পরিবর্তনশীল শিক্ষাব্যবস্থায় নোট-গাইড প্রয়োজনীয়তা হারাচ্ছে, উঠে যাচ্ছে: শিক্ষামন্ত্রী
শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন বলেন, পরিবর্তনশীল শিক্ষাব্যবস্থায় নোট ও গাইড বইয়ের প্রয়োজনীয়তা ফুরিয়ে আসছে। এর বিকল্প হিসেবে মানসম্মত সহায়ক বই বাজারে থাকবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
আজ শুক্রবার রাজধানীর বাংলা একাডেমির আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ মিলনায়তনে বাংলাদেশ পুস্তক প্রকাশক ও বিক্রেতা সমিতির (বাপুস) ৪৪তম বার্ষিক সাধারণ সভায় অংশ নিয়ে এ কথা বলেন শিক্ষামন্ত্রী।
এহছানুল হক মিলন বলেন, ‘শিক্ষাব্যবস্থা এমন দিকে ধাবিত হচ্ছে আস্তে আস্তে, আমার মনে হয় না যে এই নোট-গাইড এটাই শিক্ষার প্রচলিত কোনো ব্যবস্থা হবে। সেটা বোধ হয় আজকের দিনে পৃথিবী থেকে উঠে যাচ্ছে।’
আধুনিকায়নের এই যুগে সরকার ট্যাবসহ ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার বৃদ্ধিতে গুরুত্ব দিচ্ছে বলে উল্লেখ করেন আ ন ম এহছানুল হক মিলন। তিনি বলেন, এর ফলে চিরাচরিত গাইড বইয়ের ওপর নির্ভরতা কমছে।
নোট-গাইড বই উঠে গেলে পুস্তক প্রকাশক-বিক্রেতাদের ব্যবসা ক্ষতিগ্রস্ত হবে না বলে মনে করেন শিক্ষামন্ত্রী এহছানুল হক মিলন। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বরং তাঁরা (প্রকাশক-বিক্রেতারা) মানসম্মত সহায়ক বই বাজারে আনবেন।
পাশাপাশি ব্যবসায়ীরা আন্তর্জাতিক বাজারের উপযোগী বই প্রকাশ ও বিক্রি করতে পারেন বলে মত দেন আ ন ম এহছানুল হক মিলন। তিনি বলেন, ‘দেশে আমরা খুব সস্তায় বই প্রকাশ ও মুদ্রণ করতে পারি। যেই দামে পৃথিবীর আর কোনো দেশে প্রকাশ ও মুদ্রণ করা সম্ভব নয়।’
বিগত সরকারের সময়ে কিছু অসাধু ব্যবসায়ী গাইড বিতরণের জন্য অনৈতিক পন্থা অবলম্বন করেছিলেন বলে মন্তব্য করেন এহছানুল হক মিলন। তিনি বলেন, ‘বিগত সরকারের সময় হাজার হাজার কোটি টাকা নাকি আপনারা নষ্ট করেছেন—এগুলো বাস্তব-অবাস্তবের সমন্বয়। এখানে মূলত দায়ী নিয়ন্ত্রণহীন শিক্ষা মন্ত্রণালয়।’
শিক্ষা খাতে বর্তমান সরকারের পরিকল্পনা তুলে ধরেন আ ন ম এহছানুল হক মিলন। তিনি বলেন, বর্তমান সরকার শিক্ষাকে সবচেয়ে বেশি অগ্রাধিকার দিয়েছে। সরকার আগামী বাজেটে শিক্ষায় বরাদ্দ বাড়াবে।
অনুষ্ঠানে স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম বলেন, বই প্রকাশক-বিক্রেতাদের সঙ্গে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় ও বাংলা একাডেমির তেমন কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই। তবুও এই দুই প্রতিষ্ঠান অমর একুশে বইমেলার নেতৃত্বে রয়েছে। আগামী বছরের বইমেলায় যাতে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় ও বাংলা একাডেমির সঙ্গে বাপুস ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে যুক্ত করা হয়, সেই পরামর্শ দেন তিনি। বই প্রকাশক ও বিক্রেতারা যাতে সরকারের কাছে এই দাবি তোলেন, সে পরামর্শও তিনি দেন।
অনুষ্ঠানে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেন বলেন, তাঁর নির্বাচনী এলাকা বাংলাবাজারে বই প্রকাশনা-বিক্রির বড় পরিধি রয়েছে। বই প্রকাশনা-বিক্রির সঙ্গে যুক্ত প্রকাশক-বিক্রেতাদের সুখ-দুঃখে পাশে থাকার প্রতিশ্রুতি দেন তিনি। তাঁদের সার্বিক উন্নয়নে তিনি কাজ করবেন বলে উল্লেখ করেন।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন বাপুসের সভাপতি মো. রেজাউল করিম। তিনি সরকারের কাছে প্রকাশনা ও মুদ্রণশিল্পকে একটি পূর্ণাঙ্গ শিল্পের মর্যাদা দেওয়ার দাবি জানান।
শিক্ষামন্ত্রীর উপস্থিতিতে রেজাউল করিম বলেন, জাতীয় শিক্ষাব্যবস্থার মেরুদণ্ড হওয়া সত্ত্বেও এই খাত দীর্ঘদিন ধরে অবহেলিত। আগামী বছরের ১ জানুয়ারি বই উৎসব সফল করতে কাগজের সিন্ডিকেট ভেঙে বাজার স্থিতিশীল রাখাসহ মুদ্রাকরদের ন্যায্যমূল্যে কাগজের প্রাপ্যতা নিশ্চিত করার অনুরোধ জানান তিনি। এ ছাড়া করোনাকালীন ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে ক্ষুদ্র প্রেসমালিক-প্রকাশকদের জন্য সরকারি আর্থিক প্রণোদনার দাবি তুলে শিক্ষামন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করেন তিনি।
অনুষ্ঠানে ‘সমাজ জাগরণে প্রকাশক ও বিক্রেতাদের ভূমিকা’ শীর্ষক মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বাপুসের পরিচালক ও শিক্ষাবিদ মো. আবদুল আজিজ। তিনি বলেন, প্রকাশকেরা বই প্রকাশ করে আর বিক্রেতারা তা প্রান্তিক পর্যায়ে পৌঁছে দিয়ে একটি সচেতন জাতি গঠনে কাজ করছেন। ডিজিটাল যুগেও মুদ্রিত বইয়ের গুরুত্ব অপরিসীম। কারণ, মুদ্রিত বই পাঠকদের গভীর চিন্তার সুযোগ তৈরি করে, মনোযোগ বাড়ায়।
আবদুল আজিজ নীলক্ষেত ও বাংলাবাজারের বই বিক্রেতাদের দুরবস্থার কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, জ্ঞানভিত্তিক সমাজ গড়তে হলে এই পেশাকে সম্মানজনক পর্যায়ে নিতে হবে।
একাডেমিক প্রকাশকদের অবদান ও বর্তমান চ্যালেঞ্জ নিয়ে কথা বলেন বাপুসের জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি মাহমুদুল হাসান। তিনি বলেন, বাংলাদেশে ২০০৭ সালের পর থেকে নোট-গাইড প্রথা বিলুপ্ত হয়েছে। বর্তমানে প্রচলিত প্র্যাক্টিস বুক বা সহায়কের জন্য ১৯৪০ সালের পুরোনো আইনের আধুনিকায়ন দাবি করেন তিনি। এ ছাড়া মেধাস্বত্ব রক্ষায় বইয়ের ওপর থেকে ট্যাক্স প্রত্যাহার, জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের (এনসিটিবি) বই বিতরণে অসাধু ব্যবসায়ীদের সিন্ডিকেট ভেঙে দেওয়া ও অব্যবস্থাপনা রোধে নজরদারিসহ তদন্তের দাবি জানান তিনি।