প্রাথমিক ও মাধ্যমিকে খেলাধুলা, সংস্কৃতিসহ চার বই যুক্ত হচ্ছে, কী শেখানো হবে

পাঠ্যবইপ্রতীকী ছবি

আগামী শিক্ষাবর্ষ (২০২৭) থেকে চতুর্থ ও ষষ্ঠ শ্রেণিতে দুটি করে চারটি নতুন পাঠ্যবই যুক্ত হচ্ছে। বইগুলোর নাম ও সেগুলোতে কী কী বিষয় অন্তর্ভুক্ত থাকবে, তার খসড়া কাঠামো ঠিক করেছে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি)। দু-তিন দিনের মধ্যেই কাঠামো চূড়ান্ত হবে। এ ছাড়া ২০২৮ সাল থেকে শিক্ষাক্রম আরও বিস্তৃত আকারে পরিমার্জন করে বড় পরিবর্তন আনা হবে।

এনসিটিবির তত্ত্বাবধানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের কয়েকজন শিক্ষকের নেতৃত্বে নতুন পাঠ্যবইয়ের বিষয়বস্তু নির্ধারণ, বই পরিমার্জন এবং শিক্ষাক্রম পরিমার্জনের কাজ চলছে। বর্তমানে কর্মশালার মাধ্যমে শেষ পর্যায়ের কাজ এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।

প্রাথমিকের শিক্ষার্থীরা
ফাইল ছবি: প্রথম আলো

এনসিটিবি এবং নতুন পাঠ্যবই প্রণয়নের সঙ্গে যুক্ত একাধিক সূত্রমতে, চতুর্থ শ্রেণিতে ‘খেলাধুলা’ ও ‘বাংলাদেশের সংস্কৃতি’ নামে দুটি নতুন বই যুক্ত হবে।

‘খেলাধুলা’ বইয়ে আটটি খেলার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এগুলো হলো ফুটবল, ক্রিকেট, ব্যাডমিন্টন, কাবাডি, দাবা, অ্যাথলেটিকস, সাঁতার ও মার্শাল আর্ট। খেলাধুলার ধারণা, গুরুত্ব ও উপকারিতা এবং বিভিন্ন ধরনের খেলা নিয়েও বিষয়বস্তু থাকবে। ‘শরীরচর্চা ও ব্যায়াম’ শিরোনামের একটি অধ্যায়ে ওয়ার্মআপ, স্ট্রেচিং, ফ্রি-হ্যান্ড ব্যায়াম, শ্বাসপ্রশ্বাস নিয়ন্ত্রণ এবং শরীরচর্চার উপকারিতা তুলে ধরা হবে। পাশাপাশি খেলাধুলা ও মানসিক প্রশান্তি, খেলাধুলায় দুর্ঘটনা ও প্রাথমিক চিকিৎসা এবং ‘নতুন কুঁড়ি ক্রীড়া’ শিরোনামেও আলাদা বিষয়বস্তু রাখা হবে।

এনসিটিবি এবং নতুন পাঠ্যবই প্রণয়নের সঙ্গে যুক্ত একাধিক সূত্রমতে, চতুর্থ শ্রেণিতে ‘খেলাধুলা’ ও ‘বাংলাদেশের সংস্কৃতি’ নামে দুটি নতুন বই যুক্ত হবে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে সংশ্লিষ্ট একজন শিক্ষক প্রথম আলোকে বলেন, খেলাধুলার প্রতি শিক্ষার্থীদের আগ্রহ কমে গেছে। মূলত শিক্ষার্থীদের খেলাধুলার প্রতি মনোযোগী করে তোলার উদ্দেশ্যেই বইটি প্রণয়ন করা হচ্ছে।

ক্লাস করছে শিক্ষার্থীরা
ফাইল ছবি: প্রথম আলো

প্রাথমিক সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ‘বাংলাদেশের সংস্কৃতি’ বইয়ে কয়েকটি অধ্যায় থাকবে। যেমন ‘আমি ও আমার সংস্কৃতি’ অধ্যায়ে সংস্কৃতির ধারণা, ব্যক্তিজীবনে সংস্কৃতির প্রভাব, নিজের পরিচয় এবং সাংস্কৃতিক পরিচয় বিষয়ে আলোচনা থাকবে। ‘উৎসব ও ঐতিহ্য’ অধ্যায়ে জাতীয়, ধর্মীয় ও সামাজিক উৎসব, পয়লা বৈশাখ, নবান্ন, বিজয় দিবস, একুশে ফেব্রুয়ারি এবং ঐতিহ্য সংরক্ষণের গুরুত্ব তুলে ধরা হবে। ‘শিল্প-সংস্কৃতি’ অধ্যায়ে সংগীত, নৃত্য, নাটক, চিত্রকলা, কারুশিল্প, হস্তশিল্প এবং সাংস্কৃতিক চর্চার গুরুত্ব অন্তর্ভুক্ত থাকবে।

অনুষ্ঠানে নতুন চার বই নিয়ে বলতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা উপদেষ্টা মাহদী আমিন বলেন, “‘লার্নিং উইথ হ্যাপিনেস” শিক্ষাব্যবস্থার একটি দর্শন। “লার্নিং উইথ হ্যাপিনেস” যেমন একটি বিষয়, তেমনি আমরা চাই গণিত, বাংলা, ভূগোল কিংবা ইতিহাস—সব বিষয়েই এই দর্শনের প্রতিফলন থাকুক।’

এ ছাড়া বইটির বিভিন্ন অধ্যায়ে লোকগান, লোকনৃত্য, লোককথা, প্রবাদ-প্রবচন, গ্রামীণ মেলা, লোকজ খেলাধুলা, লোক–ঐতিহ্য, বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী পোশাক, আঞ্চলিক পোশাকের বৈচিত্র্য, অলংকার ও হস্তশিল্পের পরিচয়, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী ও অন্যান্য জনগোষ্ঠীর পরিচয়, তাদের ভাষা, পোশাক, উৎসব, জীবনধারা, ঐতিহ্য, বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্যের ধারণা এবং ঋতুবৈচিত্র্য ও সাংস্কৃতিক জীবন সম্পর্কে শেখানো হবে।

এসব চূড়ান্ত করার সময় একাধিক অধ্যায় একীভূত হতে পারে বলে জানিয়েছেন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন শিক্ষক। তিনি বলেন, এই বইয়ের মূল উদ্দেশ্য থাকবে দেশের সংস্কৃতির সঙ্গে শিক্ষার্থীদের পরিচয় করানো।

‘খেলাধুলা’ বইয়ে আটটি খেলার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এগুলো হলো ফুটবল, ক্রিকেট, ব্যাডমিন্টন, কাবাডি, দাবা, অ্যাথলেটিকস, সাঁতার ও মার্শাল আর্ট।

অন্যদিকে প্রাথমিক কাঠামো অনুযায়ী, ষষ্ঠ শ্রেণির ‘আমার কারিগরি শিক্ষা’ বইয়ে মূলত কারিগরি শিক্ষার প্রতি আগ্রহ তৈরির বিষয়টি গুরুত্ব পাবে। এতে দৈনন্দিন জীবনে দক্ষ মানুষের ভূমিকা, দক্ষতা ও পেশার মর্যাদা, দৈনন্দিন জীবনে কারিগরি দক্ষতা, সমস্যা থেকে সমাধান, কারিগরি দক্ষতার বাস্তব প্রয়োগ, দক্ষতা সম্পর্কে প্রচলিত ধারণার পরিবর্তন, দক্ষতা শেখার প্রথম ধাপ, পর্যবেক্ষণ ও সঠিক পদ্ধতি বোঝা, নিরাপদভাবে কাজ শেখা, সমাজ ও জাতীয় উন্নয়নে দক্ষ মানুষের ভূমিকা এবং দক্ষতা থেকে ভবিষ্যতের পথ তৈরির মতো বিষয় অন্তর্ভুক্ত থাকবে।

আরও পড়ুন

ষষ্ঠ শ্রেণির আরেকটি বই ‘আনন্দময় শিখন (লার্নিং উইথ হ্যাপিনেস) ’-এ ব্যায়াম করা, শরীরের যত্ন নেওয়া, বিনয়ী হওয়া, প্রিয় ও ভালোবাসার মানুষদের সঙ্গে থাকা, পৃথিবীকে উপভোগ করা, কৃতজ্ঞ হওয়া এবং সুখী হওয়ার মতো বিষয় অধ্যায়ভিত্তিক উপস্থাপন করা হবে। এর মধ্যে ‘প্রিয় ও ভালোবাসার মানুষদের সঙ্গে থাকা’ অধ্যায়ে ভালো সম্পর্ক ও আনন্দের যোগসূত্র, ভালো বন্ধু ও ইতিবাচক মানুষের গুণাবলি এবং নেতিবাচক সঙ্গের ক্ষতিকর প্রভাব তুলে ধরা হবে।

এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট একজন শিক্ষক প্রথম আলোকে বলেন, শিক্ষার্থীদের নানা রকমের মূল্যবোধ শেখানোই এর অন্যতম উদ্দেশ্য।

‘শরীরচর্চা ও ব্যায়াম’ শিরোনামের একটি অধ্যায়ে ওয়ার্মআপ, স্ট্রেচিং, ফ্রি-হ্যান্ড ব্যায়াম, শ্বাসপ্রশ্বাস নিয়ন্ত্রণ এবং শরীরচর্চার উপকারিতা তুলে ধরা হবে। পাশাপাশি খেলাধুলা ও মানসিক প্রশান্তি, খেলাধুলায় দুর্ঘটনা ও প্রাথমিক চিকিৎসা এবং ‘নতুন কুঁড়ি ক্রীড়া’ শিরোনামেও আলাদা বিষয়বস্তু রাখা হবে।

নতুন বই চূড়ান্ত করতে কর্মশালা

২০২৭ শিক্ষাবর্ষে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের এই চার নতুন পাঠ্যবইয়ের কাঠামো চূড়ান্ত করতে গতকাল আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটে একটি কর্মশালার উদ্বোধন করেন শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন।

অনুষ্ঠানে নতুন চার বই নিয়ে বলতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা উপদেষ্টা মাহদী আমিন বলেন, “‘লার্নিং উইথ হ্যাপিনেস” শিক্ষাব্যবস্থার একটি দর্শন। “লার্নিং উইথ হ্যাপিনেস” যেমন একটি বিষয়, তেমনি আমরা চাই গণিত, বাংলা, ভূগোল কিংবা ইতিহাস—সব বিষয়েই এই দর্শনের প্রতিফলন থাকুক।’ খেলাধুলা ও সংস্কৃতি বিষয়ে দুটি বইকে প্রচলিত পাঠ্যবইয়ের তুলনায় আরও ব্যতিক্রমী ও ভিন্নধর্মী করা উচিত বলেও তিনি মত দেন। কারিগরি শিক্ষার বই প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এর মূল উদ্দেশ্য শিক্ষার্থীদের উদ্বুদ্ধ করা।

অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়াম, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ এবং যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হক।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে এনসিটিবির একজন কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, কর্মশালার উদ্বোধনের পর গতকালই চার বইয়ের বিষয়বস্তু চূড়ান্ত করার কথা ছিল। কিন্তু বৈরী আবহাওয়ার কারণে শেষ পর্যন্ত তা সম্ভব হয়নি। তাঁরা আশা করছেন, আগামীকাল মঙ্গলবার তা চূড়ান্ত হবে।