এইচএসসি পরীক্ষা ২০২৬ : ভাবসম্প্রসারণটা তোমরা পড়ে নাও

এইচএসসি পরীক্ষা শুরুর আগে আরেকবার পড়াশোনা চলছে।প্রথম আলো ফাইল ছবি

বাংলা ২য় পত্র: ভাবসম্প্রসারণ

সাহিত্য জাতির দর্পণস্বরূপ

মূলভাব: আয়নার সামনে দাঁড়ালে যেমন নিজের অবয়ব স্পষ্ট দেখা যায়, তেমনি সাহিত্যের পাতায় প্রতিফলিত হয় একটি জাতির ইতিহাস, ঐতিহ্য, আবেগ, অনুভূতি ও সাংস্কৃতিক পরিচয়। সাহিত্য হলো একটি জাতির সামগ্রিক চিন্তা-চেতনা ও আশা-আকাঙ্ক্ষার অবিকল প্রতিচ্ছবি বা দর্পণ।

সম্প্রসারিত ভাব: সাহিত্যে মানবাত্মার স্বাধীন বিচরণ ঘটে। মানুষের মনের বিচিত্র, সুন্দর ও সূক্ষ্ম অনুভূতিগুলো সাহিত্যের মাধ্যমে আত্মপ্রকাশ করে। সাহিত্য মানবমনকে আনন্দ দেওয়ার এক অন্তহীন উৎস। সাহিত্য রচনা করতে গিয়ে লেখক যেমন সৃজনশীল আনন্দের সাগরে অবগাহন করেন, পাঠকমণ্ডলীও তা পাঠ করে অনাবিল আনন্দের আস্বাদ লাভ করেন। তবে সাহিত্য কেবলই আনন্দের অনুষঙ্গ নয়; এতে জাতির সমকালীন ও ঐতিহাসিক জীবনযাত্রার বাস্তব চিত্রও ফুটে ওঠে। সাহিত্যিকেরা সমাজেরই সন্তান এবং সমাজের প্রতি তাঁদের দায়বদ্ধতা অপরিসীম। সমাজের প্রতিটি অসংগতি ও রূপান্তর সাহিত্যিকেরা যেভাবে গভীর অন্তর্দৃষ্টি দিয়ে প্রত্যক্ষ করতে পারেন, তা সাধারণের পক্ষে সম্ভব নয়। এই সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকেই বাস্তবতাকে কল্পনার তুলিতে সাজিয়ে তাঁরা সাহিত্যজগৎ সমৃদ্ধ করেন। সাহিত্য কেবল সমাজের বাহ্যিক রূপকে ধারণ করে না, মানুষের মনস্তাত্ত্বিক দিকটিকেও ফুটিয়ে তোলে। এ কারণেই বলা হয়: ‘Literature is the criticism of life’. সাহিত্য সরাসরি ইতিহাস না হলেও কোনো নির্দিষ্ট সময়ের সামাজিক চিত্র ইতিহাসে যতটা শুষ্কভাবে থাকে, সাহিত্যে তা অনেক বেশি প্রাণবন্ত ও সামগ্রিকভাবে ধরা পড়ে। মনীষী কুরথোপ যথার্থই বলেছেন, ‘সাহিত্য কোনো ব্যক্তিবিশেষের ভাবরাজ্যের প্রতিষ্ঠান নয়, তা জাতির অভ্যন্তরীণ প্রতিচ্ছবিমাত্র।’ আয়নায় যেমন মানুষ নিজের মুখ দেখতে পায়, ঠিক তেমনি সাহিত্যে একটি জনপদের নির্দিষ্ট সময়ের চিত্র সংরক্ষিত থাকে। যেমন—বাংলা সাহিত্যের প্রাচীন নিদর্শন চর্যাপদ-এ তৎকালীন বাংলার সমাজজীবন, পেশা, সংস্কৃতি ও মানুষের জীবনসংগ্রামের নানা দিক প্রতিফলিত হয়েছে। মধ্যযুগের শ্রীকৃষ্ণকীর্তন কাব্যে বাংলার সামাজিক রীতি, লোকজ সংস্কৃতি ও মানবসম্পর্কের চিত্র ফুটে উঠেছে। 

একইভাবে গিরিশচন্দ্র ঘোষের সিরাজউদ্দৌলা নাটকে মীরজাফরের বিশ্বাসঘাতকতার ঐতিহাসিক ট্র্যাজেডি মূর্ত হয়েছে। সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর লালসালু উপন্যাসে ধর্মের নামে মজিদের শোষণের চিত্র এবং মুনীর চৌধুরীর কবর নাটক ও জহির রায়হানের আরেক ফাল্গুন উপন্যাসে ভাষা আন্দোলনের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস দীপ্তমান। মুক্তিযুদ্ধের ওপর রচিত বিভিন্ন উপন্যাসে পাকিস্তানি বাহিনীর গণহত্যা এবং রাজাকার-আলবদরদের বর্বরতার পাশাপাশি বাঙালির বীরত্বগাথা সাহিত্যেই অমর হয়ে আছে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘অপরিচিতা’ গল্পে যৌতুকপ্রথার করাল গ্রাস এবং কাজী নজরুল ইসলামের ‘অগ্নিঝরা’ কবিতায় ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে সংগ্রামের চেতনা প্রতিফলিত হয়েছে। বিশ্বসাহিত্যের দিকে তাকালে দেখা যায়, হ্যারিয়েট বিচার স্টো-এর Uncle Tom’s Cabin আমেরিকার ক্রীতদাসদের ওপর অমানবিক নির্যাতনের দলিল। লিও টলস্টয়ের War and Peace যুদ্ধের ভয়াবহতা ও মানবিক মূল্যবোধ সম্পর্কে গভীর উপলব্ধি সৃষ্টি করে। রুশো ও ভলতেয়ারের চিন্তা ও রচনা ফরাসি বিপ্লবের বুদ্ধিবৃত্তিক ভিত্তি নির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল।

মন্তব্য: সাহিত্য কেবল গল্প-কবিতার সমাহার নয়, এটি একটি জাতির সামগ্রিক জীবনযাত্রার ধারক ও বাহক। সাহিত্যের মাধ্যমেই বিশ্বদরবারে একটি জাতির স্বরূপ উন্মোচিত হয়। তাই বলা চলে: ‘Literature is the mirror of a nation’.


ফারুক আহমেদ আবির, প্রভাষক
মোহাম্মদপুর প্রিপারেটরি স্কুল অ্যান্ড কলেজ, ঢাকা