কেমন শিক্ষাব্যবস্থা চাই?

নেই বই উৎসব, তবু নতুন বই পাওয়ার উৎসাহে কমতি নেই। বছরের প্রথম দিনই স্কুল থেকে শিক্ষার্থীদের দেওয়া হয় নতুন বই। সে বই দেখছেন অভিভাবকেরাও। সরকারি করোনেশন মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়, খুলনা।ফাইল ছবি প্রথম আলো

এই লেখার উদ্দেশ্য শিক্ষার মহত্ত্ব, প্রয়োজনীয়তা কিংবা উপযোগিতা নিয়ে নতুন করে আলোচনা করা নয়। যুগে যুগে অসংখ্য মনীষী শিক্ষা সম্পর্কে গভীর ও মূল্যবান মতামত দিয়েছেন। আমি এখানে একজন অভিভাবক, শিক্ষক, এবং বাংলাদেশের একজন সাধারণ নাগরিক হিসেবে আমাদের আর্থসামাজিক বাস্তবতা বিবেচনায় শিক্ষাব্যবস্থা কেমন হওয়া উচিত, তা নিয়ে কিছু ভাবনা ও প্রস্তাবনা তুলে ধরছি। এগুলো চূড়ান্ত সমাধান নয় বরং একটি গঠনমূলক আলোচনা ও ব্রেইনস্টর্মিংয়ের অংশমাত্র।

দশম শ্রেণিতে অধ্যয়নরত অবস্থায় আমাদের ছেলের একটি মন্তব্য আমাকে গভীরভাবে ভাবিয়েছিল। সে বলেছিল—‘লেখাপড়া শেখাটা বাইসাইকেল চালানো শেখার মতো হওয়া উচিত। কেউ একবার বাইসাইকেল চালানো শিখে ফেললে এবং আনন্দ পেতে শুরু করলে, সে নিজ আগ্রহেই চালাতে থাকবে। শিক্ষকের কাজ হবে শিক্ষার্থীদের সেই আনন্দ খুঁজে পেতে সাহায্য করা। কোথায় বাঁক নিতে হবে, কোথায় সাবধানে চলতে হবে, কোথায় ভারসাম্য রক্ষা করতে হবে, শিক্ষক শুধু সেই দিকনির্দেশনাই দেবেন। কিন্তু আমাদের দেশে লেখাপড়ার অবস্থা এমন হয়ে গেছে যেন একজন শিক্ষার্থীকে হুইলচেয়ারে বসিয়ে দেওয়া হয়েছে। কেউ পেছন থেকে ঠেলে দিলে সে এগোয়, না হলে থেমে থাকে।’

কথাগুলো হয়তো আবেগপ্রবণ, কিন্তু বাস্তবতার সঙ্গে এর গভীর সম্পর্ক রয়েছে।

গত দুই দশকে বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে সমাজে বারবার বিতর্ক, অসন্তোষ এবং উদ্বেগ দেখা গেছে। শুধু অভিভাবক নয়, শিক্ষক, শিক্ষার্থী, এমনকি জনসাধারণের মধ্যেও একধরনের অস্বস্তি কাজ করছে। আমরা প্রায়ই বলি আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা ইউরোপ, আমেরিকা, কানাডা কিংবা অস্ট্রেলিয়ার মতো হওয়া উচিত। কিন্তু শুধু ইচ্ছা করলেই তা সম্ভব নয়। উন্নত বিশ্বের শিক্ষাব্যবস্থা রাতারাতি গড়ে ওঠেনি; শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে পরিকল্পনা, গবেষণা, প্রশিক্ষণ, এবং বাস্তব অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে তা বিকশিত হয়েছে। আজও তারা যুগের পরিবর্তনের সঙ্গে নিজেদের শিক্ষাব্যবস্থা প্রতিনিয়ত পরিমার্জন করছে।

আমাদের বুঝতে হবে, শিক্ষাব্যবস্থা শুধু একটি আধুনিক সিলেবাসের নাম নয়। এটি কম্পিউটারের সফটওয়্যার আপডেটের মতো কোনো বিষয় নয় যে, নতুন সিলেবাস চালু করলেই শিক্ষার মান উন্নত হয়ে যাবে। একটি কার্যকর শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তুলতে প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, দক্ষ শিক্ষক, উপযুক্ত অবকাঠামো, দায়িত্বশীল অভিভাবক, এবং শিক্ষার্থীবান্ধব পরিবেশ।

শিক্ষাব্যবস্থার মূল উপাদান

আমার দৃষ্টিতে একটি শিক্ষাব্যবস্থার ছয়টি প্রধান উপাদান রয়েছে

১. শিক্ষার্থী

২. পাঠ্যক্রম (সিলেবাস)

৩. শিক্ষক

৪. অভিভাবক

৫. ভৌত অবকাঠামো ও শিক্ষা–সহায়ক উপকরণ

৬. সহায়ক কর্মকর্তা-কর্মচারীরা

বাংলাদেশে শিক্ষার্থীর তুলনায় দক্ষ শিক্ষক, পর্যাপ্ত অবকাঠামো, এবং মানসম্মত শিক্ষা-সহায়ক উপকরণের ঘাটতি রয়েছে। তবে সীমাবদ্ধতার মধ্যেও অনেক উন্নতির সুযোগ আছে, যদি আমরা বাস্তবভিত্তিক এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করি।

আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা সাধারণত চারটি স্তরে বিভক্ত, প্রাথমিক, মাধ্যমিক, উচ্চমাধ্যমিক এবং বিশ্ববিদ্যালয়। প্রতিটি স্তর একে অপরের পরিপূরক। একটি স্তর দুর্বল হলে পুরো ব্যবস্থাই দুর্বল হয়ে পড়ে। তাই প্রতিটি স্তরকে সমান গুরুত্ব দিয়ে সাজাতে হবে।

প্রাথমিক শিক্ষা: শেখার আনন্দের শুরু

কোমলমতি শিক্ষার্থীরা প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়ে। তাই এই স্তরের শিক্ষা হতে হবে আনন্দময়, সহজবোধ্য, এবং কৌতূহল উদ্দীপক। বইগুলো সহজ ভাষায় লেখা এবং আকর্ষণীয় রঙিন চিত্রসমৃদ্ধ হওয়া উচিত। প্রথম থেকে তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত শিশুদের মূলত ভাষাজ্ঞান, বাক্য গঠন, দ্রুত পঠন, এবং মৌলিক সামাজিক আচরণ শেখানো উচিত। একই সঙ্গে পরিচ্ছন্নতা, শৃঙ্খলা, পরিবেশ সচেতনতা, ট্রাফিক আইন, এবং পারস্পরিক সম্মানবোধের মতো বিষয়গুলো ছোটবেলা থেকেই চর্চার মাধ্যমে শেখাতে হবে।

এই পর্যায়ে অতিরিক্ত পরীক্ষা বা প্রতিযোগিতার চাপ না দিয়ে শিক্ষার্থীদের শেখার প্রতি আগ্রহী করে তোলাই হওয়া উচিত মূল লক্ষ্য। যারা নিয়মিত পাঠ অনুসরণ করবে এবং শৃঙ্খলা মেনে চলবে, তাদের উৎসাহ দিতে হবে। অন্যদিকে যারা পিছিয়ে পড়বে, তাদের শাস্তি না দিয়ে ধৈর্যের সঙ্গে সহায়তা করতে হবে।

চতুর্থ ও পঞ্চম শ্রেণি হবে মাধ্যমিক শিক্ষার প্রস্তুতিপর্ব। এ সময় ধীরে ধীরে পাঠ্যভিত্তিক মূল্যায়নের পাশাপাশি দায়িত্ববোধের চর্চা শুরু করা যেতে পারে। যেমন নিজের পড়াশোনা নিজে গুছিয়ে করা, সময়মতো বিদ্যালয়ে উপস্থিত হওয়া, নির্ধারিত কাজ সম্পন্ন করা, দলগত কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করা, বিদ্যালয়ের নিয়মকানুন মেনে চলা এবং নিজের আচরণের জন্য জবাবদিহিতার মানসিকতা গড়ে তোলা। এই অভ্যাসগুলো পরবর্তী জীবনে একজন শিক্ষার্থীকে আত্মনির্ভরশীল ও দায়িত্বশীল মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে সহায়তা করবে।

আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা সাধারণত চারটি স্তরে বিভক্ত, প্রাথমিক, মাধ্যমিক, উচ্চমাধ্যমিক এবং বিশ্ববিদ্যালয়। প্রতিটি স্তর একে অপরের পরিপূরক। একটি স্তর দুর্বল হলে পুরো ব্যবস্থাই দুর্বল হয়ে পড়ে। তাই প্রতিটি স্তরকে সমান গুরুত্ব দিয়ে সাজাতে হবে।

মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা: দক্ষতা, চিন্তাশক্তি ও জীবনের প্রস্তুতি

মাধ্যমিক পর্যায় একজন শিক্ষার্থীর জীবনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সময়। এই পর্যায়ে শিশুরা ধীরে ধীরে কৈশোরে পদার্পণ করে এবং তাদের চিন্তাভাবনা, ব্যক্তিত্ব, মূল্যবোধ এবং ভবিষ্যৎ সম্পর্কে ধারণা গড়ে উঠতে শুরু করে। তাই এই স্তরের শিক্ষা শুধু পাঠ্যবইভিত্তিক জ্ঞান প্রদানের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না; বরং শিক্ষার্থীদের মানসিক, নৈতিক, সামাজিক, এবং ব্যবহারিক দক্ষতা বিকাশের দিকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে।

অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষার্থীর জন্য শক্তিশালী সাধারণ ভিত্তিমূলক শিক্ষা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। বাংলা, ইংরেজি, গণিত, বিজ্ঞান, সামাজিক বিজ্ঞান, ইতিহাস, ভূগোল, তথ্যপ্রযুক্তি এবং নৈতিক শিক্ষার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের মধ্যে যুক্তিবোধ, বিশ্লেষণী ক্ষমতা এবং বাস্তবজীবন সম্পর্কে মৌলিক ধারণা গড়ে তুলতে হবে। মুখস্থনির্ভর শিক্ষা কমিয়ে বোঝার মাধ্যমে শেখা, প্রশ্ন করার সাহস এবং স্বাধীনভাবে চিন্তা করার অভ্যাস গড়ে তোলা জরুরি।

বর্তমানে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার একটি বড় সমস্যা হলো অনেক শিক্ষার্থী পরীক্ষায় ভালো ফল করার জন্য পড়াশোনা করে কিন্তু বাস্তবজীবনে সেই জ্ঞান প্রয়োগ করতে পারে না। এর অন্যতম কারণ হলো অতিরিক্ত পরীক্ষানির্ভরতা এবং কোচিং ও নোটভিত্তিক শিক্ষা। ফলে অনেক শিক্ষার্থী সৃজনশীল চিন্তা ও সমস্যা সমাধানের দক্ষতা অর্জনের পরিবর্তে শুধু ‘কীভাবে নম্বর পাওয়া যাবে’ সেই মানসিকতায় অভ্যস্ত হয়ে পড়ে। এই সংস্কৃতি থেকে ধীরে ধীরে বেরিয়ে আসতে হবে।

মাধ্যমিক পর্যায়ে শিক্ষার্থীদের পাঠ্যবইয়ের বাইরেও বিভিন্ন সামাজিক ও সৃজনশীল কার্যক্রমে অংশগ্রহণের সুযোগ দিতে হবে। যেমন বিতর্ক, বিজ্ঞান মেলা, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড, খেলাধুলা, স্বেচ্ছাসেবামূলক কাজ, বৃক্ষরোপণ, এবং দলগত প্রকল্প। এসব কার্যক্রম শিক্ষার্থীদের নেতৃত্ব, সহযোগিতা, আত্মবিশ্বাস, এবং সামাজিক দায়বদ্ধতা গড়ে তুলতে সহায়তা করবে।

নবম শ্রেণি থেকে শিক্ষার্থীরা নিজেদের আগ্রহ, দক্ষতা এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা অনুযায়ী বিজ্ঞান, মানবিক, বাণিজ্য বা অন্য বিষয়ে বিশেষায়িত শিক্ষা গ্রহণ করতে পারে। তবে এই বিশেষায়ন এমন হওয়া উচিত নয়, যাতে একজন বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী সাহিত্য বা সমাজ সম্পর্কে কিছুই না জানে কিংবা মানবিক বিভাগের শিক্ষার্থী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সম্পর্কে সম্পূর্ণ অজ্ঞ থাকে। প্রত্যেক শিক্ষার্থীর মধ্যেই একটি ভারসাম্যপূর্ণ সাধারণ জ্ঞান ও মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে তোলা প্রয়োজন।

এই পর্যায়ে শিক্ষার্থীদের শুধু চাকরির জন্য প্রস্তুত করা নয় বরং জীবন ও সমাজ সম্পর্কে সচেতন নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলা জরুরি। তাঁদের আর্থিক সচেতনতা, স্বাস্থ্য ও পুষ্টি, ডিজিটাল নিরাপত্তা, পরিবেশ সচেতনতা এবং নাগরিক দায়িত্ব সম্পর্কেও ধারণা দিতে হবে। কারণ ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় শুধু একাডেমিক জ্ঞান যথেষ্ট নয়।

উচ্চমাধ্যমিক পর্যায় হবে বিশ্ববিদ্যালয় এবং কর্মজীবনের মধ্যবর্তী প্রস্তুতিপর্ব। এই স্তরে শিক্ষার্থীদের আরও বেশি স্বাধীনভাবে শেখার অভ্যাস গড়তে হবে। মুখস্থভিত্তিক পরীক্ষার পরিবর্তে বিশ্লেষণধর্মী লেখা, উপস্থাপনা, গবেষণামূলক কাজ এবং বাস্তবভিত্তিক মূল্যায়নের উপর গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। শিক্ষার্থীরা যেন কোনো বিষয় ‘কী’ তা শুধু না জানে, বরং ‘কেন’ এবং ‘কীভাবে’ সেটিও বুঝতে শেখে।

বাংলাদেশের বাস্তবতায় উচ্চমাধ্যমিক পর্যায় পর্যন্ত অধিকাংশ শিক্ষার্থী পরিবার ও অভিভাবকের প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে থাকে। তাই এই সময়ে আত্মনিয়ন্ত্রণ, সময় ব্যবস্থাপনা, দায়িত্ববোধ এবং নৈতিক মূল্যবোধের চর্চা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। শিক্ষার্থীদের শেখাতে হবে কীভাবে নিজের সিদ্ধান্ত নিজে নিতে হয়, মতপার্থক্যকে সম্মান করতে হয়, এবং ব্যর্থতা থেকে শিক্ষা নিতে হয়।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা এমন হতে হবে, যাতে একজন শিক্ষার্থী নিজেকে আবিষ্কার করতে পারে। প্রত্যেক শিক্ষার্থীকে একই ছাঁচে ফেলার চেষ্টা না করে তাঁদের ভিন্ন ভিন্ন মেধা, আগ্রহ, এবং সক্ষমতাকে মূল্যায়ন করতে হবে। কারণ, সমাজের জন্য শুধু ডাক্তার, প্রকৌশলী, বা সরকারি কর্মকর্তা নয়; বরং ভালো শিক্ষক, গবেষক, কৃষিবিদ, উদ্যোক্তা, শিল্পী, কারিগর, এবং মানবিক মানুষও সমানভাবে প্রয়োজন।

বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষা: স্বাধীনতা, দায়িত্ববোধ ও মানুষ গড়ার শেষ প্রস্তুতিপর্ব

বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায় একজন শিক্ষার্থীর জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রূপান্তরমূলক সময়। বাংলাদেশের আর্থসামাজিক বাস্তবতায় অধিকাংশ শিক্ষার্থী এই পর্যায়ে এসে প্রথমবারের মতো পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে অপেক্ষাকৃত স্বাধীন জীবনযাপন শুরু করে। অনেকেই নিজ জেলা বা শহর ছেড়ে অন্যত্র বসবাস করে। নিজে নিজে সিদ্ধান্ত নেয়, নিজের সময় ও জীবন পরিচালনা করতে শেখে। ফলে বিশ্ববিদ্যালয় শুধু উচ্চশিক্ষা গ্রহণের স্থান নয়; এটি একজন তরুণ-তরুণীর পূর্ণাঙ্গ মানুষ হিসেবে গড়ে ওঠার একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়।

এই সময়টাতে অনেক শিক্ষার্থী মানসিক চাপ, একাকিত্ব, হতাশা, বন্ধুত্বের প্রভাব, সামাজিক বিভ্রান্তি, কিংবা ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে যায়। কেউ কেউ ভুল বন্ধুত্ব, মাদকাসক্তি, অনিয়ন্ত্রিত জীবনযাপন কিংবা হতাশাজনিত সমস্যার দিকেও ঝুঁকে পড়তে পারে। তাই বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব হওয়া উচিত শিক্ষার্থীদের জন্য কার্যকর কাউন্সেলিং এবং মানসিক সহায়তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করা।

বিশ্ববিদ্যালয়ে শুধু একাডেমিক পরামর্শ নয়; বরং ব্যক্তিগত, মানসিক, সামাজিক, এবং ক্যারিয়ারভিত্তিক কাউন্সেলিংয়ের সুযোগ থাকতে হবে। নতুন শিক্ষার্থীদের জন্য ওরিয়েন্টেশন কার্যক্রমের মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয় জীবন, দায়িত্ববোধ, সময় ব্যবস্থাপনা, সামাজিক আচরণ, ডিজিটাল নিরাপত্তা, এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে ধারণা দেওয়া প্রয়োজন। একজন শিক্ষার্থী যেন সমস্যায় পড়লে সহজেই পরামর্শ নিতে পারে এবং নিজেকে একা মনে না করে, সেই পরিবেশ গড়ে তোলা অত্যন্ত জরুরি।

বিশ্ববিদ্যালয় জীবন শিক্ষার্থীদের স্বাধীনতা দেয়, কিন্তু সেই স্বাধীনতার সঙ্গে দায়িত্ববোধও শেখাতে হয়। নিয়মিত ও সময়মতো ক্লাসে অংশগ্রহণ, নির্ধারিত সময়ে অ্যাসাইনমেন্ট জমা দেওয়া, পরীক্ষায় অংশগ্রহণ, দলগত কাজ সম্পন্ন করা, এবং শিক্ষকদের সঙ্গে পেশাদার আচরণ, এসব কেবল একাডেমিক নিয়ম নয়; বরং ভবিষ্যৎ কর্মজীবনের প্রশিক্ষণ। কারণ, কর্মজীবনে সময়ানুবর্তিতা, দায়িত্বশীলতা, এবং পেশাগত আচরণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়েই এই অভ্যাসগুলো গড়ে উঠতে হবে।

নবম শ্রেণি থেকে শিক্ষার্থীরা নিজেদের আগ্রহ, দক্ষতা এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা অনুযায়ী বিজ্ঞান, মানবিক, বাণিজ্য বা অন্য বিষয়ে বিশেষায়িত শিক্ষা গ্রহণ করতে পারে। তবে এই বিশেষায়ন এমন হওয়া উচিত নয়, যাতে একজন বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী সাহিত্য বা সমাজ সম্পর্কে কিছুই না জানে কিংবা মানবিক বিভাগের শিক্ষার্থী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সম্পর্কে সম্পূর্ণ অজ্ঞ থাকে। প্রত্যেক শিক্ষার্থীর মধ্যেই একটি ভারসাম্যপূর্ণ সাধারণ জ্ঞান ও মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে তোলা প্রয়োজন।

বর্তমানে আমাদের দেশের অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি উদ্বেগজনক প্রবণতা হলো শিক্ষার্থীদের একটি অংশের মধ্যে ক্লাসবিমুখতা এবং শুধু পরীক্ষাকেন্দ্রিক প্রস্তুতির সংস্কৃতি। অনেকেই মনে করে বিশ্ববিদ্যালয়ে শুধু পরীক্ষার আগে পড়লেই যথেষ্ট। কিন্তু প্রকৃত শিক্ষা কখনো শুধু পরীক্ষার মাধ্যমে অর্জিত হয় না। বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল শক্তি হলো নিয়মিত পাঠচর্চা, আলোচনা, প্রশ্ন করা, মতবিনিময়, এবং চিন্তার বিকাশ। একজন শিক্ষার্থী যত বেশি ক্লাসে অংশগ্রহণ করবে, শিক্ষকদের সঙ্গে আলোচনা করবে, এবং সহপাঠীদের সঙ্গে জ্ঞান বিনিময় করবে, ততই তার চিন্তার পরিধি প্রসারিত হবে।

বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষা এমন হওয়া উচিত, যেখানে শিক্ষার্থীরা মুখস্থনির্ভর মানসিকতা থেকে বের হয়ে গবেষণা, বিশ্লেষণ এবং সৃজনশীল চিন্তার দিকে অগ্রসর হবে। শিক্ষার্থীদের শুধু ‘কী’শেখানো হবে না; বরং ‘কেন’এবং ‘কীভাবে’ সেটিও বুঝতে শেখানো হবে। একটি সমস্যাকে বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণ করা, যুক্তির মাধ্যমে মতপ্রকাশ করা, এবং নতুন সমাধান খুঁজে বের করার ক্ষমতা গড়ে তুলতে হবে।

শিল্প, কৃষি, প্রযুক্তি, স্বাস্থ্য, ব্যবসা, পরিবেশ, এবং সমাজের বাস্তব সমস্যার সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার সংযোগ থাকা প্রয়োজন। শুধু তাত্ত্বিক জ্ঞান নয়; বরং বাস্তবভিত্তিক শিক্ষা, গবেষণা, ইন্টার্নশিপ, ল্যাবভিত্তিক কাজ, ফিল্ডওয়ার্ক এবং কমিউনিটি এনগেজমেন্টের ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। এতে শিক্ষার্থীরা বাস্তবজীবনের চ্যালেঞ্জ সম্পর্কে সচেতন হবে এবং কর্মক্ষেত্রে প্রবেশের আগে প্রয়োজনীয় অভিজ্ঞতা অর্জন করতে পারবে।

বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষার্থীদের মধ্যে নেতৃত্ব, নৈতিকতা, সহনশীলতা এবং সামাজিক দায়বদ্ধতা গড়ে তোলার দিকেও বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে। মতপার্থক্য থাকা স্বাভাবিক, কিন্তু সেই মতপার্থক্য যেন সহিংসতা, অসহিষ্ণুতা কিংবা বিভাজনের কারণ না হয়। বিশ্ববিদ্যালয় হওয়া উচিত মুক্তচিন্তা, যুক্তিবোধ, এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের চর্চার জায়গা।

আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষা শুধু চাকরি পাওয়ার মাধ্যম হয়ে উঠা উচিত নয়। বর্তমানে অনেক শিক্ষার্থী এবং অভিভাবকের প্রধান লক্ষ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে শুধু একটি ডিগ্রি অর্জন করে চাকরি পাওয়া। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকৃত উদ্দেশ্য হওয়া উচিত দক্ষ, চিন্তাশীল, মানবিক এবং আত্মনির্ভরশীল মানুষ তৈরি করা। চাকরিজীবনের একটি অংশমাত্র; কিন্তু একজন মানুষ হিসেবে দায়িত্ববোধ, সততা, নৈতিকতা, এবং সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতা আরও বড় বিষয়।

সবশেষে, বিশ্ববিদ্যালয় এমন একটি জায়গা হওয়া উচিত, যেখানে একজন শিক্ষার্থী নিজেকে আবিষ্কার করতে শিখবে। সে বুঝতে শিখবে তার শক্তি কোথায়, দুর্বলতা কোথায়, সমাজে তার ভূমিকা কী এবং ভবিষ্যতে সে কেমন মানুষ হতে চায়। কারণ, একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকৃত সাফল্য শুধু কতজন শিক্ষার্থী পাস করল, তার ওপর নির্ভর করে না; বরং কতজন দায়িত্বশীল, মানবিক, এবং দক্ষ মানুষ তৈরি করতে পারল তার ওপর নির্ভর করে।

শিক্ষক: শিক্ষাব্যবস্থার প্রাণ এবং জাতি গঠনের কারিগর

একটি দেশের শিক্ষাব্যবস্থার গুণগত মান অনেকাংশেই নির্ভর করে সেই দেশের শিক্ষকদের ওপর। উন্নত পাঠ্যক্রম, আধুনিক প্রযুক্তি, কিংবা দৃষ্টিনন্দন অবকাঠামো থাকলেও দক্ষ, দায়িত্বশীল, এবং মানবিক শিক্ষক ছাড়া প্রকৃত শিক্ষা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। একজন শিক্ষক শুধু পাঠদানকারী নন; তিনি একজন পথপ্রদর্শক, চরিত্র নির্মাতা, এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্ম গঠনের কারিগর। তাই শিক্ষকদের মানোন্নয়ন ছাড়া শিক্ষাব্যবস্থার সামগ্রিক উন্নয়ন কল্পনা করা কঠিন।

বাংলাদেশের বাস্তবতায় আমাদের দক্ষ ও যোগ্য শিক্ষকের অভাব রয়েছে এটি অস্বীকার করার সুযোগ নেই। তবে এটিও সত্য যে দক্ষ শিক্ষক রাতারাতি তৈরি হয় না। একজন ভালো শিক্ষক তৈরি করতে সময়, প্রশিক্ষণ, অভিজ্ঞতা এবং ধারাবাহিক চর্চার প্রয়োজন হয়। তাই শুধু নতুন সিলেবাস প্রণয়ন করলেই হবে না; বরং শিক্ষক উন্নয়নের জন্য দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে।

প্রথমত, শিক্ষক নিয়োগপ্রক্রিয়াকে আরও কঠোর, স্বচ্ছ এবং যোগ্যতাভিত্তিক করতে হবে। শুধু সনদ বা পরীক্ষার ফলাফলের ভিত্তিতে শিক্ষক নির্বাচন করলে চলবে না; বরং একজন প্রার্থীর বিষয়ভিত্তিক জ্ঞান, উপস্থাপন দক্ষতা, নৈতিকতা, ধৈর্য, এবং শিক্ষার্থীদের সঙ্গে যোগাযোগের সক্ষমতাও মূল্যায়ন করতে হবে। কারণ, একজন শিক্ষক শুধু জ্ঞান বিতরণ করেন না; তিনি শিক্ষার্থীদের চিন্তা করতে শেখান, অনুপ্রাণিত করেন, এবং জীবন সম্পর্কে দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে তুলতে সহায়তা করেন।

ছবি: প্রথম আলো

দ্বিতীয়ত, শিক্ষকদের জন্য নিয়মিত ও কার্যকর প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। যুগ পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে শিক্ষাদান পদ্ধতি, প্রযুক্তির ব্যবহার এবং শিক্ষার্থীদের মানসিক গঠনও পরিবর্তিত হচ্ছে। ফলে একজন শিক্ষক যদি নিজেকে নিয়মিত হালনাগাদ না করেন, তাহলে তিনি ধীরে ধীরে পিছিয়ে পড়বেন। আধুনিক শিক্ষণ-পদ্ধতি, শ্রেণিকক্ষ ব্যবস্থাপনা, প্রযুক্তির ব্যবহার, শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্য, গবেষণা পদ্ধতি, এবং মূল্যায়ন কৌশল বিষয়ে প্রশিক্ষণ বাধ্যতামূলক করা প্রয়োজন।

একজন শিক্ষককে তাঁর আচরণ, দায়িত্ববোধ এবং কর্মনিষ্ঠার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের কাছে অনুকরণীয় হতে হবে। শিক্ষক যদি সময়মতো শ্রেণিকক্ষে উপস্থিত না হন, দায়িত্ব এড়িয়ে চলেন, কিংবা পেশাগত শৃঙ্খলা বজায় না রাখেন, তাহলে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকেও শৃঙ্খলা আশা করা কঠিন। শিক্ষার্থীরা শুধু বই থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে না; তারা শিক্ষকদের আচরণ থেকেও শিক্ষা নেয়। তাই একজন শিক্ষকের সততা, ভদ্রতা, সময়ানুবর্তিতা, এবং দায়িত্বশীলতা শিক্ষার্থীদের জন্য বাস্তব উদাহরণ হয়ে উঠতে হবে।

আমাদের দেশে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা হলো অনেক শিক্ষক আর্থিক সীমাবদ্ধতার কারণে অতিরিক্ত কোচিং, প্রাইভেট বা বাণিজ্যিক শিক্ষাদানে অতিরিক্ত সময় ব্যয় করতে বাধ্য হন। এতে অনেক ক্ষেত্রে মূল শ্রেণিকক্ষ শিক্ষার মান ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তাই শিক্ষকদের জন্য সম্মানজনক এবং প্রতিযোগিতামূলক বেতনকাঠামো নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। একজন শিক্ষক যেন আর্থিক নিরাপত্তাহীনতায় ভুগে তাঁর মূল দায়িত্ব থেকে বিচ্যুত না হন। শিক্ষকতা এমন একটি পেশা হওয়া উচিত, যেখানে মেধাবী এবং যোগ্য তরুণরা আগ্রহ নিয়ে আসতে চায়।

তবে একই সঙ্গে এটিও নিশ্চিত করতে হবে যে, ‘মুড়ি-মুড়কির একই দাম’ যেন না হয়। অর্থাৎ সব শিক্ষক একই রকম সুবিধা পাবেন—এমন ধারণা দীর্ঘ মেয়াদে শিক্ষার মান উন্নয়নে সহায়ক নাও হতে পারে। যাঁরা দক্ষতা, আন্তরিকতা, গবেষণা, এবং শিক্ষাদানের গুণগত মানের মাধ্যমে নিজেদের যোগ্যতা প্রমাণ করবেন, তাঁদের অধিকতর মূল্যায়ন ও প্রণোদনা দিতে হবে। অন্যদিকে যাঁরা ধারাবাহিকভাবে দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হবেন বা নিজেদের দক্ষতা উন্নয়নে অনাগ্রহী থাকবেন, তাঁদের ক্ষেত্রে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে।

বিদ্যালয় ও কলেজ পর্যায়ে শিক্ষকদের কার্যক্রম নিয়মিত মূল্যায়নের ব্যবস্থা থাকতে পারে। শিক্ষার্থীদের শেখার অগ্রগতি, শ্রেণিকক্ষে অংশগ্রহণ, পাঠদানের মান, এবং পেশাগত আচরণের ভিত্তিতে মূল্যায়ন করা যেতে পারে। যাঁরা ভালো করবেন, তাঁরা অতিরিক্ত ইনক্রিমেন্ট, প্রশিক্ষণ, বা পদোন্নতির সুযোগ পাবেন। আর যাঁরা দীর্ঘদিন ধরে প্রত্যাশিত মান অর্জনে ব্যর্থ হবেন, তাঁদের বাৎসরিক ইনক্রিমেন্ট স্থগিত রাখা বা পুনঃপ্রশিক্ষণের আওতায় আনা যেতে পারে।

বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে শিক্ষকদের ক্ষেত্রে গবেষণা ও জ্ঞান সৃষ্টির ভূমিকা আরও গুরুত্বপূর্ণ। একটি বিশ্ববিদ্যালয় শুধু পাঠদান কেন্দ্র নয়; এটি জ্ঞান সৃষ্টি, গবেষণা, এবং উদ্ভাবনের কেন্দ্র। তাই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের গবেষণার সঙ্গে সক্রিয়ভাবে সম্পৃক্ত থাকতে হবে। বিশেষ করে আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন গবেষণা প্রকাশনার প্রতি গুরুত্ব দিতে হবে।

আমার ব্যক্তিগত মতামত হলো বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকেরা যদি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে গবেষণায় সক্রিয় অবদান রাখতে ব্যর্থ হন, তাহলে তাঁদের বাৎসরিক ইনক্রিমেন্ট বা পদোন্নতির ক্ষেত্রে পুনর্বিবেচনা করা যেতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, প্রতি দুই বছরে অন্তত একটি মানসম্মত কিউ-১ (Q1) জার্নালে গবেষণা প্রকাশের লক্ষ্য নির্ধারণ করা যেতে পারে, বিশেষ করে গবেষণাভিত্তিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে। এর ফলে শিক্ষকদের মধ্যে অধিকতর ভালো করার প্রতিযোগিতামূলক মনোভাব তৈরি হবে, গবেষণার পরিবেশ উন্নত হবে, এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অবস্থানও ধীরে ধীরে শক্তিশালী হবে।

তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মনে রাখতে হবে, শুধু শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করলেই হবে না; বরং গবেষণার জন্য প্রয়োজনীয় সহায়তাও নিশ্চিত করতে হবে। গবেষণা অনুদান, ল্যাব–সুবিধা, ডাটাবেজ অ্যাক্সেস, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, গবেষণা সহকারী, এবং পর্যাপ্ত সময় না দিলে শুধু প্রকাশনার চাপ দিয়ে কাঙ্ক্ষিত ফল অর্জন সম্ভব নয়।

শেষে বলা যায়, একজন ভালো শিক্ষক শুধু একজন শিক্ষার্থীকে নয়, একটি পুরো প্রজন্মকে বদলে দিতে পারেন। তাই শিক্ষকদের যথাযথ মর্যাদা, প্রশিক্ষণ, জবাবদিহিতা, এবং প্রণোদনার মাধ্যমে এমন একটি পরিবেশ গড়ে তুলতে হবে, যেখানে শিক্ষকতা আবারও সমাজের সবচেয়ে সম্মানিত এবং আকর্ষণীয় পেশাগুলোর একটিতে পরিণত হয়।

ছবি: প্রথম আলো

অভিভাবকের ভূমিকা: শিক্ষার প্রথম বিদ্যালয় পরিবার

শিশুর জীবনে সবচেয়ে প্রথম এবং সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব আসে পরিবার থেকে। শিশুর ভাষা শেখা, আচরণ শেখা, মূল্যবোধ গড়ে ওঠা, অন্যের প্রতি সম্মানবোধ, শৃঙ্খলা, দায়িত্ববোধ, এমনকি স্বপ্ন দেখার ধরনও অনেকাংশে পরিবার থেকেই গড়ে ওঠে। তাই একটি দেশের শিক্ষাব্যবস্থার সফলতা শুধু বিদ্যালয়, কলেজ, বা বিশ্ববিদ্যালয়ের ওপর নির্ভর করে না; বরং অভিভাবকদের সচেতনতা, দায়িত্বশীলতা, এবং অংশগ্রহণের ওপরও অনেকাংশে নির্ভরশীল।

বর্তমানে আমাদের সমাজে একটি প্রচলিত প্রবণতা হলো অনেক অভিভাবক শিক্ষাকে শুধু পরীক্ষার ফলাফল বা জিপিএর মধ্যে সীমাবদ্ধ করে ফেলেন। সন্তানের শিক্ষা মানেই যেন ‘কত নম্বর পেল’, ‘কোন প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হলো’, অথবা ‘অন্যের সন্তানের চেয়ে এগিয়ে আছে কি না’ এসব বিষয়কে অধিক গুরুত্ব দেওয়া হয়। এর ফলে অনেক শিশু অল্প বয়স থেকেই অপ্রয়োজনীয় প্রতিযোগিতা, মানসিক চাপ, এবং ভয়ভীতির মধ্যে বেড়ে ওঠে। অথচ প্রকৃত শিক্ষা শুধু ভালো ফলাফল নয়; বরং একজন শিশুর চিন্তাশক্তি, মানবিকতা, আত্মবিশ্বাস, এবং নৈতিকতা গড়ে তোলার নাম।

অভিভাবকদের প্রথম দায়িত্ব হওয়া উচিত সন্তানকে বুঝতে চেষ্টা করা। প্রতিটি শিশুর মেধা, আগ্রহ, শেখার গতি, এবং স্বপ্ন এক নয়। কেউ গণিতে ভালো, কেউ সাহিত্যে, কেউ সংগীতে, কেউ প্রযুক্তিতে, আবার কেউ হয়তো খেলাধুলা বা সৃজনশীল কাজে দক্ষ। কিন্তু আমাদের সমাজে প্রায়ই দেখা যায়, সব শিশুকে একই মানদণ্ডে বিচার করা হয়। এতে অনেক শিশু নিজের স্বাভাবিক প্রতিভা হারিয়ে ফেলে এবং আত্মবিশ্বাসহীনতায় ভুগতে শুরু করে।

অভিভাবকদের মনে রাখতে হবে, একজন শিশুকে শুধু চিকিৎসক, প্রকৌশলী, বা সরকারি কর্মকর্তা বানানোই জীবনের একমাত্র লক্ষ্য হতে পারে না। সমাজের জন্য ভালো শিক্ষক, গবেষক, উদ্যোক্তা, কৃষিবিদ, শিল্পী, কারিগর, এবং সর্বোপরি ভালো মানুষও সমানভাবে প্রয়োজন। তাই সন্তানের আগ্রহ এবং সক্ষমতাকে সম্মান করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

শিশুর শিক্ষাজীবনে অভিভাবকের ভূমিকা শুধু স্কুলে ভর্তি করানো বা কোচিংয়ের ব্যবস্থা করার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকা উচিত নয়। সন্তানের সঙ্গে নিয়মিত কথা বলা, তার সমস্যাগুলো বোঝা, মানসিক অবস্থার খোঁজ রাখা, এবং শেখার প্রতি ইতিবাচক পরিবেশ তৈরি করাও অত্যন্ত জরুরি। অনেক সময় দেখা যায়, মা–বাবা নিজেরা সন্তানের সঙ্গে পর্যাপ্ত সময় কাটান না, কিন্তু ভালো ফলাফলের প্রত্যাশা করেন। এতে শিশুর মধ্যে মানসিক দূরত্ব তৈরি হতে পারে।

বর্তমান সময়ে প্রযুক্তির ব্যবহারের কারণে শিশু-কিশোরদের জীবনযাত্রায় বড় পরিবর্তন এসেছে। মুঠোফোন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, অনলাইন গেম, এবং ইন্টারনেট যেমন শেখার নতুন সুযোগ তৈরি করেছে, তেমনি অনেক ঝুঁকিও সৃষ্টি করেছে। তাই অভিভাবকদের প্রযুক্তি সম্পর্কে সচেতন হতে হবে এবং সন্তানদের প্রযুক্তি ব্যবহারে ভারসাম্য ও দায়িত্বশীলতা শেখাতে হবে। শুধু নিষেধাজ্ঞা আরোপ করলেই হবে না; বরং কীভাবে প্রযুক্তিকে ইতিবাচকভাবে ব্যবহার করা যায়, সে বিষয়ে দিকনির্দেশনা দিতে হবে।

ছবি: প্রথম আলো

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো অনেক অভিভাবক সন্তানদের সামনে নিজেদের আচরণের মাধ্যমে অনিচ্ছাকৃতভাবে ভুল বার্তা প্রদান করেন। শিশুরা শুধু উপদেশ শুনে শেখে না; বরং তারা মা–বাবার আচরণ অনুকরণ করে শেখে। পরিবারে যদি মিথ্যা বলা, অসহিষ্ণুতা, অন্যকে অসম্মান করা, বা দায়িত্ব এড়িয়ে চলার সংস্কৃতি থাকে, তাহলে শিশুর মধ্যেও সেই আচরণের প্রতিফলন ঘটতে পারে। তাই সন্তানকে ভালো মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে হলে অভিভাবকদের নিজেদের আচরণেও ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে হবে।

অভিভাবকদের আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব হলো সন্তানকে ব্যর্থতা মেনে নিতে শেখানো। বর্তমানে অনেক শিশু অল্প ব্যর্থতাতেই ভেঙে পড়ে; কারণ, তারা সব সময় শুধু ‘সফল হতে হবে’ এই চাপের মধ্যে বেড়ে ওঠে। কিন্তু বাস্তব জীবনে ব্যর্থতা শেখারই একটি অংশ। সন্তান যদি কোনো পরীক্ষায় খারাপ করে বা কাঙ্ক্ষিত ফল অর্জন করতে না পারে, তাহলে তাকে অপমান বা তুলনা না করে সাহস দেওয়া এবং নতুনভাবে চেষ্টা করার অনুপ্রেরণা দেওয়া প্রয়োজন।

বিদ্যালয়, কলেজ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে অভিভাবকদের নিয়মিত যোগাযোগ থাকা উচিত। সন্তানের শিক্ষকদের সঙ্গে আলোচনা করা, প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম সম্পর্কে জানা, এবং সন্তানের অগ্রগতি ও আচরণ সম্পর্কে সচেতন থাকা প্রয়োজন। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং পরিবার যদি একসঙ্গে কাজ করে, তাহলে শিক্ষার্থীর সামগ্রিক বিকাশ অনেক বেশি কার্যকর হয়।

বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে এসে অনেক অভিভাবক মনে করেন, সন্তানের প্রতি তাঁদের দায়িত্ব শেষ। কিন্তু বাস্তবে এই সময়টাতেই সন্তানদের সবচেয়ে বেশি মানসিক সহায়তা প্রয়োজন হয়। কারণ, এই পর্যায়ে তারা স্বাধীন জীবন, ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তা, সম্পর্ক, এবং কর্মজীবনের চাপের মধ্যে দিয়ে যায়। তাই এই সময়েও অভিভাবকদের উচিত সন্তানের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখা, যেন সে যেকোনো সমস্যায় পরিবারের সঙ্গে খোলামেলা আলোচনা করতে পারে।

সবশেষে বলা যায়, শিক্ষাব্যবস্থার উন্নয়ন কখনোই শুধু সরকার বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের একক দায়িত্ব নয়। একজন সচেতন, দায়িত্বশীল, এবং মানবিক অভিভাবক একটি শিশুর ভবিষ্যৎ বদলে দিতে পারেন। কারণ, শিশুর প্রথম বিদ্যালয় পরিবার আর প্রথম শিক্ষক তার মা–বাবা। তাই একটি উন্নত, মানবিক, এবং দায়িত্বশীল জাতি গঠনের জন্য পরিবার ও অভিভাবকদের ভূমিকাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে।

শিক্ষাব্যবস্থার পরিবর্তন শুধু নতুন সিলেবাস প্রণয়ন বা পরীক্ষা পদ্ধতি পরিবর্তনের মাধ্যমে সম্ভব নয়। পরিবর্তন আনতে হবে দৃষ্টিভঙ্গিতে। একটি দেশের ভবিষ্যৎ নির্ভর করে তার শিক্ষাব্যবস্থার ওপর। শিক্ষাব্যবস্থার ভবিষ্যৎ নির্ভর করে আমরা আজ কী সিদ্ধান্ত নিচ্ছি, কী মূল্যবোধ ধারণ করছি এবং সন্তানদের জন্য কেমন সমাজ রেখে যেতে চাই তার ওপর।

অবকাঠামো ও শিক্ষা-সহায়ক পরিবেশ: শেখার উপযোগী পরিবেশ নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তা

একটি কার্যকর শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলার জন্য শুধু ভালো পাঠ্যক্রম এবং দক্ষ শিক্ষকই যথেষ্ট নয় বরং প্রয়োজন উপযুক্ত অবকাঠামো এবং শিক্ষাবান্ধব পরিবেশ। একজন শিক্ষার্থী যেখানে শিক্ষা গ্রহণ করবে, সেই পরিবেশ যদি অনিরাপদ, অস্বাস্থ্যকর, বিশৃঙ্খল বা অনুপ্রেরণাহীন হয়, তাহলে শিক্ষার গুণগত মান কখনোই প্রত্যাশিত পর্যায়ে পৌঁছাবে না। তাই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভৌত অবকাঠামোকে শুধু ভবন নির্মাণের মধ্যে সীমাবদ্ধ না দেখে, শিক্ষার্থীদের মানসিক, শারীরিক, এবং বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশের সহায়ক পরিবেশ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।

বাংলাদেশের বাস্তবতায় এখনো অনেক বিদ্যালয়, কলেজ এবং এমনকি কিছু বিশ্ববিদ্যালয়েও পর্যাপ্ত শ্রেণিকক্ষ, মানসম্মত আসবাবপত্র, গবেষণাগার, লাইব্রেরি, বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা এবং স্বাস্থ্যসম্মত স্যানিটেশন সুবিধার অভাব রয়েছে। কোথাও শিক্ষার্থীরা গাদাগাদি করে বসে ক্লাস করে, কোথাও পর্যাপ্ত আলো-বাতাস নেই, আবার কোথাও নিরাপদ খেলার মাঠ বা মুক্তভাবে চলাফেরার পরিবেশ নেই। বিশেষ করে গ্রামীণ এবং প্রত্যন্ত অঞ্চলের অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অবকাঠামোগত বৈষম্য আরও প্রকট। ফলে শহর ও গ্রামের শিক্ষার্থীদের মধ্যে সুযোগের পার্থক্য ধীরে ধীরে আরও বেড়ে যায়।

একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শ্রেণিকক্ষ এমন হওয়া উচিত যেখানে শিক্ষার্থীরা স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করবে এবং মনোযোগ দিয়ে পাঠ গ্রহণ করতে পারবে। পর্যাপ্ত আলো-বাতাস, পরিচ্ছন্ন পরিবেশ, আরামদায়ক বসার ব্যবস্থা এবং প্রযুক্তি ব্যবহারের সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে। অনেক সময় দেখা যায়, শ্রেণিকক্ষের পরিবেশ এতটাই অনুপযোগী যে শিক্ষার্থীরা দীর্ঘ সময় মনোযোগ ধরে রাখতে পারে না। অথচ শিক্ষার্থীদের শেখার আগ্রহ ও মনোযোগ অনেকাংশে পরিবেশের ওপর নির্ভরশীল

ছবি: প্রথম আলো

লাইব্রেরিকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রাণকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। বর্তমানে অনেক শিক্ষার্থী শুধু পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য নোট বা গাইডবইয়ের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে। এর অন্যতম কারণ মানসম্মত লাইব্রেরি সংস্কৃতির অভাব। শিক্ষার্থীদের মধ্যে পাঠাভ্যাস গড়ে তুলতে হলে বিদ্যালয়, কলেজ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে আধুনিক ও সমৃদ্ধ লাইব্রেরি নিশ্চিত করা প্রয়োজন। সেখানে পাঠ্যবইয়ের পাশাপাশি সাহিত্য, ইতিহাস, বিজ্ঞান, দর্শন, জীবনী, গবেষণা এবং সমসাময়িক বিষয়ভিত্তিক বই সহজলভ্য থাকতে হবে। শিশুদের জন্য আলাদা পাঠাগার পরিবেশ তৈরি করা যেতে পারে, যেখানে তারা আনন্দের সঙ্গে বই পড়ার অভ্যাস গড়ে তুলবে।

বিজ্ঞান, প্রযুক্তি এবং কারিগরি শিক্ষার জন্য মানসম্মত ল্যাবরেটরি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শুধু বই পড়ে বিজ্ঞান শেখা সম্ভব নয়; বাস্তব পরীক্ষণ এবং হাতে-কলমে কাজের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের শেখার সুযোগ দিতে হবে। অনেক সময় দেখা যায়, ল্যাব থাকলেও প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি নেই, অথবা সেগুলো ব্যবহার উপযোগী নয়। ফলে শিক্ষার্থীরা তাত্ত্বিক জ্ঞানের বাইরে বাস্তব দক্ষতা অর্জন করতে পারে না। প্রযুক্তিনির্ভর বর্তমান বিশ্বে এটি বড় ধরনের সীমাবদ্ধতা তৈরি করছে।

বর্তমান যুগে তথ্যপ্রযুক্তি শিক্ষাব্যবস্থার একটি অপরিহার্য অংশ। তাই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নির্ভরযোগ্য ইন্টারনেট সংযোগ, কম্পিউটার ল্যাব এবং ডিজিটাল শিক্ষাসামগ্রীর ব্যবস্থা থাকতে হবে। তবে প্রযুক্তির ব্যবহার যেন শুধু বাহ্যিক প্রদর্শনীতে সীমাবদ্ধ না থাকে। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম তৈরি করা হলেও সেগুলো কার্যকরভাবে ব্যবহার করা হয় না। প্রযুক্তিকে এমনভাবে ব্যবহার করতে হবে যেন তা শিক্ষার্থীদের শেখাকে আরও সহজ, বাস্তবভিত্তিক, এবং আকর্ষণীয় করে তোলে।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড এবং সৃজনশীল চর্চার জন্যও পর্যাপ্ত সুযোগ থাকতে হবে। বর্তমানে অনেক প্রতিষ্ঠান শুধু পরীক্ষার ফলাফলের ওপর অতিরিক্ত গুরুত্ব দিতে গিয়ে শিক্ষার্থীদের মানসিক ও শারীরিক বিকাশের অন্যান্য দিকগুলোকে উপেক্ষা করে। অথচ খেলাধুলা, বিতর্ক, সংগীত, নাটক, এবং অন্যান্য সাংস্কৃতিক কার্যক্রম শিক্ষার্থীদের আত্মবিশ্বাস, নেতৃত্ব, দলগত কাজের দক্ষতা, এবং মানসিক সুস্থতা গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

নিরাপদ এবং স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশ নিশ্চিত করাও অত্যন্ত জরুরি। বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা, পরিচ্ছন্ন টয়লেট, স্বাস্থ্যবিধি, এবং নিরাপত্তাব্যবস্থা শিক্ষার্থীদের মৌলিক অধিকার। বিশেষ করে ছাত্রীদের জন্য নিরাপদ ও স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশ নিশ্চিত না হলে অনেক ক্ষেত্রে তাঁদের শিক্ষাজীবন বাধাগ্রস্ত হতে পারে। বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিক্ষার্থীদের জন্যও সহজগম্য অবকাঠামো নিশ্চিত করা প্রয়োজন, যেন তাঁরা সমান সুযোগ নিয়ে শিক্ষা গ্রহণ করতে পারেন।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রশাসনিক পরিবেশও শিক্ষার গুণগত মানের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। যদি প্রতিষ্ঠানে বিশৃঙ্খলা, রাজনৈতিক সহিংসতা, ভয়ভীতি, বা অস্বাস্থ্যকর প্রতিযোগিতার পরিবেশ থাকে, তাহলে শিক্ষার্থীরা মানসিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হওয়া উচিত নিরাপদ, ইতিবাচক, এবং মুক্তচিন্তার পরিবেশ যেখানে শিক্ষার্থীরা নির্ভয়ে মতপ্রকাশ করতে পারবে এবং নিজেদের বিকশিত করার সুযোগ পাবে।

বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশে অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা এক দিনে দূর করা সম্ভব নয়। তবে পরিকল্পিত বিনিয়োগ, দুর্নীতিমুক্ত বাস্তবায়ন এবং দীর্ঘমেয়াদি দৃষ্টিভঙ্গির মাধ্যমে ধীরে ধীরে একটি মানসম্মত শিক্ষা-সহায়ক পরিবেশ গড়ে তোলা সম্ভব। কারণ, একজন শিক্ষার্থী শুধু বই থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে না; সে তার চারপাশের পরিবেশ থেকেও শিক্ষা নেয়। তাই শিক্ষার পরিবেশ যত উন্নত, শিক্ষার মানও তত উন্নত হওয়ার সম্ভাবনা বৃদ্ধি পায়।

লেখক

শেষ কথা

আমরা এমন একটি শিক্ষাব্যবস্থা চাই, যা শুধু পরীক্ষায় ভালো ফল করা বা সনদ অর্জনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না বরং এমন মানুষ তৈরি করবে, যারা চিন্তাশীল, মানবিক, দায়িত্বশীল, নৈতিক, এবং আত্মনির্ভরশীল নাগরিক হিসেবে সমাজ ও রাষ্ট্রের উন্নয়নে ভূমিকা রাখতে সক্ষম হবে। কারণ, শিক্ষা শুধু চাকরি পাওয়ার মাধ্যম নয়; শিক্ষা একজন মানুষকে মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রক্রিয়া।

প্রকৃত শিক্ষা এমন হওয়া উচিত, যা শিক্ষার্থীদের প্রশ্ন করতে শেখায়, যুক্তি দিয়ে চিন্তা করতে শেখায়, মতভিন্নতাকে সম্মান করতে শেখায়, এবং জীবন ও সমাজকে গভীরভাবে বুঝতে সহায়তা করে। এমন শিক্ষা, যা একজন শিক্ষার্থীর মধ্যে আত্মবিশ্বাস সৃষ্টি করবে, ব্যর্থতা থেকে শিক্ষা নেওয়ার সাহস দেবে, এবং তাকে নিজের পায়ে দাঁড়াতে শেখাবে। শিক্ষা কখনোই এমন হওয়া উচিত নয়, যেখানে একজন শিক্ষার্থী সব সময় অন্যের ওপর নির্ভরশীল থাকবে, কোচিং, নোট, বা মুখস্থ বিদ্যার ‘ধাক্কা’ ছাড়া সামনে এগোতে পারবে না। বরং শিক্ষা এমন হওয়া উচিত, যা একজন মানুষকে স্বাধীনভাবে চিন্তা করতে, সিদ্ধান্ত নিতে, এবং বাস্তব জীবনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে সক্ষম করে তোলে।

আমাদের মনে রাখতে হবে, একটি উন্নত শিক্ষাব্যবস্থা রাতারাতি গড়ে ওঠে না। এর জন্য প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, দক্ষ ও মানবিক শিক্ষক, যুগোপযোগী পাঠ্যক্রম, মানসম্মত অবকাঠামো, দায়িত্বশীল অভিভাবক, এবং শিক্ষার্থীবান্ধব সামাজিক পরিবেশ। সবচেয়ে বড় কথা, প্রয়োজন আন্তরিকতা এবং শিক্ষাকে সত্যিকার অর্থে জাতি গঠনের প্রধান হাতিয়ার হিসেবে দেখার মানসিকতা।

শিক্ষাব্যবস্থার পরিবর্তন শুধু নতুন সিলেবাস প্রণয়ন বা পরীক্ষা পদ্ধতি পরিবর্তনের মাধ্যমে সম্ভব নয়। পরিবর্তন আনতে হবে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গিতে, আমরা শিক্ষাকে কীভাবে দেখি, শিক্ষার্থীদের কীভাবে মূল্যায়ন করি, এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে কেমন মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে চাই। কারণ, একটি দেশের ভবিষ্যৎ নির্ভর করে তার শিক্ষাব্যবস্থার ওপর, আর শিক্ষাব্যবস্থার ভবিষ্যৎ নির্ভর করে আমরা আজ কী সিদ্ধান্ত নিচ্ছি, কী মূল্যবোধ ধারণ করছি, এবং আমাদের সন্তানদের জন্য কেমন সমাজ রেখে যেতে চাই, তার ওপর।

যদি আমরা সত্যিকার অর্থে একটি উন্নত, মানবিক এবং জ্ঞানভিত্তিক বাংলাদেশ গড়তে চাই, তাহলে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থাকে পরীক্ষানির্ভর প্রতিযোগিতা থেকে বের করে এনে শেখার আনন্দ, মানবিকতা, সৃজনশীলতা, এবং দায়িত্ববোধের ওপর প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। কারণ, একটি জাতির সবচেয়ে বড় সম্পদ তার প্রাকৃতিক সম্পদ নয়; তার সবচেয়ে বড় সম্পদ হচ্ছে শিক্ষিত, সচেতন, এবং মানবিক মানুষ।

* লেখক: মোহাম্মদ রাজিব হাসান, লেকচারার ইন ইকোনমিকস অ্যান্ড বিজনেস, চার্লস ডারউইন ইউনিভার্সিটি, ডারউইন, অস্ট্রেলিয়া, এবং

সাবেক অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, দিনাজপুর, বাংলাদেশ। ই-মেইল: [email protected]