অনুমোদনের আগেই বিভাগে ৬ কোটি টাকার ল্যাব স্থাপন

বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের ‘অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ’ একটি প্রতিষ্ঠানকে এ কাজে সুবিধা দেওয়া হয় বলে ইউজিসির কমিটির কাছে ‘প্রতীয়মান’ হয়েছে।

  • বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাড়া করা ভবনে সংশ্লিষ্ট বিভাগ চালু করার মতো অবকাঠামোগত সুবিধা নেই।

  • রাষ্ট্রের অর্থ ব্যয়ে আরও সচেতন ও দায়িত্বশীল হওয়ার জন্য নির্দেশনা দেওয়ার সুপারিশ।

বিভাগ ও সিলেবাসের অনুমোদন নেই। কবে অনুমোদন পাওয়া যাবে, তা-ও জানে না বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। তবে এরপরও প্রায় ছয় কোটি টাকার ল্যাবরেটরি স্থাপন করা হয়েছে। বিল পরিশোধ করা হয়েছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে।

এ ঘটনা ঘটেছে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ডিজিটাল ইউনিভার্সিটিতে। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) গঠিত কমিটির প্রতিবেদনে এই অনিয়ম তুলে ধরা হয়েছে।

ইউজিসির তদন্ত কমিটি বলছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাড়া করা ভবনে সংশ্লিষ্ট প্রোগ্রাম বা বিভাগ চালু করার মতো অবকাঠামোগত সুবিধা নেই। এরপরও ৫ কোটি ৯৪ লাখ ৬৪ হাজার টাকায় তথ্যপ্রযুক্তিভিত্তিক ‘বিগ ডেটা ল্যাব’ স্থাপন করা হয়েছে। এই কাজের মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের ‘অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ’ একটি প্রতিষ্ঠানকে সুবিধা দেওয়া হয়েছে।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ডিজিটাল ইউনিভার্সিটি একটি বিশেষায়িত সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়। বিশ্ববিদ্যালয়টির ক্যাম্পাস গাজীপুরের কালিয়াকৈরে। বর্তমানে ভাড়া করা ভবনে কার্যক্রম চলছে। এর নগর কার্যালয় রাজধানীর মোহাম্মদপুরের ইকবাল রোডে। ইউজিসি সূত্র জানায়, ‘ব্যাচেলর অব সায়েন্স ইন ডেটা ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড অ্যানালিটিকস’ চালুর জন্য আবেদন করেছিল বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। তবে এ অনুমোদন পাওয়ার আগেই গত বছর ‘বিগ ডেটা ল্যাব (ফেজ-১)’ স্থাপন করা হয়েছে। এই ল্যাব স্থাপন যথাযথ হয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখেছে ইউজিসির সদস্য অধ্যাপক আবু তাহেরের নেতৃত্বে তিন সদস্যের কমিটি।

অনুমোদন না পাওয়ার বিষয়টি স্বীকার করে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক মুনাজ আহমেদ নূর প্রথম আলোকে বলেন, প্রায় আড়াই বছর আগে ইউজিসির কাছে তাঁরা আবেদন করেছিলেন। তবে ল্যাব স্থাপনের বাজেট অনুমোদন ইউজিসিই দিয়েছে বলে জানান তিনি।

অনুমোদন না হওয়ায় এখন ল্যাব অন্য বিভাগের জন্য কাজে লাগানো হচ্ছে উল্লেখ করে অধ্যাপক মুনাজ আহমেদ নূর দাবি করেন, এ কাজে কোনো অনিয়ম হয়নি। পছন্দের কাউকেও কাজ দেওয়া হয়নি। তাঁর পাল্টা অভিযোগ, স্বার্থ আদায় না হওয়ায় তাঁর মেয়াদের শেষ পর্যায়ে ইউজিসির দুজন সদস্য ইচ্ছে করে তাঁকে ‘অপমান’ করার চেষ্টা করছেন।

তদন্তে পাওয়া যত অনিয়ম

কমিটি ইতিমধ্যে তাদের প্রতিবেদন ইউজিসিতে জমা দিয়েছে। এ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ল্যাব স্থাপনে যৌথভাবে কাজ পায় জেবি অব বিএমআইটি সলিউশনস লিমিটেড এবং আই৩৬০ বাংলাদেশ লিমিটেড নামের দুটি প্রতিষ্ঠান। বিভিন্ন মাধ্যমে পাওয়া তথ্যে কমিটি নিশ্চিত হয়েছে, এর মধ্যে প্রথম প্রতিষ্ঠানটির স্বত্বাধিকারী বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের ‘অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ’। প্রতিষ্ঠানটি নতুন। দরপত্রে চাওয়া যোগ্যতা প্রতিষ্ঠানটির না থাকায় আই৩৬০ বাংলাদেশ লিমিটেডের সঙ্গে যুক্ত হয়ে তারা কাজ পায়।

তদন্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিশ্ববিদ্যালয়ের নথিতে বিলবাবদ ৫ কোটি ৯৪ লাখ ৬৪ হাজার টাকা পরিশোধ করার অনুমোদন আছে। অথচ কমিটি ৪ কোটি ৬০ লাখ ৮৪ হাজার কোটি টাকার বিল দেওয়ার চেক বা ডেবিট ভাউচার দেখতে পেয়েছে। বাকি টাকা কোন প্রতিষ্ঠানের নামে ছাড় করা হয়েছে, সে বিষয়ে তথ্য দেয়নি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। কমিটির কাছে ‘সুস্পষ্টভাবে প্রতীয়মান’ হয়েছে, জেবি অব বিএমআইটি সলিউশনস লিমিটেডকে কার্যাদেশ দেওয়ার ‘অভিপ্রায় নিয়ে’ আই৩৬০ বাংলাদেশ লিমিটেডকে যুক্ত করা হয়েছে।

কমিটিসংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানায়, তারা মনে করছে, এখানে কৌশলে নতুন একটি প্রতিষ্ঠানকে সুবিধা দেওয়া হয়েছে।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, কমিটির চাওয়া তথ্য-উপাত্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার আশরাফ উদ্দিন ‘দিই’, ‘দিচ্ছি’ করে কালক্ষেপণ করেছেন। তাঁর এ অসহযোগিতা, দরপত্রে অংশ নেওয়া প্রতিষ্ঠানের তথ্য-উপাত্তের অনুলিপি না দেওয়া, মূল কাগজপত্র (ফাইল) কমিটিকে না দেখানো কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। কমিটির বিশেষজ্ঞ সদস্য বিশ্ববিদ্যালয়ের কেনা সরঞ্জাম ঠিকমতো যাচাই করারও সুযোগ পাননি।

কমিটিতে বিশেষজ্ঞ সদস্য ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তথ্যপ্রযুক্তি বিভাগের অধ্যাপক কাজী মুহাইমিন-আস-সাকিব। সদস্যসচিব ছিলেন ইউজিসির জ্যেষ্ঠ সহকারী পরিচালক গোলাম দস্তগীর। যোগাযোগ করা হলে কমিটির একজন সদস্য জানান, তদন্ত প্রতিবেদন তাঁরা জমা দিয়েছেন।

কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়

অনুমোদনের আগে ল্যাবের সরঞ্জাম কেনার যৌক্তিক ব্যাখ্যা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ দিতে পারেনি, এ কথা উল্লেখ করে কমিটি তাদের সুপারিশে বলেছে, রাষ্ট্রের অর্থ ব্যয়ে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে আরও সচেতন ও দায়িত্বশীল হওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া যেতে পারে। অধিকতর তদন্তের জন্য উচ্চপর্যায়ের একটি কমিটি গঠনের সুপারিশও করেছে কমিটি।

জানতে চাইলে ইউজিসির সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক আবদুল মান্নান গতকাল রোববার প্রথম আলোকে বলেন, সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো চলে জনগণের টাকায়। এখানে টাকা খরচ করতে হবে বৈধ উপায়ে, নীতির মধ্যে থেকে। এর ব্যত্যয় কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। এটা করা উচিত হয়নি।