প্রথম আলো: প্রায় সাত বছর আগে আপনার সময়ে এমপিওভুক্তির কাজটি বিকেন্দ্রীকরণ করে শিক্ষক-কর্মচারীদের দোরগোড়ায় নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু ‘চার ঘাটের ঘুষ’ বন্ধে আবার এই কাজ সরাসরি মাউশির মাধ্যমে করার পরিকল্পনা করছে বর্তমান শিক্ষা প্রশাসন। এ বিষয়ে আপনার মতামত কী?

নজরুল ইসলাম খান: আমি বলব, এই কাজ কেবল বিকেন্দ্রীকরণ নয়, অনলাইন ব্যবস্থাও চালু হয়েছিল। সেখান থেকে ফিরে আসা হবে ভুল। অনলাইনে তো স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা সহজ। আমার সময়ে সিদ্ধান্ত হয়েছিল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ওয়েব মেইল থেকে এমপিওর অগ্রায়ন (দরখাস্ত পাঠানো) করা হবে। সেখানেই প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সংযুক্ত করে দেওয়া হবে। এতে বোঝা যাবে, কে কী করছেন। ঢাকা থেকে কেন কাজটি ঢাকার বাইরে নেওয়া হয়েছিল, সেটিও দেখতে হবে। তখন ব্যাপক অনিয়মের ঘটনা ধরা হয়েছিল। এখন আবার সেই কাজ ঢাকায় আনলে একই কাজ হবে। বরং ঢাকায় আনলে আরও খারাপ অবস্থা হবে। মফস্বল থেকে ঢাকায় এসে শিক্ষক-কর্মচারীদের আরও হয়রানির মুখে পড়তে হবে। এখানে এসে তদবির করতে হবে। তাই আমি বলব, আধুনিক সময়ে এসে এটি একটি পশ্চাৎপদ চিন্তা। বরং বিদ্যমান ব্যবস্থাটিকে উন্নত করতে হবে। সফটওয়্যারটি আরও যুগোপযোগী করতে হবে। ড্যাশবোর্ড করে মনিটরিং করতে হবে। কে কাজ আটকে রাখছেন, সেটি দেখা দরকার।

প্রথম আলো: এখন অভিযোগ উঠেছে, এমপিওভুক্তির কাজে চার ঘাটে ঘুষ দিতে হয়, শিক্ষকদের হয়রানির মুখে পড়তে হয়। এ বিষয়ে আপনি কী বলবেন?

নজরুল ইসলাম খান: ড্যাশবোর্ড করলে তো দেখা যাবে, কে কী করছেন। মাউশির মহাপরিচালক পর্যন্ত দেখতে পারেন কোন জেলার পারদর্শিতা কী। যদি দেখা যায় কোথাও গড়ে দেরি হচ্ছে, তখন তো ব্যবস্থা নেওয়া যায়। শুনেছি, গোয়েন্দা সংস্থা নাকি প্রতিবেদন দিয়েছে, তাহলে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। যারা অনিয়ম করছে, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিলে অন্যরাও অনিয়ম করতে সাহস পাবে না। আমার সময়ে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের কারাগারেও পাঠানো হয়েছিল। কিন্তু শুনেছি, আমি চলে আসার পর অভিযুক্ত ব্যক্তিকে আবার পুনর্বহাল করা হয়েছে। আমার মনে হয়, এখন যাঁরা ওপরের পদে আছেন, তাঁদের কাছে পুরোনো ইতিহাসটি বলা হয়নি। আমার প্রশ্ন, যদি অনলাইনে এ কাজ হবে, তাহলে কেন একজন শিক্ষককে সশরীর আসতে হয়? তাই অনলাইনে এ কাজ করে ভালোভাবে মনিটরিং করতে হবে।

প্রথম আলো: একসময় বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকেই সরাসরি শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হতো। তখন নিয়োগ নিয়ে নানা অভিযোগ ছিল। এখন বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষের (এনটিআরসিএ) মাধ্যমে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষকদের নিয়োগ হয়। তাই নিয়োগ যদি যথাযথ হয়, তাহলে বেতন পাওয়ার জন্য শিক্ষক-কর্মচারীদের ঘাটে ঘাটে যাচাইয়ের প্রয়োজন আছে কি? বেসরকারি চাকরিজীবীদের মতো বেতন পাওয়ার অন্তর্ভুক্তির কাজটি হতে পারে না?

নজরুল ইসলাম খান: আমিও মনে করি, এত ঘাটে ঘাটে যাচাইয়ের দরকার নেই। যাঁকে এনটিআরসিএ বাছাই করে দিল এবং যাঁকে মাউশির প্রতিনিধির উপস্থিতির মাধ্যমে নিয়োগ দেওয়া হলো, তাঁর বিষয়ে এত যাচাই–বাছাইয়ের দরকার নেই। ‘বিয়ের পর ছেলেমেয়েও হয়ে গেল, তার কাছে আবার কাবিননামা চাওয়ার দরকার নেই।’ সুতরাং চার ঘাটে কেন যেতে হবে? বরং এই কাজ আরও সহজ করতে হবে।

প্রথম আলো: বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মচারীরা বলছেন, পুরো শিক্ষাব্যবস্থা জাতীয়করণ করলে অনেক সমস্যার সমাধান হবে। এর যুক্তি হিসেবে তাঁরা বলছেন, এখন এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের মূল বেতনের শতভাগ সরকার দিচ্ছে। কম হলেও ভাতাও দেওয়া হচ্ছে। সরকারের সহায়তায় বেসরকারি ব্যবস্থায় অবসরের পর আর্থিক সুবিধাও পান। এ ক্ষেত্রে সরকার চাইলে আর অল্প কিছু টাকা দিয়ে এবং পরিকল্পনা করে জাতীয়করণ করতে পারে। শিক্ষকদের এই দাবি ও বক্তব্যের বিষয়ে আপনি কী মনে করেন?

নজরুল ইসলাম খান: আমার মনে হয়, এটিই হচ্ছে সবচেয়ে ভালো সমাধান। তবে আর্থিক অনটনের কারণে এখনই হয়তো করা এটি অসুবিধা হবে। তবে এখনই এটি করার একটি উপায় আছে, সেটা হলো এখনই জাতীয়করণ করে বলা যায়, পর্যায়ক্রমে আগামী কয়েক বছরের মধ্যে পুরো সুবিধা দেওয়া হবে। এভাবে করে যদি বলা হয় পাঁচ বছর পর সম্পূর্ণ সুবিধা পাবেন শিক্ষক-কর্মচারীরা, তাহলে ভালো হয়। এটাই সবচেয়ে ভালো।

শিক্ষা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন