লটারি পদ্ধতিতে হোক শিক্ষার্থীদের ভর্তি
ভর্তি পরীক্ষা নিয়ে বহুদিন ধরেই আলোচনা ছিল, কীভাবে শিশুদের স্কুলে ভর্তি করানো হবে। শেষ পর্যন্ত লটারি পদ্ধতি বেচে নেওয়া হয়, যা অনেকের কাছে গ্রহণযোগ্য হয়। সমতা ও মানবিকতার পথে লটারি পদ্ধতি খুবই গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে আবির্ভূত হয়। এভাবেই চলে প্রাথমিকে ভর্তি কার্যক্রম। হঠাৎ সংসদে এক সংসদ সদস্যের বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে আবার ভর্তি পরীক্ষার বিষয়টি নতুনভাবে আলোচনায় আসে। পরবর্তী সময় দেখা গেল, শিক্ষা মন্ত্রণালয় লটারি পদ্ধতি বাদ দিয়ে ভর্তি পরীক্ষার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের ভর্তিপ্রক্রিয়া সম্পন্ন করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন, যা গণমাধ্যমে আসতে ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দেয়।
শিক্ষা মানুষের মৌলিক অধিকার। সেই শিক্ষার প্রথম ধাপ স্কুলে ভর্তি। যদি সেই পদক্ষেপ প্রতিযোগিতা, মানসিক চাপ ও বৈষম্যের সূতিকাগার হয়ে ওঠে, তাহলে তা একটি সুস্থ সমাজ গঠনের পথে বড় অন্তরায়। সাম্প্রতিক সময়ে কচিকাঁচাদের মেধার ভিত্তিতে ভর্তি করানোর প্রস্তাব নিয়ে যে আলোচনা চলছে, তা নতুন নয়; তবে এ প্রস্তাবের ভেতরে থাকা বাস্তবতা ও প্রভাব গভীরভাবে বিশ্লেষণ করা জরুরি। শুধু পরিবর্তনের জন্য পরিবর্তন এই মানসিকতা থেকে বেরিয়ে এসে আমাদের উচিত কার্যকর ও মানবিক পদ্ধতিকে মূল্যায়ন করা।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যেও লটারি পদ্ধতি সমান প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র তৈরি করেছে। আগে ভালো শিক্ষার্থী বেছে নিয়ে ভালো ফলাফল করা সহজ ছিল। কিন্তু এখন প্রতিষ্ঠানগুলোকে বিভিন্ন মানের শিক্ষার্থী নিয়ে কাজ করতে হচ্ছে, তাদের গড়ে তুলতে হচ্ছে। প্রকৃত শিক্ষাগত সাফল্য এখানেই—শিক্ষার্থীদের উন্নয়নে প্রতিষ্ঠানের অবদান কতটা, সেটাই আসল মানদণ্ড হওয়া উচিত।
লটারি পদ্ধতিতে ভর্তি চালুর অন্যতম বড় অর্জন হলো শিশুদের ওপর অপ্রয়োজনীয় মানসিক চাপ হ্রাস। অল্প বয়সেই ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতি, কোচিং, প্রতিযোগিতা—এই সব শিশুদের স্বাভাবিক বিকাশে বাধা সৃষ্টি করে। আর সরকারকে একটি বিষয়ের ওপর খুবই গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে। কারণ, কোচিং সেন্টার চালু থাকলে কাদের লাভ হবে, সেটাও তাৎপর্যপূর্ণ। সমাজে অভিযোগ রয়েছে, কোচিং সেন্টারের মাধ্যমে একটি দল শিক্ষার্থীদের রাজনৈতিক ব্রেন ওয়াশ করে থাকে, যা কোনোভাবেই কাম্য নয়। শুধু সিদ্ধান্ত নিলে হবে না, এর নেতিবাচক প্রভাবও বিবেচনার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
ভয় ও উদ্বেগমুক্ত পরিবেশে বেড়ে ওঠা একটি শিশুর জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। লটারি পদ্ধতি সেই পরিবেশ নিশ্চিত করতে সহায়ক ভূমিকা রাখে। এ পদ্ধতি সামাজিক সমতা প্রতিষ্ঠায়ও কার্যকর। আগে ভর্তি পরীক্ষাকে কেন্দ্র করে ধনী ও প্রভাবশালী পরিবারগুলো নানা উপায়ে সুবিধা আদায় করত। অন্যদিকে দুর্বল ও প্রান্তিক পরিবারের শিশুরা পিছিয়ে পড়ত শুরুতেই। লটারি পদ্ধতি সেই বৈষম্য অনেকাংশে কমিয়ে এনেছে। এটা ছিল গত সরকারের ইতিবাচক পদক্ষেপ। এতে করে সব শিক্ষার্থী একই জায়গা থেকে তাঁদের শিক্ষাজীবন শুরু করার সুযোগ পাচ্ছে, যা একটি ন্যায্য ও অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গঠনের জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয়।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, লটারি পদ্ধতির মাধ্যমে কোচিং বাণিজ্যের প্রভাব কমেছে। ভর্তি পরীক্ষাকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা কোচিং সংস্কৃতি শুধু অর্থনৈতিক চাপই তৈরি করত না, বরং শিশুর শৈশবকে সংকুচিত করত। এখন অভিভাবকদের মধ্যে সেই অস্বাস্থ্যকর প্রতিযোগিতার প্রবণতাও অনেকটা কমেছে। শিশুদের অকালেই সব শেখাতে হবে—এই মানসিকতা থেকে সমাজ ধীরে ধীরে বেরিয়ে আসছে।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যেও লটারি পদ্ধতি একটি সমান প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র তৈরি করেছে। আগে ভালো শিক্ষার্থী বেছে নিয়ে ভালো ফলাফল করা সহজ ছিল। কিন্তু এখন প্রতিষ্ঠানগুলোকে বিভিন্ন মানের শিক্ষার্থী নিয়ে কাজ করতে হচ্ছে, তাদের গড়ে তুলতে হচ্ছে। প্রকৃত শিক্ষাগত সাফল্য এখানেই, শিক্ষার্থীদের উন্নয়নে প্রতিষ্ঠানের অবদান কতটা, সেটাই আসল মানদণ্ড হওয়া উচিত।
তবে লটারি পদ্ধতিকে আরও কার্যকর করতে কিছু বাস্তবসম্মত সংযোজন করা যেতে পারে। যেমন: স্থানীয় শিক্ষার্থীদের অগ্রাধিকার দেওয়া। এতে করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও স্থানীয় সম্প্রদায়ের মধ্যে একটি সুস্থ সম্পর্ক গড়ে উঠবে এবং শিক্ষার্থীদের যাতায়াতসহ বিভিন্ন বাস্তব সমস্যা কমে আসবে। বিশ্বের উন্নত শিক্ষা ব্যবস্থাগুলোর দিকে তাকালে একটি বিষয় স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয়,প্রাথমিক স্তরে ভর্তি পরীক্ষার মাধ্যমে শিশুদের বাছাই করার প্রবণতা ক্রমেই কমে আসছে। বরং অধিকাংশ দেশই এই পর্যায়ে সমতা, অন্তর্ভুক্তি এবং মানসিক সুস্থতাকে অগ্রাধিকার দিয়ে বিকল্প পদ্ধতি অনুসরণ করছে।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যেও লটারি পদ্ধতি সমান প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র তৈরি করেছে। আগে ভালো শিক্ষার্থী বেছে নিয়ে ভালো ফলাফল করা সহজ ছিল। কিন্তু এখন প্রতিষ্ঠানগুলোকে বিভিন্ন মানের শিক্ষার্থী নিয়ে কাজ করতে হচ্ছে, তাদের গড়ে তুলতে হচ্ছে।
উদাহরণস্বরূপ, ফিনল্যান্ডের শিক্ষাব্যবস্থা বিশ্বব্যাপী প্রশংসিত। সেখানে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তির জন্য কোনো ধরনের পরীক্ষা নেওয়া হয় না। শিক্ষার্থীরা সাধারণত নিজ নিজ এলাকার নিকটবর্তী বিদ্যালয়ে ভর্তি হয় এবং সব স্কুলের মান প্রায় সমান রাখার কারণে অভিভাবকদের মধ্যেও অতিরিক্ত প্রতিযোগিতার প্রবণতা দেখা যায় না। একইভাবে নরওয়ে ও সুইডেনেও স্থানীয়তার ভিত্তিতে ভর্তি নিশ্চিত করা হয়, যেখানে অতিরিক্ত আবেদন হলে লটারির মাধ্যমে শিক্ষার্থী নির্বাচন করা হয়। এসব দেশে শিশুদের ওপর অপ্রয়োজনীয় একাডেমিক চাপ সৃষ্টি না করে তাদের স্বাভাবিক বিকাশ নিশ্চিত করাকেই বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়।
অন্যদিকে কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্রে সরকারি স্কুলগুলোয় সাধারণত নির্দিষ্ট ভৌগোলিক সীমানা অনুসরণ করা হয়। ফলে কোনো ভর্তি পরীক্ষা ছাড়াই শিক্ষার্থীরা তাদের এলাকার স্কুলে ভর্তি হওয়ার সুযোগ পায়। যুক্তরাষ্ট্রের কিছু চার্টার স্কুলে অতিরিক্ত আবেদন হলে লটারির ব্যবস্থাও রয়েছে, যা সমান সুযোগ নিশ্চিত করার একটি কার্যকর পদ্ধতি হিসেবে বিবেচিত। একইভাবে যুক্তরাজ্যে এ প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তির ক্ষেত্রে নিকটতা, পারিবারিক সংযোগ (যেমন একই স্কুলে ভাইবোনের উপস্থিতি) ইত্যাদি বিষয় বিবেচনা করা হয়; তবে সাধারণভাবে কোনো ভর্তি পরীক্ষা নেওয়া হয় না।
এ ছাড়া জাপানের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোয়ও ভর্তিপ্রক্রিয়া মূলত স্থানীয়তার ভিত্তিতে পরিচালিত হয়, যেখানে শিশুদের জন্য কোনো প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষা নেই। এর ফলে শিক্ষার্থীরা অল্প বয়সেই পরীক্ষার চাপ থেকে মুক্ত থেকে একটি স্বাভাবিক ও আনন্দময় শিক্ষাজীবন শুরু করতে পারে।
এসব উদাহরণ থেকে স্পষ্ট যে প্রাথমিক স্তরে ভর্তি পরীক্ষার পরিবর্তে লটারি, ক্যাচমেন্ট এরিয়া বা ওপেন অ্যাডমিশনের মতো পদ্ধতি আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে। কারণ, এ বয়সে শিশুদের মধ্যে মেধার প্রতিযোগিতা তৈরি করার চেয়ে তাদের জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করা, মানসিক চাপমুক্ত পরিবেশ সৃষ্টি করা এবং শিক্ষার প্রতি ইতিবাচক মনোভাব গড়ে তোলাই অধিক গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটেও এই বাস্তবতা বিবেচনায় রেখে ভর্তি পরীক্ষার পরিবর্তে লটারি পদ্ধতিকে আরও উন্নত ও কার্যকর করার দিকেই গুরুত্ব দেওয়া সময়ের দাবি।
সার্বিক অর্থে, শিক্ষাব্যবস্থার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে আবেগ নয়, প্রয়োজন তথ্যভিত্তিক বিশ্লেষণ ও দূরদর্শিতা। লটারি পদ্ধতি নিখুঁত না হলেও এটি একটি মানবিক, অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং বৈষম্যহীন শিক্ষাব্যবস্থা গঠনের পথে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। তাই ভর্তি পরীক্ষার প্রতিযোগিতামূলক চাপের দিকে ফিরে না গিয়ে, লটারি পদ্ধতিকে আরও উন্নত ও কার্যকর করার দিকেই আমাদের মনোযোগ দেওয়া উচিত।
লেখক: সহযোগী অধ্যাপক, হিসাববিজ্ঞান ও তথ্য পদ্ধতি বিভাগ, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়, ময়মনসিংহ।