বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী ভর্তির উত্তম ব্যবস্থা পরীক্ষা না লটারি?
বাংলাদেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের ভর্তির ক্ষেত্রে সর্বজন গ্রহণযোগ্য বা সর্বোত্তম নীতিমালা প্রণয়ন ও অনুসরণ প্রায় অসম্ভব। কেননা আমাদের শিক্ষার্থীদের পারিবারিক বৈষম্য এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর মানের অসমতা চরমভাবে বিদ্যমান। তা ছাড়া আমাদের বিভিন্ন ধরনের অশুভ ক্রিয়াকলাপ ও অসুস্থ প্রতিযোগিতা ভালো পদক্ষেপগুলোর মারাত্মক অন্তরায়। এসব বিষয় সার্বিক বিবেচনায় শিক্ষার্থী ভর্তির ক্ষেত্রে তুলনামূলক ভালো হিসেবে ২০১১ সাল থেকে প্রথম শ্রেণিতে এবং ২০২১ সাল থেকে দ্বিতীয়-নবম শ্রেণিতে লটারি পদ্ধতি চলমান ছিল। দেশের বাস্তবতা বিবেচনা করে অনেক শিক্ষক, শিক্ষাবিদ, শিক্ষাচিন্তক ও সাধারণ অভিভাবকেরা লটারির মাধ্যমে শিক্ষার্থী ভর্তির ব্যবস্থাটি উত্তম বিকল্প মনে করে মেনে নিয়েছিলেন। যদিও কতিপয় স্কুল ও কোচিং সেন্টারের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিরা এতে নাখোশ ছিলেন। বর্তমান সরকারের শিক্ষামন্ত্রী সম্প্রতি ঘোষণা করেছেন, আগামী দিনে লটারির মাধ্যমে আর শিক্ষার্থী ভর্তি করা হবে না। ভর্তি পরীক্ষার মাধ্যমে মেধা যাচাই করে সব শ্রেণিতে শিক্ষার্থী ভর্তি করা হবে। তাই বিষয়টি এখন আলোচনায় এসেছে। অনেকেই মনে করেন, এ বিষয়ে সব দিক পর্যালোচনা করে আরও ভেবেচিন্তে সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করা উচিত। বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় গভীরভাবে পর্যালোচনার দাবি রাখে।
পরিবার হচ্ছে শিশুর প্রথম বিদ্যালয়। প্রতিটি শিশু জন্মগতভাবে সেই বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী এবং মা-বাবা ও নিকটজন সেই বিদ্যালয়ের সার্বক্ষণিক শিক্ষক। যে শিশুর পরিবার সচ্ছল ও পরিবারের সদস্যরা শিক্ষিত, সে শিশুর পারিবারিক শিক্ষা ওই শিশুর তুলনায় অধিক সমৃদ্ধ যে শিশুর পরিবার দরিদ্র ও সদস্যরা অশিক্ষিত বা স্বল্পশিক্ষিত। দেশের অধিকাংশ শিশুর পারিবারিক পরিবেশ অনুকূলে না থাকায়, অর্থাৎ অর্থের অভাব, পুষ্টির অভাব, শিক্ষার অভাব থাকায় তাদের বয়সের তুলনায় কাঙ্ক্ষিত শিক্ষা অর্জন বিলম্বিত হয়। যে শিশুর অগণিত প্রশ্নের সঠিক উত্তর মা-বাবা ও নিকটজন দিতে পারেন না, তার হাতের কাছে শিক্ষা উপকরণ জমা রাখতে পারেন না, তাকে শিক্ষণীয় স্থানে বেড়াতে নিয়ে যেতে পারেন না, সে শিশুর জানার সুযোগ সীমিত থাকে, আগ্রহ দমিত হয়, মেধার বিকাশ ব্যাহত হয়। ফলে তারা সচ্ছল ও শিক্ষিত পরিবারের শিশুদের তুলনায় অনেক পিছিয়ে থাকে। এই পিছিয়ে থাকা কমপক্ষে প্রাথমিক স্তর পর্যন্ত বজায় থাকে। কারও কারও ক্ষেত্রে এটি আরও দীর্ঘায়িত হয়। প্রকৃতপক্ষে পারিবারিক শিক্ষায় তারা বিস্তর বৈষম্যের শিকার। তাই বিভিন্ন ধরনের পরিবার থেকে আগত শিশুদের আনুষ্ঠানিক শিক্ষায় ভর্তির উদ্দেশ্যে মেধা যাচাই বা শিক্ষা মূল্যায়নের জন্য একই মানদণ্ডের আনুষ্ঠানিক প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করানো মোটেও মানবিক নয়, ন্যায়সংগত নয়।
শিশুদের বিদ্যালয়ে ভর্তির জন্য প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করতে হলে ব্যাপক প্রস্তুতি নেওয়ার বিষয় থাকে। এখানেও সচ্ছল-শিক্ষিত পরিবার এগিয়ে থাকে। সাধারণত ভর্তি পরীক্ষার কোনো সিলেবাস থাকে না। তাই শিশুদের অনেক বেশি শিক্ষা দেওয়ার জন্য অভিভাবকেরা মরিয়া হয়ে ওঠেন। শিশুদের নিয়ে ভর্তি কোচিং সেন্টারে ছুটতে থাকেন, বাসায় শিক্ষক রাখেন, অনেক অর্থ ব্যয় করেন, নিজেরাও পড়াতে থাকেন। ঘুমানোর আগে পড়ান, খাবার টেবিলে পড়ান, যানবাহনে পড়ান, খেলার সময়ও পড়ান! বিশ্রাম নেই, খেলাধুলা নেই, বেড়ানো নেই, আনন্দ নেই! তথাকথিত ভালো স্কুলে ভর্তি করার জন্য তুলাধোনা করে ফেলেন শিশুর জীবন!
অতীত অভিজ্ঞতা থেকে এটি প্রায় নিশ্চিত বলা যায় যে ভর্তি পরীক্ষার মাধ্যমে শিক্ষার্থী বাছাইয়ের ক্ষমতা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কাছে দেওয়া হলে অনেক ধরনের অনিয়ম ও দুর্নীতির আশঙ্কা থাকে। একদিকে সচ্ছল অভিভাবকেরা টাকা দিয়ে সন্তানের প্রস্তুতি কেনেন। কাঁড়ি কাঁড়ি টাকার প্রাইভেট/কোচিং–বাণিজ্য হয়। প্রশ্ন কেনাবেচা ও ডোনেশন নেওয়ার খবরও চাউর হয়। স্কুলের কতিপয় শিক্ষক কোচিংয়ে যুক্ত হন। সরকারি আমলা, দলের নেতা-কর্মী ও কমিটির লোকজন প্রভাব বিস্তার করেন। প্রয়োজনের অতিরিক্ত ওয়েটিং লিস্ট তৈরি করা হয়। শূন্য আসনের চেয়ে বেশি শিক্ষার্থী ভর্তি করা হয়। এসব দৌড়েও সাধারণ পরিবারের শিশুরা পিছিয়ে থাকে।
এমন অনেক অভিভাবক আছেন, যাঁরা তাঁদের সন্তানকে ভর্তি পরীক্ষায় এগিয়ে রাখার জন্য বয়সের তুলনায় নিচের ক্লাসে ভর্তির ফরম পূরণ করে থাকেন। এ কাজ করতে গিয়ে শিশুর জন্মনিবন্ধন সনদ পরিবর্তন করে বয়স কমিয়ে দেন। অর্থাৎ একটি নকল জন্মতারিখ নির্ধারণ করে দেন। শিশু বুঝতে পারে, বাড়তি সুবিধা নেওয়ার জন্য এটি করা হয়েছে। লটারিতে ভর্তির ক্ষেত্রে এমন অনৈতিক কাজ তুলনামূলক অনেক কম হয়ে থাকে। কেননা সেখানে শিশুকে স্কুলে ভর্তির আগেই, লেখাপড়া করার আগেই, শিক্ষাগত যোগ্যতা প্রমাণের প্রতিযোগিতায় নামতে হয় না।
ভর্তি পরীক্ষা লিখিত হলে শিশুদের জন্য, বিশেষ করে দরিদ্র ও অশিক্ষিত বা স্বল্পশিক্ষিত পরিবারের পিছিয়ে পড়া শিশুদের জন্য এগিয়ে থাকা কঠিন হয়। আবার সম্পূর্ণ/আংশিক অলিখিত হলেও ক্ষমতাবান বা তদবিরকারীদের এগিয়ে থাকার সম্ভাবনা বেড়ে যায়। তা ছাড়া তুলনামূলকভাবে অধিক সচ্ছল ও শিক্ষিত পরিবারের শিশুরা অধিক তথ্যবহুল থাকে, ফরমাল ব্যবহারে অভ্যস্ত থাকে, যোগাযোগদক্ষতায় এগিয়ে থাকে, অধিক আত্মবিশ্বাসী থাকে; তাই তারা তুলনামূলক কম মেধাবী হলেও সাক্ষাৎকারে বা মৌখিক পরীক্ষায় ভালো করার সম্ভাবনা আরও বেশি থাকে। অর্থাৎ ভর্তি পরীক্ষা লিখিত হোক, মৌখিক হোক, সহজ/কঠিন যা–ই হোক, পিছিয়ে পড়া পরিবারের শিশুদের পিছিয়ে পড়ার আশঙ্কাই সর্বাধিক।
পরীক্ষার প্রস্তুতি নেওয়ার সময় শিশুরা কোনো একটি বা দুটি স্কুলে ভর্তির টার্গেট করে লেখাপড়া করতে থাকে, পরিশ্রম করতে থাকে, স্বপ্ন দেখতে থাকে। নির্ঘুম, নিরলস প্রস্তুতি নিতে নিতে সে নিজেকে কল্পনা করে কাঙ্ক্ষিত স্কুলের শিক্ষার্থী হিসেবে। মনে মনে পরিধান করে ওই স্কুলের ড্রেস, ভাবে কাঙ্ক্ষিত ক্লাসের সক্রিয় শিক্ষার্থী, কাঁধে নেয় বই-খাতার ব্যাগ, ছোটাছুটি করে মাঠে–বারান্দায়। কিন্তু পরীক্ষার পর যদি তার ভর্তির সুযোগ না হয়, তাহলে ভেঙে চুরমার হয়ে যায় তার স্বপ্ন, তছনছ হয়ে যায় তার কোমল হৃদয়! হতাশায় নিমজ্জিত হয়ে যায় কেউ কেউ। অথচ লটারিতে ভর্তির ক্ষেত্রে এমনটি হয় না। কেননা তখন অনেকগুলো প্রতিষ্ঠানে ভর্তির জন্য অনলাইনে আবেদন করেন শিশুর অভিভাবক। অধিকাংশ শিশুই জানে না তার আবেদন করা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর নাম। বোনে না কোনো নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হওয়ার স্বপ্ন। তীব্র থাকে না স্বপ্নভঙ্গের বিষয়। লটারির মাধ্যমে পেয়ে যায় যেকোনো একটি প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হওয়ার সুযোগ। সেটিকেই আপন করে নেয় সে।
যেসব ভালো স্কুলে ভর্তি হওয়ার জন্য এত প্রতিযোগিতা, এত আলোচনা, এত পদ্ধতির প্রবর্তন, সে ভালো স্কুল বলতে আসলে কী বোঝায়? সেসব স্কুলের শিক্ষার্থীরা কি শুধু স্কুলে পড়েই ভালো রেজাল্ট করে? সেসব প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকেরা কি সরকারি স্কুলের শিক্ষক থেকেও অধিক যোগ্য? তাঁদের সবার পাঠদানের কৌশল কি সবচেয়ে বেশি উন্নত? কোনো অখ্যাত প্রতিষ্ঠানের সব শিক্ষার্থী তাঁদের প্রতিষ্ঠানে এনে ভর্তি করে দিলে তাঁরা কি সবার রেজাল্ট ভালো করাতে পারবেন? এসব প্রশ্নের উত্তর যদি হ্যাঁ হয়, তো সেসব স্কুলের আশেপাশে এত প্রাইভেট/কোচিং কেন হয়? তাদের শিক্ষকেরা কেন প্রাইভেট পড়ান? তাদের শিক্ষার্থীদের কেন সবচেয়ে বেশি প্রাইভেট পড়তে হয়? আসলে তথাকথিত ভালো স্কুলগুলো মূলত ভালো শিক্ষার্থীদের স্কুল। তারা ভর্তি পরীক্ষার মাধ্যমে বাছাই করা ভালো শিক্ষার্থী ভর্তি করে এবং পরে কোনো কারণে বিভিন্ন পর্যায়ে যারা সামান্য খারাপ করে, তাদের ভালো করার সফল চেষ্টা না করে স্কুল থেকে বের করে দেয়। ওই সব বাছাই করা এবং বারবার ছাঁকনি করা শিক্ষার্থীদের নিজস্ব প্রচেষ্টায় ও তাদের অভিভাবকদের বিস্তর যত্নে ও অর্থ ব্যয়ে তারা ভালো ফল করে থাকে। সুনাম প্রতিষ্ঠানের ভাগে যায়। সে প্রতিষ্ঠানই ভালো স্কুল বা কলেজ বলে খ্যাত হয়। এখানে আরও অধিক শিক্ষার্থী ভর্তির জন্য হুমড়ি খেয়ে পড়ে। আসলে লটারির মাধ্যমে সাধারণ শিক্ষার্থীদের ভর্তি করে শুধু ক্লাসে পাঠদান করে তারা যদি সবার ফল ভালো করাতে পারে, তবেই তাদের ভালো প্রতিষ্ঠান বলে আখ্যায়িত করা উচিত নয় কি?
একই শ্রেণিকক্ষে সব শিক্ষার্থীর মেধা ও মনোযোগ উত্তম হলে তারা নিজের চেষ্টায় সিলেবাসভুক্ত শিক্ষায় এগিয়ে থাকে (শিক্ষকের পরিশ্রম কম লাগে), এ কথা সত্য। তবে এসব শিক্ষার্থী পারস্পরিক সহযোগিতার চেয়ে প্রতিযোগিতায় ও প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বেশি লিপ্ত হয়ে থাকে। শিক্ষার্থীদের এমন মানসিকতা গঠন কাম্য নয়। অপর দিকে একই শ্রেণিকক্ষের শিক্ষার্থীদের মেধা ও মনোযোগ কমবেশি হলে শিক্ষকদের নির্দেশনায় দুর্বল শিক্ষার্থীরা সবল শিক্ষার্থীদের সঙ্গে জোড়ায় বা দলে মিলিত হয়ে সহযোগিতা নিয়ে শিখনঘাটতি পূরণ করতে পারে। এতে পারস্পরিক সহমর্মিতা ও সহযোগিতামূলক মনোভাব তৈরি হয়, যা বর্তমান অস্থির সমাজের জন্য খুব বেশি প্রয়োজন। মনে রাখতে হবে, যেসব দেশে ক্যাচমেন্ট এরিয়াভিত্তিক শিক্ষার্থী ভর্তি কার্যকর, সেখানেও একই এলাকার সবল ও দুর্বল—উভয় ধরনের শিক্ষার্থী একই ক্লাসে ভর্তি হয়, অধ্যয়ন করে। হাতে গোনা কিছু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বাছাই করা কিছু শিক্ষার্থী ভর্তি করে সবাই মিলে বাড়তি পরিচর্যা করে ভালো রেজাল্ট করানো এবং অন্যান্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিশুশিক্ষার্থীদের প্রতি অবহেলা দেখানো চরম বৈষম্যমূলক আচরণ! আদর্শ রাষ্ট্র ও সমাজ এমন ব্যাপক বৈষম্যমূলক আচরণ কোনোভাবেই সমর্থন করতে পারে না।
উন্নত দেশের মতো আমাদের দেশের সব এলাকায় সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সার্বিক মান সমান বা কাছাকাছি না থাকার কারণে ক্যাচমেন্ট এরিয়াভিত্তিক ভর্তির বিষয়টি সফলভাবে কার্যকর করা সম্ভব নয়। এ অবস্থার উন্নয়নে সদিচ্ছা থাকলেও সেটি অনেক ব্যয় ও সময়সাপেক্ষ। কেননা সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মান সমান বা কাছাকাছি করার জন্য উন্নত শিক্ষানীতি প্রণয়ন, অবকাঠামোগত উন্নয়ন, উত্তম পরিচালনা কমিটি গঠন, অত্যন্ত দক্ষ প্রতিষ্ঠানপ্রধান নিয়োগ, অধিক বেতনে সর্বাধিক যোগ্য শিক্ষক নিয়োগ, শিক্ষকদের দক্ষতা ক্রমাগত বৃদ্ধি, আধুনিক শিক্ষা উপকরণ প্রয়োগ, শিক্ষার অনুকূল পরিবেশ নিশ্চিতকরণ অত্যাবশ্যক। সে পর্যন্ত আমাদের শিক্ষার্থী ভর্তির ক্ষেত্রে, বিশেষ করে প্রাথমিক পর্যায়ে শিক্ষার্থী ভর্তির ক্ষেত্রে আলোচিত সব দিক বিবেচনায় লটারি ব্যবস্থাই উত্তম বলে প্রতীয়মান হয়।
লেখক: মো. রহমত উল্লাহ, সাবেক অধ্যক্ষ, কিশোলয় বালিকা বিদ্যালয় ও কলেজ, তাজমহল রোড, মোহাম্মদপুর, ঢাকা-১২০৭