এইচএসসির ব্যবহারিক পরীক্ষা যখন আনুষ্ঠানিকতা, বিজ্ঞানশিক্ষা তখন বিপন্ন
একটি জাতির মেধার মানচিত্র কেমন হবে, তা বহুলাংশে নির্ভর করে তার শিক্ষাব্যবস্থার গভীরতার ওপর। অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হলো, বাংলাদেশের বিজ্ঞানশিক্ষা–ব্যবস্থার বর্তমান সংকটটি আজ আর কেবল অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতার চেনা বৃত্তে বন্দী নেই। এটি ক্রমশ রূপ নিচ্ছে এক গভীর নৈতিক অবক্ষয়, প্রশাসনিক পঙ্গুত্ব এবং মূল্যায়নপদ্ধতির মজ্জাগত ব্যাধিতে। যে বিজ্ঞানশিক্ষার মূল ভিত্তিই হওয়ার কথা ছিল নিরবচ্ছিন্ন অনুসন্ধান, সূক্ষ্ম পর্যবেক্ষণ, নিয়মতান্ত্রিক পরীক্ষণ এবং আপসহীন যুক্তিবোধ, তা আজ বহুলাংশে পর্যবসিত হয়েছে নিছক খাতা পূরণ, নম্বর বণ্টন আর ফলাফলকেন্দ্রিক এক যান্ত্রিক আনুষ্ঠানিকতায়। শিক্ষার্থীরা জিপিএ-৫-এর সোনালি হরিণ মুঠোয় পুরছে ঠিকই, কিন্তু বিজ্ঞানের শাশ্বত আত্মা থেকে তারা বিচ্যুত হয়ে পড়ছে চরমভাবে।
বিজ্ঞান কখনোই কেবল চারদেয়ালের মধ্যে বন্দী পাঠ্যবইয়ের অক্ষরের সমষ্টি ছিল না। নিউটনের গতিসূত্র, অ্যাভোগাড্রোর ধ্রুবক কিংবা ফ্যারাডের তড়িৎ-চৌম্বকীয় তত্ত্ব কেবল মুখস্থ করে আর যা–ই হোক, বিজ্ঞানী হওয়া যায় না। বিজ্ঞানের প্রকৃত পাঠশালা হলো পরীক্ষাগার। রাসায়নিক বিক্রিয়ায় টেস্টটিউবের ভেতরের রং বদলানো, টাইট্রেশনের শেষ বিন্দুটি নিপুণভাবে নির্ণয় করা কিংবা অজ্ঞাত লবণের চরিত্র বিশ্লেষণ করে সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর যে রোমাঞ্চ, তার মধ্য দিয়েই একজন শিক্ষার্থীর ভেতর বৈজ্ঞানিক মনস্তত্ত্বের বীজ রোপিত হয়।
এ সংকটকে আরও ঘনীভূত করেছে প্রদর্শকদের প্রভাষক পদে পদোন্নতির বিদ্যমান বিধান। এর ফলে তাঁদের দীর্ঘদিনের অর্জিত ল্যাবভিত্তিক দক্ষতা ও অভিজ্ঞতার যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত হচ্ছে না। এর ফলে রসায়ন, পদার্থবিজ্ঞান, জীববিজ্ঞানসহ বিভিন্ন বিষয়ের ল্যাবরেটরিগুলো দক্ষ ও অভিজ্ঞ জনবলের সংকটে ভুগছে। ফলে সরকারি কলেজগুলোর ব্যবহারিক শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। দেশের অসংখ্য মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ল্যাবরেটরিগুলো আজ কার্যত একেকটি নিথর সংগ্রহশালা। কোথাও মহামূল্যবান যন্ত্রপাতি বছরের পর বছর অব্যবহৃত থেকে মরচে ধরছে, কোথাও রাসায়নিকের তীব্র সংকট, কোথাও পদোন্নতির ফলে অভিজ্ঞ প্রদর্শকের পদটি শূন্য, আবার কোথাওবা ল্যাবরেটরিটি সাজিয়ে রাখা হয়েছে কেবল ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের পরিদর্শনের দিন ক্ষণিকের দেখনদারির জন্য। বাস্তবতা এতটাই নির্মম যে উচ্চমাধ্যমিকের গণ্ডি পেরিয়ে যাওয়া অনেক শিক্ষার্থীও জীবনে কখনো একটি সাধারণ লিটমাস পেপারের পরীক্ষা স্বচক্ষে দেখেনি। সল্ট অ্যানালাইসিস কিংবা তন্ত্র অথবা অঙ্গ ব্যবচ্ছেদের মতো মৌলিক পাঠগুলো তাদের কাছে কেবলই পাঠ্যবইয়ের দূরবর্তী ভাষা। অথচ আশ্চর্যের বিষয়, বোর্ড পরীক্ষায় এই শিক্ষার্থীরাই ব্যবহারিক মূল্যায়নে ২৫-এ ২৫ পাচ্ছে। এ যেন প্রায়োগিক জ্ঞানহীন এক কৃত্রিম মেধা উৎপাদনের আত্মঘাতী কারখানা।
রাজধানীর হাতে গোনা কয়েকটি নামী কলেজ হয়তো এখনো বিজ্ঞানশিক্ষার ন্যূনতম পরিবেশটুকু কোনোমতে টিকিয়ে রেখেছে। কিন্তু মফস্সল কিংবা উপজেলা পর্যায়ের চিত্রটি একেবারেই অন্ধকার। সেখানে বছরের অধিকাংশ সময় পরীক্ষাগারগুলোতে ঝুলতে দেখা যায় তালা। প্রাক্-নির্বাচনী কিংবা বার্ষিক কোনো পরীক্ষাতেই প্রকৃত ব্যবহারিক মূল্যায়ন হয় না। পরীক্ষার নামে কয়েক ঘণ্টার এক প্রহসনমূলক উপস্থিতির খেরোখাতায় সই করে শত শত শিক্ষার্থীকে নির্বিচার নম্বর বিলিয়ে দেওয়া হচ্ছে। ফলে বিজ্ঞানশিক্ষা আজ এক বিকৃত ‘নম্বর-অর্থনীতি’তে রূপ নিয়েছে, যেখানে মৌলিক কৌতূহল বা অনুসন্ধিৎসার কোনো মূল্য নেই, মুখস্থবিদ্যাই সেখানে পরম যোগ্যতা।
শিক্ষাক্ষেত্রের এই ব্যাধির গভীরতা অনুধাবন করা যায় মাঠপর্যায়ের কিছু সুনির্দিষ্ট অভিযোগের দিকে তাকালে। সবচেয়ে উদ্বেগের জায়গাটি হলো, এই ব্যবহারিক পরীক্ষার মূল্যায়নকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা প্রাতিষ্ঠানিক অনিয়মের জাল। বোর্ডগুলো নিয়মতান্ত্রিকভাবে বহিঃপরীক্ষক নিয়োগ দিলেও অনেক সময় পরীক্ষাকেন্দ্র তাঁদের সময়মতো রুটিন জানানো হয় না। সামান্য কিছু অন্যায্য আর্থিক সুবিধা ও নির্দিষ্ট কিছু প্রতিষ্ঠানের ভালো ফলের লোভে বছরের পর বছর এই মূল্যায়ন প্রক্রিয়াকে ধ্বংস করা হচ্ছে। যেমন মিরপুর কলেজের রসায়ন বিভাগের একজন প্রভাষকের ব্যবহারিক পরীক্ষার পুরো প্রক্রিয়াকে কুক্ষিগত করার অভিযোগ উঠেছে, যেখানে রুটিন সরবরাহ না করে উল্টো বহিঃপরীক্ষকদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার ও অসহযোগিতা করে তাঁদের স্বাধীন ও সক্রিয় অংশগ্রহণকে নিরুৎসাহিত করা হয় শুধু যাতে বহিঃপরীক্ষক অনুপস্থিতির সুযোগে তাঁর সম্মানীটি আত্মসাৎ করা যায়। সবচেয়ে ভয়াবহ হলো, বহিঃপরীক্ষকের জাল স্বাক্ষর দিয়ে খাতা বোর্ডে পাঠিয়ে দেওয়া। এটি পরীক্ষা আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। এই ব্যাধি কেবল একটি কেন্দ্রে সীমাবদ্ধ নয়। কামারপাড়া স্কুল অ্যান্ড কলেজ কেন্দ্রেও প্রায় ছয় হাজার পরীক্ষার্থীর ব্যবহারিক পরীক্ষা সামাল দিতে কার্যত মাত্র একজন অন্তঃপরীক্ষক দায়িত্ব পালন করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। আরও গুরুতর বিষয় হলো বিপুলসংখ্যক পরীক্ষার্থী একটি নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানের এবং সেই একই কলেজের খণ্ডকালীন শিক্ষকদের দিয়ে পরীক্ষা পরিচালনা করা হয়েছে, যা পরীক্ষা বিধিমালার স্পষ্ট লঙ্ঘন। পরীক্ষার্থী ও পরীক্ষক যখন একই স্বার্থের সূত্রে গেঁথে যান, তখন মূল্যায়নের নিরপেক্ষতা এক বড় প্রহসনে পরিণত হয়। একইভাবে ডেমরা কলেজ কেন্দ্রসহ বেশ কয়েকটি কেন্দ্রকে ঘিরেও শিক্ষক মহলে দীর্ঘদিনের ক্ষোভ ও অসন্তোষ রয়েছে। অনেক বহিঃপরীক্ষক আড়ালে স্বীকার করেন, প্রতিষ্ঠানের ‘শতভাগ সাফল্য’ টিকিয়ে রাখার জন্য ২৫-এ ২৫ নম্বর দেওয়ার অদৃশ্য মনস্তাত্ত্বিক চাপ সৃষ্টি করা হয়। ফলে ল্যাবরেটরি আর জ্ঞান যাচাইয়ের আঙিনা থাকে না, তা হয়ে ওঠে ফলাফল–বাণিজ্যের হাতিয়ার। কোনো কোনো কেন্দ্রে বহিঃপরীক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে শিক্ষকেরা লড়ছেন অভ্যন্তরীণ সিন্ডিকেটের দেয়ালের বিরুদ্ধে।
এতে কেবল পরীক্ষাপদ্ধতির বিশ্বাসযোগ্যতাই ধূলিসাৎ হচ্ছে না, তরুণ প্রজন্মের বিজ্ঞানমনস্কতাও নীরবে পঙ্গু হয়ে যাচ্ছে।
এই সংকটের গভীরতা বুঝতে একবার তুলনামূলক দৃষ্টি দেওয়া প্রয়োজন। প্রতিবেশী ভারতের কেন্দ্রীয় মাধ্যমিক শিক্ষা পর্ষদ অর্থাৎ সিবিএসই (CBSE), দ্বাদশ শ্রেণির বিজ্ঞান ব্যবহারিক পরীক্ষায় বোর্ড-নিযুক্ত বহিঃপরীক্ষকের পাশাপাশি প্রয়োজনে স্বতন্ত্র পর্যবেক্ষক নিয়োগের বিধান রেখেছে এবং পরীক্ষার দিনই নম্বর কেন্দ্রীয় অনলাইন পোর্টালে আপলোড করা বাধ্যতামূলক করেছে, যাতে মধ্যস্থতার কোনো সুযোগ না থাকে। সিঙ্গাপুরের Singapore Examinations and Assessment Board (SEAB) পরিচালিত O-Level বিজ্ঞান ব্যবহারিক পরীক্ষায় পাঁচটি সুনির্দিষ্ট দক্ষতা-মানদণ্ডের বিপরীতে মূল্যায়ন করা হয় এবং এই ব্যবহারিক অংশ মোট নম্বরের ২০ শতাংশ বহন করে, অর্থাৎ এটি কোনো আনুষ্ঠানিকতা নয়, একটি নির্ণায়ক পরীক্ষা। আর ফিনল্যান্ডে উচ্চমাধ্যমিক স্তরে সারা বছরের শিক্ষক-পর্যবেক্ষণ, শ্রেণিকক্ষে অংশগ্রহণ এবং ধারাবাহিক মূল্যায়নই শিক্ষার্থীর মেধার প্রধান বিচারক। মূল্যায়নকে জ্ঞানের আয়না করা, ফলাফল ব্যবস্থাপনার হাতিয়ার নয়। আমরা সেই পথ থেকে কতটা বিচ্যুত, তা বুঝতে কোনো বিশেষজ্ঞ মতামতের প্রয়োজন নেই; যেকোনো উপজেলা কলেজের ব্যবহারিক পরীক্ষার কক্ষে একদিন বসলেই উত্তর মিলবে।
এর সমান্তরালে বিজ্ঞানের শিক্ষকদের একটি দীর্ঘদিনের যৌক্তিক ক্ষোভকেও আমলে নেওয়া প্রয়োজন। শুধু কড়াকড়ি আরোপ করলেই সংকটের সমাধান হবে না; শ্রমের ন্যায্য স্বীকৃতি না দিলে নৈতিকতার আহ্বান অর্থহীন হয়ে পড়ে। বোর্ডের ব্যবহারিক খাতা পুনর্মূল্যায়ন (চ্যালেঞ্জ হওয়া ব্যবহারিক খাতা) থেকে শুরু করে নিজ কলেজের শিক্ষার্থীদের ল্যাব নোটবুক মূল্যায়ন, কোথাও সম্মানীর ব্যবস্থা নেই। অথচ একটি ব্যবহারিক খাতা মূল্যায়ন করা অত্যন্ত শ্রমসাধ্য ও সময়সাপেক্ষ বিষয়। সেখানে প্রতিটি পরীক্ষণের ধাপ, রাসায়নিক সমীকরণ, হিসাব-নিকাশ এবং ত্রুটি বিশ্লেষণ সূক্ষ্মভাবে দেখতে হয়। যেখানে বাণিজ্য বিভাগের শিক্ষকেরা টার্ম পেপার মূল্যায়নের জন্য পৃথক সম্মানী পান, সেখানে বিজ্ঞানের শিক্ষকেরা বছরের পর বছর এই বিপুল শ্রম দিচ্ছেন সম্পূর্ণ বিনা পারিশ্রমিকে। এই প্রাতিষ্ঠানিক বৈষম্যের ফলে অনেক শিক্ষকের মধ্যে মূল্যায়নের প্রতি একধরনের অনীহা তৈরি হচ্ছে, যার চূড়ান্ত মাশুল দিচ্ছে শিক্ষার্থীরা।
আমরা মনে করি, এসব সুনির্দিষ্ট ও কাঠামোগত অভিযোগের ঊর্ধ্বে উঠে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের একটি উচ্চপর্যায়ের ও নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি গঠন করা আজ সময়ের দাবি। এটি কোনো ব্যক্তি-আক্রমণের বিষয় নয়; এটি আমাদের সামগ্রিক শিক্ষাকাঠামোর অস্তিত্বের প্রশ্ন। যদি ব্যবহারিক পরীক্ষা কেবলই খাতার পাতায় সীমাবদ্ধ থাকে, যদি নম্বর আগে থেকেই নির্ধারিত হয়ে থাকে, তবে বিজ্ঞানশিক্ষার কঙ্কালটিই শুধু অবশিষ্ট থাকবে, প্রাণ বিলুপ্ত হবে।
এই সংকট থেকে উত্তরণের পথ এখনই খুঁজতে হবে। প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ল্যাবরেটরির কার্যকারিতা বাধ্যতামূলক করতে হবে। বার্ষিক ও নির্বাচনী পরীক্ষায় ব্যবহারিক নম্বরকে চূড়ান্ত ফলাফলে কঠোরভাবে যুক্ত করতে হবে। বহিঃপরীক্ষকদের উপস্থিতি নিশ্চিত করতে বায়োমেট্রিক বা ডিজিটাল ট্র্যাকিং এবং আকস্মিক অডিট চালু করা যেতে পারে। একই সঙ্গে বিজ্ঞানের শিক্ষকদের খাতা মূল্যায়নের জন্য পৃথক সম্মানী এবং গবেষণার অনুকূল পরিবেশ নিশ্চিত করা আবশ্যক।
ব্যবহারিকহীন বিজ্ঞানশিক্ষা হয়তো সাময়িকভাবে জিপিএ-৫-এর বন্যা বইয়ে দিতে পারে, কিন্তু তা কখনো প্রকৃত বিজ্ঞানী, গবেষক কিংবা উদ্ভাবক তৈরি করতে পারে না। আর যে জাতির পরীক্ষাগারের বাতি নিভে যায়, সময়ের নিয়মে সেই জাতির উদ্ভাবন, শিল্পোন্নয়ন, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা এবং শেষ পর্যন্ত সামগ্রিক ভবিষ্যৎও অন্ধকারাচ্ছন্ন হতে বাধ্য।
*লেখক: সচিব তালুকদার, শিক্ষক, রসায়ন