স্কুলে ভর্তিতে ক্যাচমেন্ট এলাকা: শিশুর শৈশব ফিরিয়ে দিতে এটিই একমাত্র পথ
বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থায় প্রথম শ্রেণিতে ভর্তির এই সময়টা দেখলে মনটা খারাপ হয়ে যায়। এটা আর শুধু পড়াশোনা শুরু করার ব্যাপার নয়, এটা যেন একটা যুদ্ধক্ষেত্র। লটারি, জাল ঠিকানা, বাবা-মায়ের অসহ্য টেনশন আর শিশুদের ওপর অকাল চাপ—সব মিলে এক বিশাল হাহাকার।
সরকারি হিসাব বলছে, আসছে বছরে প্রায় ১২ লাখ আসনের শিক্ষার্থী ভর্তির প্রক্রিয়া চলছে। ঢাকায় ৪০ শতাংশ আসন ক্যাচমেন্ট এরিয়ায় রাখা হয়েছে, কিন্তু সেটাও পুরোপুরি কাজ করছে না। অভিভাবকেরা ওয়ার্ড কাউন্সিলরের সার্টিফিকেট নিয়ে দৌড়াদৌড়ি করছেন, জাল ঠিকানা বানাচ্ছেন। রাস্তায় যানজট বাড়ছে, শিশুরা সকালে স্কুলে যেতে গিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা আটকে থাকছে, কোচিংয়ের ব্যবসা ফুলে ফেঁপে উঠছে। এই অবস্থা আর চলতে দেওয়া যায় না।
বর্তমান ব্যবস্থার ক্ষতি কতটা গভীর? লটারি বা পরীক্ষার নামে আমরা আমাদের সন্তানদের শৈশব কেড়ে নিচ্ছি। শিক্ষামন্ত্রী বলেছেন, ২০২৭ সাল থেকে আবার পরীক্ষা চালু করবেন। শুনে শিক্ষাবিদেরা আঁতকে উঠেছেন। চার-পাঁচ বছরের বাচ্চাকে কোচিংয়ের জাঁতাকলে ফেলে দেওয়া হবে। বাবা-মায়ের খরচ বাড়বে, শিশুর মানসিক চাপ বাড়বে। ধনী লোকেরা টাকা দিয়ে ‘এলিট’ স্কুলে ঢুকে যাবে, গরিবেরা বাইরে পড়ে থাকবে। ঢাকার মতো শহরে ভর্তির সময় যানজট তো নিত্যদিনের অভিশাপ। এই অসমতা আর অমানবিকতা দেখে আমার মনে হয়, আমরা কি সত্যি সন্তানদের ভবিষ্যৎ চাই, নাকি শুধু নিয়মের জটিলতা বাড়াতে চাই?
আমার নিজের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা উচ্চ শিক্ষার জন্য যখন জাপান আর অস্ট্রেলিয়ায় সুযোগ পেয়েছিলাম, তখন ওখানকার স্কুল ভর্তির ব্যবস্থা দেখে আমি অবাক হয়ে গিয়েছিলাম। শিশুরা কোনো লটারির ভয়ে কাঁপে না, পরীক্ষা দিয়ে মাথা গরম করে না। শুধু বাসায় থাকে বলেই স্কুলে জায়গা পায়। জাপানে পাবলিক স্কুলে রেসিডেন্সি জোনের নিয়ম—একদম সোজা। অস্ট্রেলিয়ায় প্রত্যেক স্কুলের ‘জোন’ ম্যাপ করা আছে। জোনে থাকলে ভর্তি পাক্কা, বাইরে থেকে চাইলে শুধু আসন খালি থাকলে। শিশুরা হেঁটে স্কুলে যায়, বাবা-মা চিন্তা করে না। ফিরে এসে বারবার মনে হয়েছে—আমরা কেন এমন সহজ, ন্যায্য আর মানবিক পথটা নিতে পারি না? সমস্যা তো ইচ্ছার, নিয়মের নয়।
সমাধান কী?
ক্যাচমেন্ট এলাকা নীতি আমার মতে সমাধান একদম সোজা। পুরোপুরি ক্যাচমেন্ট এলাকা বা জোনভিত্তিক ভর্তি চালু করতে হবে। যেখানে স্থায়ী বাসিন্দা, সেখানকার স্কুলেই বাচ্চা পড়বে। আসন বেশি হলে দীর্ঘদিনের বাসের প্রমাণ দেখে পয়েন্ট দেওয়া হবে। এক বছরের বেশি থাকার প্রমাণ—বিদ্যুৎ বিল, গ্যাস বিল, এনআইডি, ড্রাইভিং লাইসেন্স। মায়ের নামে কাগজ থাকলে অতিরিক্ত পয়েন্ট। মোট ১০০ পয়েন্টে স্থান ঠিক হবে। জাল ঠিকানা বানানোর কোনো সুযোগই থাকবে না। এখন যে ৪০ শতাংশ কোটা চলছে, সেটা ভালো শুরু, কিন্তু পুরো আসনকেই জোনভিত্তিক করতে হবে।
উন্নত দেশগুলো কীভাবে করছে?
এটা কোনো স্বপ্নের কথা নয়। যুক্তরাজ্যে ক্যাচমেন্ট এরিয়ার নিয়ম বহু বছর ধরে চলছে। বাসার ঠিকানার প্রমাণ ছাড়া ভর্তিই হয় না। অস্ট্রেলিয়ায় আমি নিজে দেখেছি—স্কুল জোন ম্যাপ দেখে সবাই বোঝে। যুক্তরাষ্ট্রেও একই নিয়ম। ফলে বাচ্চারা হেঁটে স্কুলে যায়, যানজট কমে, এলাকার মানুষ স্কুল নিয়ে চিন্তা করে, স্কুলের মানও উন্নত হয়। জাপানেও তাই। ওখানে শিশুর শৈশব অটুট থাকে, বাবা-মায়ের মাথায় চাপ থাকে না। আমরা কেন এই পথ অনুসরণ করব না?
সরকারের প্রতি আমার আহ্বান সরকার লটারি থেকে জোনিংয়ের দিকে যাচ্ছে, এটা স্বাগত। কিন্তু শুধু নামে করলে হবে না। আমি বলব, এখনই কয়েকটা কাজ করুন: ১. প্রত্যেক স্কুলের জোন ম্যাপ অনলাইনে স্পষ্ট করে দিন। ২. স্থায়ী বাসিন্দার সংজ্ঞা আইন করে ঠিক করুন। ৩. পয়েন্ট সিস্টেম চালু করুন। ৪. শিক্ষা মন্ত্রণালয়, স্থানীয় সরকার আর অভিভাবকদের নিয়ে জাতীয় কমিটি বানান। সব স্কুলের অবকাঠামো আর শিক্ষকের মানও সমান করুন, যাতে কেউ ‘এলিট’ স্কুলের পেছনে ছুটে না বেড়ায়।
শেষ কথা-
এখনই সময় আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, এই নিয়ম শুধু ন্যায্য নয়, এটাই একমাত্র মানবিক পথ। লটারি বাচ্চার ভাগ্যকে তাসের ঘর বানায়। পরীক্ষা ফিরিয়ে আনলে কোচিংয়ের জাঁতাকল শুরু হয়ে যাবে। ক্যাচমেন্ট এলাকার নিয়ম চালু হলে শিশুর শৈশব ফিরে আসবে, এলিট স্কুলের মোহ কমবে, প্রত্যেক স্কুলই ভালো হয়ে উঠবে। বাবা-মায়ের মানসিক শান্তি ফিরবে, রাস্তায় যানজট কমবে। জাপান-অস্ট্রেলিয়ায় যা দেখেছি, সেটা আমাদের এখানেও সম্ভব।
সময় হয়েছে জটিলতা ছেড়ে সোজা পথে হাঁটার। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রতি আহ্বান বলছি—ক্যাচমেন্ট এলাকার নিয়ম পয়েন্ট সিস্টেমসহ পুরোপুরি চালু করুন। এটা কোনো সাধারণ নীতি নয়। এটা আমাদের সন্তানদের প্রতি জাতির ঋণ শোধ করার প্রথম ধাপ। এখনই না জাগলে আগামী প্রজন্মের শৈশব চিরকালের জন্য হারিয়ে যাবে।
শান্তির দরজা খুলতে এখনই পা বাড়ান। শিশুরা আমাদের ভবিষ্যৎ। তাদের আর যুদ্ধের মাঠে ফেলবেন না।
লেখক: আবদুল্লাহ আল মামুন, অধ্যাপক, ফোকলোর অ্যান্ড সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়