ক্ষেত্রে ভর্তি পরীক্ষার সিদ্ধান্ত বাদ দিয়ে লটারি রাখার কথা জানানো হয়েছে। এখন নতুন পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে প্রথম শ্রেণির পাশাপাশি দ্বিতীয় থেকে পঞ্চম শ্রেণিতেও লটারির মাধ্যমেই ভর্তি নেওয়া হবে। মানে প্রাথমিক স্তরে লটারিতে শিক্ষার্থী ভর্তি করা হবে।
শিক্ষা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, ভর্তির সময় যেহেতু ঘনিয়ে আসছে তাই এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত দ্রুত নেওয়া দরকার।
‘ভর্তিতে লটারিকেই শ্রেয়তর পদ্ধতি বলব’
জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক তারিক মনজুর প্রথম আলোকে বলেন, কোনো কোনো স্কুলে শিক্ষার্থী ভর্তির জন্য অভিভাবকদের অতিরিক্ত আগ্রহ থাকে। সমস্যার শুরু মূলত এখান থেকেই। এটি দূর করতে ‘ভালো’ ও ‘খারাপ’ স্কুলের ব্যবধান কমাতে হবে। আর প্রাথমিক স্তরে শিক্ষার্থী ভর্তির জন্য পরীক্ষা নেওয়া হলে সেই ব্যর্থতা থেকে শিশুবয়সেই শিক্ষার্থীর মধ্যে হীনম্মন্যতা তৈরি হতে পারে। সেটি পরবর্তী জীবনে তার এগিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে বাধা তৈরি করতে পারে। ভর্তি পরীক্ষার বিষয়টি মূলত কোচিং সেন্টার ও এক শ্রেণির শিক্ষকদের দাবি। এই বাণিজ্য এত বড় যে পরীক্ষার পক্ষে সাফাই গাওয়ার ব্যক্তি বা পক্ষের অভাব নেই। এমনও দেখা গেছে, কোনো কোনো শ্রেণির ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্ন ওই শ্রেণির চূড়ান্ত পাঠ শেষে নির্ধারিত যোগ্যতার চেয়েও বেশি। তিনি বলেন, ‘শিক্ষার্থীদের কথা বিবেচনা করে আমরা ভর্তিতে লটারিকেই শ্রেয়তর পদ্ধতি বলব। তবে এই লটারির স্বচ্ছতা নিয়েও অভিভাবকদের মধ্যে সন্দেহ রয়েছে। তাই পুরো প্রক্রিয়ায় আরও স্বচ্ছতা আনা দরকার।’
