প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণিতে আবার ফিরল পরীক্ষা, মূল্যায়ন হবে কীভাবে

পুরান ঢাকার রাজার দেউরি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীরাফাইল ছবি: প্রথম আলো

প্রাথমিক শিক্ষায় আবারও মূল্যায়নের পদ্ধতিতে পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়। নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, চলতি বছর থেকেই প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণিতেও সামষ্টিক মূল্যায়ন (পরীক্ষা) চালু হচ্ছে। ২০২৩ সালে নতুন শিক্ষাক্রম বাস্তবায়নের পর এ দুই শ্রেণিকে পরীক্ষা বাদ দিয়ে পুরোপুরি ধারাবাহিক মূল্যায়নব্যবস্থা চালু করা হয়েছিল।

দুই বছর না যেতেই সেই সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসছে সরকার। তবে ছোট শিশুদের ওপর পরীক্ষার বোঝা চাপিয়ে দেওয়া কতটা যৌক্তিক, সে প্রশ্নও উঠেছে।

নতুন মূল্যায়নপদ্ধতির সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে ১ ফেব্রুয়ারি প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ও জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের চেয়ারম্যানকে চিঠি দিয়েছে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়। চিঠিতে বলা হয়, গত ২৬ জানুয়ারি প্রাথমিক স্তরে ২০২৬ শিক্ষাবর্ষে বাস্তবায়নের জন্য পরিমার্জিত মূল্যায়ন নির্দেশিকা নিয়ে অনুষ্ঠিত সভায় এ সিদ্ধান্ত হয়েছে।

দুই বছর না যেতেই সেই সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসছে সরকার। তবে ছোট শিশুদের ওপর পরীক্ষার বোঝা চাপিয়ে দেওয়া কতটা যৌক্তিক, সে প্রশ্নও উঠেছে।

জানতে চাইলে মূল্যায়নের নতুন এ সিদ্ধান্তের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (বিদ্যালয়) শাহানা সারমিন।

সামষ্টিক মূল্যায়ন হলো প্রশ্নপত্রের মাধ্যমে নেওয়া মূল্যায়ন, যা মূলত প্রচলিত পরীক্ষা। আর ধারাবাহিক মূল্যায়ন হলো বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীর সারা বছরে বিভিন্ন কার্যক্রমের মাধ্যমে মূল্যায়ন।

শিশুদের পড়ানো হচ্ছে
ফাইল ছবি: প্রথম আলো
আরও পড়ুন

নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণিতে যেসব বিষয়ে পাঠ্যপুস্তক ও শিক্ষক সহায়িকার মাধ্যমে পাঠদান কার্যক্রম পরিচালিত হয়, সেসব বিষয়ে ৫০ শতাংশ ধারাবাহিক মূল্যায়ন ও ৫০ শতাংশ সামষ্টিক মূল্যায়ন থাকবে। তবে যেসব বিষয়ে কেবল শিক্ষক সহায়িকার মাধ্যমে পাঠদান করা হয়, সেসব বিষয়ে শতভাগ ধারাবাহিক মূল্যায়ন বহাল থাকছে, অর্থাৎ এ দুই শ্রেণিতে ধারাবাহিক মূল্যায়নের পাশাপাশি পরীক্ষাও থাকবে।

একই সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, তৃতীয় থেকে পঞ্চম শ্রেণিতে যেসব বিষয়ে পাঠ্যপুস্তক ও শিক্ষক সহায়িকার মাধ্যমে পাঠদান কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়, সেসব বিষয়ে ধারাবাহিক মূল্যায়ন ৩০ শতাংশ ও ৭০ শতাংশ সামষ্টিক মূল্যায়ন থাকবে। তবে এসব শ্রেণিতে যে বিষয়ে শুধু শিক্ষক সহায়িকার মাধ্যমে পাঠদান কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়, সেসব বিষয়ে শতভাগ ধারাবাহিক মূল্যায়ন থাকবে।

শ্রেণিকক্ষে ঠিকমতো শেখানো হচ্ছে না, ঠিকমতো ধারাবাহিক মূল্যায়ন করা হচ্ছে না। সেটাই প্রান্তিক মূল্যায়নের নামে শিশুদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে।
মুহাম্মদ মাহবুব মোর্শেদ, সদস্য, প্রাথমিক ও উপানুষ্ঠানিক শিক্ষার মানোন্নয়নে পরামর্শক কমিটি

২০২৩ সালে প্রণীত নতুন শিক্ষাক্রম অনুযায়ী, তৃতীয় থেকে পঞ্চম শ্রেণিতে পাঠ্যপুস্তকের বিষয়গুলোতে ৫০ শতাংশ সামষ্টিক মূল্যায়ন ও ৫০ শতাংশ ধারাবাহিক মূল্যায়নের ব্যবস্থা ছিল।

এখন প্রশ্ন হলো, পাঠ্যপুস্তক ও শিক্ষক সহায়িকার মাধ্যমে পাঠদানের মধ্যে পার্থক্য কী। ঢাকার একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের একজন প্রধান শিক্ষক প্রথম আলোকে বলেন, প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণিতে তিনটি পাঠ্যপুস্তক আছে—বাংলা, ইংরেজি ও গণিত। এর বাইরে চারটি সহপাঠ বিষয় আছে, যেমন শিল্পকলা একটি। তিনি বলেন, তৃতীয় থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত ছয়টি পাঠ্যপুস্তক রয়েছে। এর বাইরে চারু, কারু ও কলা, শিল্পকলার মতো কয়েকটি (শ্রেণি অনুযায়ী আলাদা) সহপাঠ বিষয় আছে। নতুন সিদ্ধান্তের ফলে যেসব বিষয়ে পাঠ্যপুস্তক আছে, সেগুলোতে সামষ্টিক মূল্যায়ন ও ধারাবাহিক মূল্যায়ন—উভয় ব্যবস্থাই চালু হবে। আর সহপাঠ বিষয়গুলোর শতভাগ মূল্যায়ন হবে ধারাবাহিকভাবে।

সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বছরে তিনবার সামষ্টিক মূল্যায়ন হয়। এর মধ্যে প্রথম প্রান্তিক মূল্যায়ন হয় এপ্রিল মাসে, দ্বিতীয় প্রান্তিক মূল্যায়ন হয় আগস্টে ও চূড়ান্ত প্রান্তিক মূল্যায়ন হয় ডিসেম্বরের শুরুতে।

নতুন সিদ্ধান্তের ফলে যেসব বিষয়ে পাঠ্যপুস্তক আছে, সেগুলোতে সামষ্টিক মূল্যায়ন ও ধারাবাহিক মূল্যায়ন—উভয় ব্যবস্থাই চালু হবে। আর সহপাঠ বিষয়গুলোর শতভাগ মূল্যায়ন হবে ধারাবাহিকভাবে।

প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় বলছে, প্রতিটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় নিজ উদ্যোগে প্রান্তিক পরীক্ষার প্রশ্নপত্র তৈরি করবে। যদি তা সম্ভব না হয়, তাহলে পার্শ্ববর্তী একাধিক বিদ্যালয় একত্রে প্রশ্নপত্র প্রস্তুত করবে। প্রতি প্রান্তিক বিষয়ে সামষ্টিক মূল্যায়নে পাঠ্যপুস্তকের অনুশীলন থেকে কমপক্ষে ৩০ শতাংশ প্রশ্ন রাখতে হবে।

দরকার শিখন ও ধারাবাহিক মূল্যায়নে গুরুত্ব

প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের ২০২৪ সালের বার্ষিক প্রাথমিক বিদ্যালয় শুমারি অনুযায়ী, মোট প্রাথমিক বিদ্যালয় ১ লাখ ১৮ হাজারের বেশি। মোট শিক্ষার্থী দুই কোটির বেশি।

প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণিতে প্রান্তিক বা সামষ্টিক মূল্যায়নের পক্ষে নন প্রাথমিক ও উপানুষ্ঠানিক শিক্ষার মানোন্নয়নে সরকার গঠিত পরামর্শক কমিটির সদস্য এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক মুহাম্মদ মাহবুব মোর্শেদ। তাঁর প্রশ্ন, ছয়-সাত বছরের একটি শিশুর ওপর কেন প্রান্তিক মূল্যায়নের বোঝা চাপিয়ে দেওয়া হবে? প্রথম আলোকে তিনি বলেন, ‘আসলে শ্রেণিকক্ষে ঠিকমতো শেখানো হচ্ছে না, ঠিকমতো ধারাবাহিক মূল্যায়ন করা হচ্ছে না। সেটাই প্রান্তিক মূল্যায়নের নামে শিশুদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে। অথচ প্রতিটি শিশুর সামর্থ্য অনুযায়ী শিখন নিশ্চিত করা এবং ধারাবাহিক মূল্যায়নের ওপর গুরুত্ব দেওয়া উচিত।’

আরও পড়ুন